হাইলাইটস:

  • পাঞ্জাবের গ্রামাঞ্চলে প্রদর্শিত হচ্ছে বিতর্কিত চলচ্চিত্র সতলুজ
  • দর্শকদের বড় অংশ বলছেন, আশির ও নব্বইয়ের দশকের সন্ত্রাসবাদী অধ্যায় আর কখনও ফিরে আসা চলবে না।
  • ছবিটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও গ্রামীণ পাঞ্জাবে দেখা যাচ্ছে বিপুল জনসমাগম।
  • প্রবীণদের স্মৃতি ও তরুণ প্রজন্মের কৌতূহল—দুইয়ের মিলন ঘটছে এই প্রদর্শনীগুলিতে।

বাংলাস্ফিয়ার: পাঞ্জাবের গ্রামাঞ্চলে সন্ধ্যা নামলেই এখন এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ছে। স্কুলের মাঠ, পঞ্চায়েত প্রাঙ্গণ, গুরুদ্বারের পাশের খোলা জায়গা কিংবা কমিউনিটি হল—যেখানেই সতলুজ ছবির প্রদর্শনী হচ্ছে, সেখানেই ভিড় জমাচ্ছেন শত শত মানুষ। কেউ এসেছেন পরিবারের সঙ্গে, কেউ প্রতিবেশীদের নিয়ে, আবার কেউ এসেছেন শুধুই সেই সময়ের স্মৃতি যাচাই করতে। ছবি শেষ হওয়ার পর দর্শকদের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে একটি বাক্য—“সেই অন্ধকার দিন যেন আর কখনও ফিরে না আসে।”

ছবিটি কেবল একটি চলচ্চিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে না। অনেকের কাছে এটি অতীতের এক নির্মম অধ্যায়ের স্মরণ, আবার অনেকের কাছে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানানোর একটি উপলক্ষ। বিশেষ করে যাঁরা আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে পাঞ্জাবের সন্ত্রাসবাদী হিংসার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন, তাঁদের কাছে ছবির বহু দৃশ্য ব্যক্তিগত স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলছে।

এক প্রবীণ কৃষক বলেন, “আমরা এমন সময় দেখেছি যখন সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বেরোনো মানেই ভয়। কে কখন গুলি চালাবে, কোথায় বিস্ফোরণ হবে, কেউ জানত না। আজকের ছেলেমেয়েরা সেই বাস্তবতা জানে না। তারা যেন অন্তত বুঝতে পারে, হিংসার পথ কোনও সমাধান নয়।”

এই কারণেই গ্রামাঞ্চলের দর্শকদের মধ্যে আবেগের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। ছবির নানা দৃশ্যে অনেকেই চোখের জল লুকোতে পারেননি। কেউ হারিয়েছেন আত্মীয়, কেউ প্রতিবেশী, কেউ আবার দীর্ঘদিন আতঙ্কের মধ্যে কৃষিকাজ করেছেন। তাঁদের কাছে ছবিটি নিছক বিনোদন নয়, বরং অতীতের ক্ষতকে নতুন করে স্পর্শ করার অভিজ্ঞতা।

তরুণ প্রজন্মের প্রতিক্রিয়াও লক্ষণীয়। যাঁদের জন্মই হয়েছে সন্ত্রাসবাদ-পরবর্তী সময়ে, তাঁরা বলছেন, বইয়ে বা পরিবারের গল্পে যা শুনেছেন, ছবি সেটিকে অনেক বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। এক কলেজপড়ুয়া বলেন, “আমরা শুধু শুনেছি যে একসময় পাঞ্জাবে খুব খারাপ পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু পর্দায় সেই সময়কে দেখে বুঝলাম, সাধারণ মানুষ কী ভয়ঙ্কর মূল্য দিয়েছিলেন।”

রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্য কম নয়। ছবির সমর্থকেরা বলছেন, ইতিহাসকে লুকিয়ে রাখা উচিত নয়; বরং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য তাকে সামনে আনা প্রয়োজন। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, অতীতের ঘটনাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ছবিটি একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে এবং কিছু সংবেদনশীল বিষয়কে সরলীকৃত করেছে।

তবে গ্রামাঞ্চলের দর্শকদের বড় অংশ এই বিতর্কে বিশেষ আগ্রহী নন। তাঁদের বক্তব্য, ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু একটি বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই—সন্ত্রাস, ঘৃণা এবং রক্তপাতের পুনরাবৃত্তি কেউ চান না।

অনেক জায়গায় ছবি প্রদর্শনের পরে স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা সভাও হয়েছে। সেখানে প্রবীণরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। কীভাবে রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান চলত, কীভাবে গ্রামের মানুষ দুই পক্ষের চাপে পড়ে অসহায় হয়ে যেতেন, কীভাবে দীর্ঘদিন অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল—সেসব স্মৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছেন তাঁরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের জনসমাগমের একটি সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। দীর্ঘদিন পরে পাঞ্জাবের মানুষ নিজেদের অতীত নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। বহু পরিবার এতদিন যেসব স্মৃতি চেপে রেখেছিল, এখন তা ভাগ করে নিতে শুরু করেছে। এতে ইতিহাসকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

অর্থনীতির দিক থেকেও সেই অস্থির সময়ের প্রভাব ছিল গভীর। কৃষিনির্ভর রাজ্যে বিনিয়োগ কমে গিয়েছিল, বহু শিল্প উদ্যোগ থমকে দাঁড়িয়েছিল, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছিল। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছিল মানুষের মানসিক জগতে। ভয়, অবিশ্বাস এবং অনিশ্চয়তা বহু বছর ধরে সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

এই কারণেই সতলুজ দেখে বেরিয়ে আসা অনেক দর্শক বলছেন, শান্তির মূল্য কেবল যুদ্ধ দেখেছেন যাঁরা, তাঁরাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা কখনও অস্ত্রের ভাষায় মেটানো যায় না।

অনেক শিক্ষকও ছবিটিকে শিক্ষামূলক আলোচনার সূত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তাঁদের মতে, তরুণদের সামনে শুধু গৌরবময় ইতিহাস নয়, ভুলের ইতিহাসও তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ অতীতের বিপর্যয়কে মনে রাখলেই ভবিষ্যতে একই ভুল এড়ানো সম্ভব।

পাঞ্জাব বহু প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। কৃষি, শিক্ষা, শিল্প এবং প্রবাসী পাঞ্জাবিদের অবদানে রাজ্য নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছে। সেই অর্জনকে রক্ষা করতে হলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং রাজনৈতিক হিংসা—সবকিছুর বিরুদ্ধেই সামাজিক ঐক্য বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গ্রামের পর গ্রামে সতলুজ দেখার পর তাই সবচেয়ে জোরালো যে বার্তা উঠে আসছে, তা কোনও রাজনৈতিক স্লোগান নয়। সেটি এক সাধারণ মানুষের আবেদন—অতীতকে ভুলে যেও না, কিন্তু তার অন্ধকারকে আর কখনও ভবিষ্যতের ওপর নেমে আসতে দিও না।