হাইলাইটস:
- গত দুই বছরে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র।
- ২০২৪ সালে প্রথম প্রকাশ্যে বিষ্ণোই গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করে কানাডার পুলিশ।
- ২০২৫ সালে কানাডা বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে।
- এফবিআই-নেতৃত্বাধীন সাম্প্রতিক অভিযানে লরেন্স বিষ্ণোই ও গোল্ডি ব্রারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
- চাঁদাবাজি, খুন, অগ্নিসংযোগ, গুলি চালানো ও অর্থপাচারের অভিযোগে আন্তর্জাতিক তদন্ত জোরদার হয়েছে।
বাংলাস্ফিয়ার: গত দুই বছরে জেলবন্দি গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের কথিত আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রকে ঘিরে তদন্তের জাল ক্রমশ শক্ত হয়েছে। এফবিআই-নেতৃত্বাধীন সাম্প্রতিক অপারেশন হার্ড বল-এর অনেক আগেই কানাডার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি বিষ্ণোই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক তদন্ত শুরু করেছিল।
২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো কানাডার রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) প্রকাশ্যে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নাম উল্লেখ করে। পরে কানাডা এই গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের হওয়া অভিযোগপত্রে লরেন্স বিষ্ণোই এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সতিন্দরজিৎ সিং ওরফে গোল্ডি ব্রারের বিরুদ্ধে কানাডার মাটিতে সংঘটিত একাধিক অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিদেশি হস্তক্ষেপ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে এক টেলিভিশন সংবাদ সম্মেলনে আরসিএমপির সহকারী কমিশনার ব্রিজিত গোভাঁ জানান, তদন্তকারীদের বিশ্বাস, কানাডায় খালিস্তানপন্থী কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করতে বিষ্ণোই গোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল ২০২৩ সালের ১৮ জুন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারে শহরে গুরু নানক শিখ গুরুদ্বারের বাইরে খালিস্তানপন্থী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যাকাণ্ড। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-কানাডা সম্পর্ক তীব্র কূটনৈতিক সংকটে পড়ে। তবে আরসিএমপির তদন্ত মূলত শুরু হয় চাঁদাবাজিকে ঘিরে ধারাবাহিক গুলিচালনার ঘটনাগুলির সূত্র ধরে।
এই তদন্তে উঠে আসে ২৬ বছরের অবজিৎ কিংরা এবং ২৪ বছরের বিক্রম শর্মার নাম। সারের একটি চাঁদাবাজি-সংক্রান্ত গুলিচালনার মামলায় গ্রেফতার হওয়া কিংরা পরে আদালতে স্বীকার করেন, বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নির্দেশে তিনি অগ্নিসংযোগ ও আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত ছিলেন।
তদন্তে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কোলউডে পঞ্জাবি গায়ক এপি ঢিলনের বাড়িতে গুলিচালনার ঘটনাতেও কিংরার যোগ ছিল। অভিযোগ, তিনি শরীরে লাগানো ক্যামেরায় হামলার ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে আপলোড করেন, যাতে বিষ্ণোই গ্যাং ওই হামলার দায় স্বীকার করতে পারে। তদন্তকারীদের দাবি, একটি সংগীতচিত্রে বলিউড অভিনেতা সালমান খানকে নেওয়ার প্রতিশোধ হিসেবেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। এর জন্য কিংরা প্রায় চার হাজার কানাডীয় ডলার পারিশ্রমিক পান।
বিক্রম শর্মা কানাডা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে এসেছেন বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। চলতি বছরের জুনে বহিষ্কার-সংক্রান্ত শুনানিতে কিংরা দাবি করেন, তদন্তে সহযোগিতা করেছেন বলে বিষ্ণোই গ্যাং তার এবং ভারতে থাকা পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। তবে কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে অপরাধী সংগঠনের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করে দেশ থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেয়।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় দক্ষিণ এশীয় ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে সংঘটিত সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তা রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের ১৭ জুন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার মুখ্যমন্ত্রী ডেভিড এবি আনুষ্ঠানিকভাবে ফেডারেল সরকারের কাছে বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার আবেদন জানান। তার বক্তব্য ছিল, বারবার হিংসা ও ভয় দেখানোর ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।
এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে অ্যাবটসফোর্ড পুলিশের কাছে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নামে একটি চিঠি আসে। সেখানে দাবি করা হয়, তাদের এক হাজার সশস্ত্র সদস্য কানাডাজুড়ে গুলিচালনা চালাতে প্রস্তুত। পরে ওই চিঠি অভিবাসন-সংক্রান্ত শুনানিতে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়।
কানাডার আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা অর্থপাচারের একটি চক্রেরও সন্ধান পায়, যা বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নামে পরিচালিত চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ। তদন্তে দেখা যায়, গ্রেটার টরন্টো ও মেট্রো ভ্যাঙ্কুভারের বহু ব্যবসায়ী প্রথমে হুমকি পান, তারপর তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কানাডা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের ফৌজদারি আইনের অধীনে বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
তৎকালীন জননিরাপত্তা মন্ত্রী গ্যারি আনন্দসঙ্গারী জানান, সরকার নিশ্চিত হয়েছে যে এই সংগঠন খুন, গুলিচালনা, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি ও ভয় দেখানোর মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, তাতে অংশগ্রহণ বা তা সহজতর করেছে এবং দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
এরপর তদন্ত সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্ল্যাকমেলকারীদের শনাক্ত করতে সাহায্য করা এক ব্যক্তি কানাডায় চলে যাওয়ার পর ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা জসমিত সিংয়ের কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকি পান। পরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ অভিযোগ আনে, তিনি বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হয়ে ওই হুমকি দিয়েছিলেন।
স্যাক্রামেন্টোতে এফবিআইয়ের একটি নথিভুক্ত মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে লরেন্স বিষ্ণোই নিজেই এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পরে ওই ব্যক্তির বাড়ির বাইরে তার গাড়িতে গুলি চালানো হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি গোপন আরসিএমপি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিষ্ণোই সংগঠন এখন কানাডাসহ একাধিক দেশে সক্রিয় এবং দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
তদন্তে একটি নির্দিষ্ট ধারা সামনে এসেছে—প্রথমে ফোন বা বার্তা পাঠিয়ে চাঁদা দাবি, এরপর দাবি না মানলে অগ্নিসংযোগ বা গুলিচালনা।
এই দীর্ঘ তদন্তই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যৌথ অপারেশন হার্ড বল-এর ভিত্তি তৈরি করে।
সাম্প্রতিক অভিযোগপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার দফতর, আরসিএমপির সহযোগিতায়, গোল্ডি ব্রারকে উত্তর আমেরিকায় বিষ্ণোই অপরাধচক্রের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অভিযোগ, তিনি লরেন্স বিষ্ণোইয়ের হয়ে কথা বলতেন এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সংগঠনের সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৩ সালের দিকে কানাডার সবচেয়ে বেশি ওয়ান্টেড ২৫ পলাতক অপরাধীর তালিকায় গোল্ডি ব্রারের নাম থাকলেও ২০২৪ সালে নীরবে তা সরিয়ে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায়, কারণ ২০২২ সালে পঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালার হত্যাকাণ্ডে ব্রারকে অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে খুঁজছে ভারত।