হাইলাইটস:
- ইসকনের প্রস্তুত করা মিড-ডে মিল নিয়ে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলায় রাজ্য সরকারের কাছে জবাব চাইল হাই কোর্ট।
- মামলায় অভিযোগ, বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার জন্য কেন্দ্রীভূত রান্নার ব্যবস্থা পুষ্টি, বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
- আবেদনকারীদের দাবি, স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্থানীয় রান্নার ব্যবস্থাকে সরিয়ে বড় সংস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
- রাজ্য সরকারের বক্তব্য শোনার পর পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করবে আদালত।
- মামলাটি ধর্মীয় নয়, বরং শিশুদের পুষ্টি, সরকারি নীতি এবং সরকারি চুক্তি প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাস্ফিয়ার: রাজ্যের বহু স্কুলে ইসকনের কেন্দ্রীয় রান্নাঘরে প্রস্তুত করা মিড-ডে মিল বিতরণ নিয়ে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলায় রাজ্য সরকারের কাছে জবাব চেয়েছে হাই কোর্ট। আদালত স্পষ্ট করেছে, আবেদনকারীদের উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারের অবস্থান জানা প্রয়োজন। সেই কারণেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হলফনামা আকারে উত্তর জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য শুধু পড়ুয়াদের পেট ভরানো নয়; তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ, স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করাও এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। কিন্তু বড় কেন্দ্রীয় রান্নাঘর থেকে বিপুল পরিমাণ খাবার সরবরাহের ফলে সেই লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, বহু জায়গায় আগে স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা স্থানীয় রান্নার দল মিড-ডে মিল প্রস্তুত করত। তাদের সরিয়ে বড় সংস্থার হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ায় বহু মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি, দূর থেকে খাবার এনে বিতরণ করার ফলে খাবারের গুণমান, তাজা অবস্থা এবং পুষ্টিমান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আবেদনকারীরা এ-ও দাবি করেছেন, সরকারি চুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং সমতার নীতি যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা আদালতের খতিয়ে দেখা উচিত। কোনও একটি সংস্থাকে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এত বড় দায়িত্ব দেওয়া হল, সেই বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসকনের পক্ষ থেকে অতীতে একাধিকবার বলা হয়েছে যে, তারা বহু বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুল পড়ুয়াদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত, পরিচ্ছন্ন এবং মাননিয়ন্ত্রিত খাবার সরবরাহ করে আসছে। আধুনিক কেন্দ্রীয় রান্নাঘরে নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক খাবার প্রস্তুত করা হয়। তাদের দাবি, এতে খাদ্যের গুণমান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয় এবং সময়মতো সরবরাহও নিশ্চিত করা যায়।
রাজ্য সরকারের তরফে এখনও আদালতে বিস্তারিত জবাব জমা পড়েনি। ফলে সরকার এই অভিযোগগুলির কী উত্তর দেয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার চাইলে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, নির্বাচন প্রক্রিয়া, পুষ্টিগত মান এবং প্রশাসনিক যুক্তি আদালতের সামনে তুলে ধরতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার কেন্দ্রবিন্দু কোনও ধর্মীয় সংগঠন নয়; বরং সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতি। আদালত মূলত দেখতে চাইবে, সরকারি সিদ্ধান্ত আইনসঙ্গত, যুক্তিসংগত এবং বৈষম্যহীন ছিল কি না। একই সঙ্গে শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে কি না, সেটিও বিচার্য হতে পারে।
মিড-ডে মিল প্রকল্প দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যালয়ভিত্তিক পুষ্টি কর্মসূচি। এর মাধ্যমে কোটি কোটি পড়ুয়া প্রতিদিন রান্না করা খাবার পায়। তাই এই প্রকল্পে কোনও পরিবর্তন বা বড় সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিশুদের পুষ্টি, বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং সরকারি ব্যয়ের ওপরও পড়ে।
হাই কোর্টের এই নির্দেশে মামলাটি এখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজ্য সরকারের জবাব পাওয়ার পর আদালত আবেদনকারীদের অভিযোগ, সরকারের ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবে। সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে মিড-ডে মিল প্রকল্প পরিচালনার নীতি এবং বড় বেসরকারি বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ভূমিকা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।