Home খবর হরমুজ সমঝোতা ভাঙনের মুখে

হরমুজ সমঝোতা ভাঙনের মুখে

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
57 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • খামেনেইকে ভবিষ্যতের ‘শহিদ’ আখ্যা দিয়ে ইরানে আরও উসকে উঠছে ধর্মীয় আবেগ।
  • ট্রাম্পের কড়া মন্তব্যে নতুন করে চরমে পৌঁছেছে ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনা।
  • হরমুজ প্রণালী নিয়ে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি ভাঙার অভিযোগ তুলছে।
  • বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কূটনীতির জায়গা দখল করছে সামরিক কৌশল।
  • পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে গড়াতে পারে বলে সতর্ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে যে সাময়িক বরফ গলতে শুরু করেছিল, তা ফের জমাট বাঁধছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ধর্মীয় আবেগ, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আর শুধু কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; নতুন সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে।

তেহরানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাংবাদিক বৈঠকেই সেই বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ী দাবি করেন, নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই ভবিষ্যতে শিয়া ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহিদ হিসেবে স্মরণীয় হবেন। তাঁর কথায়, ইতিহাসে খামেনেইর অবস্থান হবে ইমাম হুসাইনের সমতুল্য, আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখা হবে ইয়াজিদের আধুনিক প্রতিরূপ হিসেবে।

সাধারণত সংযত কূটনীতিক হিসেবে পরিচিত বাঘায়ীর এই বক্তব্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানে এখন কূটনীতির চেয়ে আবেগ ও প্রতিরোধের ভাষাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

শোক থেকে জাতীয়তাবাদ

খামেনেইর শেষকৃত্যের পর রাজধানী তেহরানে স্বাভাবিকতা কিছুটা ফিরলেও শোকের আবহ কাটেনি। বরং সেই আবেগ ছড়িয়ে পড়েছে ইরাকের নাজাফ শহর পর্যন্ত, যেখানে ইমাম আলির পবিত্র মাজারে তাঁর কফিন নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইরানে ধর্মীয় অনুভূতি ও জাতীয়তাবাদ এখন এক সুতোয় বাঁধা।

ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন উত্তেজনা

এই আবহেই ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প ইরান সম্পর্কে অত্যন্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন। ইরানিদের “আবর্জনা”, “ক্যানসার”, “শয়তান” ও “অপদার্থ” বলে কটাক্ষ করে তিনি জানান, তেহরানের সঙ্গে ভবিষ্যতে আলোচনার বিশেষ অর্থ দেখেন না।

যদিও তিনি সম্পূর্ণভাবে সংলাপের দরজা বন্ধ করেননি এবং লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন, তবু তাঁর বক্তব্য উত্তেজনা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।

সমঝোতা ভাঙনের পথে?

বিশ্লেষকদের মতে, মূল সংকট এখন হরমুজ প্রণালী ঘিরে হওয়া সমঝোতাকে কেন্দ্র করে।

ইরানের অভিযোগ, সমঝোতা অনুযায়ী অন্তত ৬০ দিন প্রণালীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ওমান যৌথভাবে দক্ষিণ অংশে নতুন নৌপথ চালুর চেষ্টা করছে, যা চুক্তির পরিপন্থী।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি, সমঝোতার উদ্দেশ্যই ছিল হরমুজে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করা। সেখানে ইরানের কোনও একতরফা নিয়ন্ত্রণ বা ভেটো স্বীকৃত ছিল না।

কূটনীতির জায়গায় সামরিক সিদ্ধান্ত?

অনেক বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, এখন আর ইরানের কূটনীতিকরা নয়, দেশের সামরিক নেতৃত্বই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফলে আস্থা তৈরির যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা কার্যত থমকে গেছে।

ইতিমধ্যেই হরমুজে ইরানের জাহাজে হামলা, তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা এবং পরে বাহরিন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা আক্রমণে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে।

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক উপদেষ্টা এরিক ব্রুয়ার মনে করেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় ট্রাম্প একটি অস্পষ্ট সমঝোতায় রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু সেই অস্পষ্ট শর্তই আজ নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিরোধ কোথায়?

বিশ্লেষক ভালি নাসর-এর মতে, ইরানের বিশ্বাস—যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যদি সেই আশঙ্কা সত্যি হয়, তাহলে এই প্রশ্নে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত তেহরান।

অন্যদিকে এলি গেরানমায়েহর মতে, ইরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের নিশ্চয়তা না পেয়ে হরমুজে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব ছাড়তে রাজি নয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়াই ছিল সমঝোতার মূল শর্ত।

সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে, কারণ সমঝোতার মাত্র ১৭ দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন ইরানের তেল রপ্তানিতে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তেহরানের দাবি, এটিই ছিল চুক্তি থেকে তাদের একমাত্র বাস্তব লাভ।

সামনে কী?

বর্তমানে এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, যাতে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের তথ্য ইরান ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। এতে ইরানের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হবে না, তবে সীমিত হবে।

তবে আরেকটি বড় বিতর্ক এখনও অমীমাংসিত। তেহরান ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী সব জাহাজের কাছ থেকে নিরাপত্তা ফি আদায় করতে চায়, যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশই প্রত্যাখ্যান করেছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনও অস্থির। আপাতত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো গেলেও, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ধর্মীয় আবেগ এবং কৌশলগত স্বার্থের সংঘাত হরমুজকে আবারও বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles