Home খবর মমতা ও শুভেন্দু যেন একে অন‍্যের প্রতিবিম্ব

মমতা ও শুভেন্দু যেন একে অন‍্যের প্রতিবিম্ব

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ারঃ বাংলার রাজনীতি এমন এক নাট্যমঞ্চ, যেখানে চরিত্রেরা কখনও-সখনও  প্রতিপক্ষ হয়েও একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই পরিহাসের এর চেয়ে বড় উদাহরণ মমতা আর শুভেন্দু।

তাঁদের সম্পর্কের ইতিহাস যেন অনেকটা পারিবারিক ট্র্যাজেডির মতো। একসময় একই রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য, তারপর বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ, ব্যক্তিগত তিক্ততা, এবং শেষে একে অপরকে ধ্বংস করার সংকল্পে দাঁড়িয়ে থাকা দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। অথচ এই দ্বন্দ্বের গভীরে ঢুকলে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে অদ্ভুত সব মিল রয়েছে—ভাষার ব্যবহার থেকে জনতার সঙ্গে সম্পর্ক, ক্ষমতার ধারণা থেকে রাজনৈতিক নাটক নির্মাণের কৌশল পর্যন্ত। আবার সেই মিলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মৌলিক কিছু অমিল, যা তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে পারে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বোঝার জন্য প্রথমেই বুঝতে হয় তাঁর রাজনৈতিক শরীরী ভাষা। তিনি নিজেকে কখনও নিছক প্রশাসক হিসেবে তুলে ধরেননি। তাঁর রাজনীতি সবসময়ই ছিল রাস্তাঘাটের রাজনীতি—মিছিল, স্লোগান, কবিতা, কান্না, অভিমান, রাগ, নাটক, আত্মবলিদানের ভাষা। তিনি বাংলার মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের সামনে নিজেকে তাঁদেরই একজন হিসেবে হাজির করেছিলেন। তাঁর চটি, সাদা শাড়ি, ঝোলা ব্যাগ, এসব কেবল পোশাক নয়, রাজনৈতিক প্রতীক। দীর্ঘ বাম শাসনের বিরুদ্ধে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিদ্রোহী শক্তি হিসেবে, এমন এক নারী হিসেবে যিনি “একলা” লড়াই করছেন গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।

শুভেন্দু অধিকারীর উত্থানও রাস্তার রাজনীতি থেকেই। নন্দীগ্রামের আন্দোলন তাঁকে তৈরি করেছিল। সেখানে তিনিও ছিলেন প্রতিবাদের মুখ, জনতার নেতা, মাটির মানুষ। তাঁর কণ্ঠেও ছিল একই ধরনের আক্রমণাত্মক প্রবণতা, একই ধরনের জনমোহিনী সুর। তিনি বুঝেছিলেন বাংলার রাজনীতিতে শুধুমাত্র নীতির ভাষায় জেতা যায় না; দরকার আবেগ, সংঘর্ষ, এবং মানুষের ক্ষোভকে ব্যক্তিগত ভাষায় রূপান্তর করার ক্ষমতা। এই জায়গাতেই মমতা ও শুভেন্দু একে অপরের খুব কাছাকাছি। দুজনেই জানেন, বাংলার ভোটার শুধুমাত্র প্রশাসনিক দক্ষতায় মুগ্ধ হয় না; তারা এমন নেতাকে চায়, যিনি তাদের হয়ে রাগ করবেন, চিৎকার করবেন, অপমানের প্রতিশোধ নেবেন।

তবু, এখান থেকেই শুরু হয় পার্থক্য।

মমতার রাজনীতি মূলত বহিরাগত-বিরোধী এক বাঙালি পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি বহুদিন ধরে নিজেকে “বাংলার মেয়ে” হিসেবে নির্মাণ করেছেন। তাঁর ভাষায় দিল্লি প্রায়শই একটি দখলদারি শক্তি। এই বয়ান তাঁকে আবেগগত বৈধতা দিয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি শুধু একটি দল চালান না; তিনি বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে তাঁর ব্যক্তিত্ব রাজনৈতিক দলকে ছাপিয়ে গেছে। তৃণমূল কংগ্রেস অনেকাংশে মমতার সম্প্রসারিত ছায়া।

শুভেন্দুর রাজনীতি ঠিক উল্টো পথে হাঁটে। তিনি ব্যক্তিগত ক্যারিশমা তৈরি করলেও তাঁর শক্তির প্রধান উৎস একটি বৃহত্তর সংগঠন, ভারতীয় জনতা পার্টি। তিনি জানেন, তাঁর পিছনে একটি সর্বভারতীয় মতাদর্শ, সাংগঠনিক যন্ত্র, এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বল রয়েছে। ফলে তাঁর ভাষায় “বাঙালি বনাম দিল্লি”র জায়গায় এসেছে “ব্যবস্থা বনাম দুর্নীতি” বা “সংখ্যালঘু তোষণ বনাম সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষোভ”-এর ভাষা। তিনি আবেগ ব্যবহার করেন, কিন্তু সেই আবেগের চরিত্র ভিন্ন। মমতা যেখানে বঞ্চিত মানুষের সহানুভূতি আহ্বান করেন, শুভেন্দু সেখানে আহত সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষোভকে সংগঠিত করেন।

দুজনের মধ্যেই আবার এক ধরনের রাজনৈতিক একাকীত্ব আছে। মমতা কখনও পুরোপুরি কাউকে বিশ্বাস করেন না,এই অভিযোগ তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলেও শোনা যায়। তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে সবসময় ছিল নিয়ন্ত্রণ। দল, প্রশাসন, প্রচার, এমনকি সাংস্কৃতিক বয়ান, সবকিছুর শেষ শব্দটি যেন তাঁরই হতে হবে। এই প্রবণতা তাঁকে অদম্য করেছে, আবার একই সঙ্গে তাঁকে ক্রমশ বিচ্ছিন্নও করেছে। তাঁর চারপাশে একদা যে যোগ‍্য রাজনৈতিক সহকর্মীদের  ভিড় ছিল, তার জায়গা নিয়েছে সুবিধাভোগী স্তাবককুল।

শুভেন্দুর মধ্যেও নিয়ন্ত্রণের সেই প্রবণতা প্রবল। পূর্ব মেদিনীপুরে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের ইতিহাসে দেখা যায়, তিনি স্থানীয় সংগঠনকে প্রায় ব্যক্তিগত দুর্গের মতো পরিচালনা করতেন। তাঁর অনুগতদের কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকসুলভ নেতা, কিন্তু সমালোচকদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যক্তি। এই দিক থেকে দেখলে, শুভেন্দু যেন মমতারই আর এক রাজনৈতিক সংস্করণ—শুধু বয়সে ছোট, এবং মতাদর্শগতভাবে অন্য শিবিরে দাঁড়ানো।

কিন্তু তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য সম্ভবত ইতিহাসবোধে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে ইতিহাসের একটি ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে ভাবতে ভালোবাসেন। তিনি কখনও নিজেকে নেতাজি, কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও বাংলা সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের সঙ্গে জুড়ে দেখান। তাঁর রাজনীতি সাংস্কৃতিক প্রতীকে ভরপুর। গান, কবিতা, ছবি আঁকা কোনও কিছুতেই তিনি পাতে দেওয়ার মতো ছিলেননা, যদিও এই সবকেই তিনি তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের অংশ করে তুলতে মরিয়া ছিলেন। তিনি মনে করতেন, বাংলায় ক্ষমতা কেবল প্রশাসনিক নয়, সাংস্কৃতিক বৈধতাও প্রয়োজন।

শুভেন্দু অধিকারী এই জায়গায় অনেক বেশি বাস্তববাদী। তাঁর রাজনীতিতে সাংস্কৃতিক রোম্যান্টিসিজম কম, কৌশল বেশি। তিনি মাঠের সংগঠন, বুথ ম্যানেজমেন্ট, সামাজিক সমীকরণ, মেরুকরণ, এসবের ওপর বেশি জোর দেন। তিনি জানেন কীভাবে ক্ষোভকে নির্বাচনী অঙ্কে পরিণত করতে হয়। তাঁর বক্তৃতায় সাহিত্যিক আবেগ কম, রাজনৈতিক বার্তা বেশি সরাসরি। ফলে তিনি হয়তো জনসভায় উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু মমতার মতো সাংস্কৃতিক রহস্যময়তা তৈরি করতে পারেন না।

আবার, দুজনেই ভয়ের রাজনীতি বোঝেন। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতা মানে শুধু প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নয়; মানে সামাজিক আধিপত্যও। মমতার আমলে বিরোধীরা বহুবার অভিযোগ করেছে যে তৃণমূল এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিরোধিতা করা বিপজ্জনক। শুভেন্দুর বিরোধীরাও আশঙ্কা করেন, তিনি ক্ষমতায় এসে একই ধরনের প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি আরও তীব্র করে তুলতে পারেন। অর্থাৎ, দুজনেই গণতন্ত্রের ভাষা ব্যবহার করলেও তাঁদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে শক্তির প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবু শেষ পর্যন্ত তাঁরা এক নন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে এখনও এক ধরনের আদর্শবাদী বিশৃঙ্খলা আছে। তিনি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন, আবেগে প্রতিক্রিয়া দেন, কখনও রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী পদক্ষেপও করে বসেন। তাঁর মধ্যে এখনও সেই রাস্তায় নেমে লড়াই করা ছাত্রনেত্রীর কিছু অংশ বেঁচে আছে। এই কারণেই তিনি একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও আনপ্রেডিক্টেবল।

শুভেন্দু অনেক বেশি হিসেবি। তাঁর রাজনীতি আবেগময় হলেও ব্যক্তিত্ব তুলনায় শীতল। তিনি সংঘর্ষকে ব্যবহার করেন কৌশল হিসেবে, আত্মপ্রকাশ হিসেবে নয়। তিনি জানেন কখন আক্রমণ করতে হয়, কখন নীরব থাকতে হয়, কখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। তাঁর রাজনীতিতে ব্যক্তিগত নাটক কম, ক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা বেশি সুস্পষ্ট।

সম্ভবত এই কারণেই বাংলার রাজনীতি আজ এমন এক অদ্ভুত জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মানুষ অনেক সময় মনে করে তারা যেন একই গল্পের দুই ভিন্ন সংস্করণ দেখছে। একজন বিদ্রোহী থেকে শাসক হয়েছেন; আরেকজন শাসকের শিবির থেকে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। একজন দিল্লির বিরুদ্ধে বাংলার ভাষা ব্যবহার করেন; অন্যজন বাংলার ক্ষোভকে দিল্লির শক্তির সঙ্গে যুক্ত করেন। কিন্তু দুজনেই জানেন, বাংলার রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত যুক্তির চেয়ে আবেগ বেশি শক্তিশালী, নীতির চেয়ে বয়ান বেশি কার্যকর, আর প্রশাসনের চেয়ে ক্ষমতার নাটক বেশি স্মরণীয়।

হয়তো এই কারণেই তাঁদের দ্বন্দ্ব কেবল দুই নেতার সংঘর্ষ নয়। এটি আসলে বাংলার আত্মপরিচয়ের ভিতরে চলতে থাকা এক গভীর দ্বন্দ্ব—আবেগ বনাম সংগঠন, সংস্কৃতি বনাম কৌশল, বিদ্রোহ বনাম নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব। আর সেই দ্বন্দ্বের দুই মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মমতা ও শুভেন্দু—একে অপরকে ধ্বংস করতে উদ্যত, অথচ অদ্ভুতভাবে একে অপরেরই প্রতিবিম্ব।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles