Home খবর তীব্র অপমানবোধই শুভেন্দুকে এতদূর নিয়ে এল

তীব্র অপমানবোধই শুভেন্দুকে এতদূর নিয়ে এল

0 comments 5 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ারঃ কলকাতার রাজনীতি বহুদিন ধরেই নাটক, বিশ্বাসঘাতকতা, আবেগ, শ্রেণিসংগ্রাম আর ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষে তৈরি এক অন্তহীন উপন্যাসের মতো। কিন্তু সেই দীর্ঘ উপন্যাসেও শুভেন্দু অধিকারীর উত্থানকে আলাদা করে চিনতে হয়। কারণ তাঁর গল্পে শুধু ক্ষমতার আরোহন নেই; আছে উত্তরাধিকার, অপমান, ক্ষোভ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নৈরাজ্য, আত্মরক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিশোধের প্রায় শেক্সপিয়রীয় পরিণতি। বাংলার রাজনীতিতে খুব কম নেতার জীবনেই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সত্বা এত গভীরভাবে মিশে গেছে।

শুভেন্দুর রাজনীতি বুঝতে হলে প্রথমেই বুঝতে হয় তাঁর ভূগোল। কলকাতা নয়, প্রেস ক্লাব নয়, কফি হাউস নয়,তাঁর রাজনীতির জন্ম পূর্ব মেদিনীপুরের মাটিতে। সেই উপকূলীয় জেলা, যেখানে নদী আর সাগরের মাঝখানে রাজনীতি সবসময়ই ছিল ব্যক্তিগত আনুগত্য, পরিবারতন্ত্র, গ্রামীণ শক্তিকেন্দ্র আর সংঘর্ষের মিশ্রণ। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী ছিলেন কংগ্রেসি রাজনীতির পুরোনো মানুষ; সংসদীয় ভদ্রতা ও জেলা-ভিত্তিক ক্ষমতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। বাংলার বহু রাজনৈতিক পরিবারের মতোই অধিকারী পরিবারেও রাজনীতি ছিল পেশা নয়, প্রায় পারিবারিক পরিবেশ। শিশুকালে শুভেন্দু যে বাতাসে বড় হয়েছেন, সেখানে ভোট ছিল উৎসবের থেকেও বেশি বাস্তব।

তবে তাঁকে প্রথম সারিতে এনে দেয় নন্দীগ্রাম। ২০০৭ সালের সেই আন্দোলন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক মুহূর্ত, যেখানে গ্রামীণ ক্ষোভ হঠাৎ নৈতিক মহিমা পেয়ে যায়। শহুরে বুদ্ধিজীবীরা তখন নন্দীগ্রামকে প্রায় বিপ্লবের রোমান্টিক প্রতীক বানিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু মাটির রাজনীতিতে আন্দোলন মানে কেবল নৈতিকতা নয়; সংগঠন, ভয়, প্রতিরোধ, রসদ, গোপন যোগাযোগ, রাত্রির বৈঠক সব মিলিয়ে ক্ষমতার নির্মাণ। সেই নির্মাণের কেন্দ্রে ছিলেন শুভেন্দু। অনেকেই পরে বলতেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলনের মুখ ছিলেন, কিন্তু নন্দীগ্রামের স্নায়ুতন্ত্র ছিলেন শুভেন্দু।

তখনও তিনি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্র নন। তাঁর ইংরেজি ঝকঝকে নয়, দিল্লির টেলিভিশন স্টুডিওর ভাষাও নয়। তিনি ছিলেন মাঠের মানুষ অথবা অন্তত সেই ভাবমূর্তিই তৈরি করেছিলেন। বাংলার গ্রামীণ রাজনীতিতে যা অত্যন্ত মূল্যবান। তিনি জনসভায় কথা বলতেন এমনভাবে, যেন বক্তৃতা দিচ্ছেন না, পাড়ার লোকেদের কাছে রাগ ঝাড়ছেন। তাঁর ভাষায় ছিল স্থানীয় উচ্চারণ, কটাক্ষ, বিদ্রূপ, প্রায় রাস্তার ঝাঁঝ। শহুরে অভিজাতদের কাছে সেটা অমার্জিত মনে হতে পারত, কিন্তু গ্রামীণ ভোটারের কাছে সেটাই “নিজের লোক”-এর ভাষা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের পর তৃণমূল কংগ্রেস দ্রুত এক আন্দোলন-মুখী দল থেকে ক্ষমতার দলে রূপান্তরিত হয়। আর এখানেই শুভেন্দুর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভিতর দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কারণ আন্দোলনের রাজনীতি ও শাসনের রাজনীতি এক নয়। আন্দোলনে প্রয়োজন আনুগত্য ও সাহস; শাসনে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ ও কেন্দ্রীয়করণ। মমতা ধীরে ধীরে এমন এক ক্ষমতা কাঠামো তৈরি করলেন যেখানে দলের প্রতিটি স্তর শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্বে এসে ঠেকে। শুভেন্দুর মতো জেলা-ভিত্তিক শক্তিশালী নেতার জন্য সেটি স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিকর ছিল।

তাঁর ঘনিষ্ঠরা প্রায়ই বলতেন, শুভেন্দুর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তিনি নিজেকে কখনও কেবল “নেত্রী-নির্ভর” ভাবতে রাজি ছিলেন না। তিনি জানতেন তাঁর নিজস্ব সংগঠন আছে, নিজস্ব ভোট আছে, নিজস্ব ভয় দেখানোর ক্ষমতা আছে। বাংলার রাজনীতিতে এই আত্মবিশ্বাস আবার বিপজ্জনকও। কারণ এখানে দল সাধারণত ব্যক্তিকে সহ্য করে, সমকক্ষকে নয়।

তারপর ধীরে ধীরে শুরু হয় দূরত্ব। প্রকাশ্যে নয়, কিন্তু দৃশ্যমানভাবে। মমতার চারপাশে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব উঠে আসছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান তৃণমূলের ভিতরে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। শুভেন্দু বুঝতে শুরু করেন, তিনি দলের মধ্যে অপরিহার্য নন। আর বাংলার রাজনীতিতে যে নেতা নিজেকে অপরিহার্য ভাবেন, তাঁর কাছে এই উপলব্ধি প্রায় অপমানের মতো।

রাজনীতিতে অপমান একটি গভীর শক্তি। আদর্শের থেকেও অনেক সময় বেশি শক্তিশালী। শুভেন্দুর রাজনৈতিক রূপান্তরকে শুধুই মতাদর্শগত বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। তাঁর বিজেপিতে যাওয়া ছিল একইসঙ্গে কৌশল, আত্মরক্ষা ও প্রতিশোধ। তিনি বুঝেছিলেন, তৃণমূলের ভিতরে থেকে তিনি আর নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারবেন না। বিজেপি তাঁকে দিল একটি জাতীয় মঞ্চ, আর তিনি বিজেপিকে দিলেন বাংলার ভিতরে ঢোকার শর্টকাট।

২০২১ সালের নন্দীগ্রাম নির্বাচন তাই শুধু একটি বিধানসভা লড়াই ছিল না; সেটি ছিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একদিকে বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ্যমন্ত্রী, অন্যদিকে তাঁর এককালের সেনাপতি। সেই লড়াইয়ে শুভেন্দুর জয় আসলে সংখ্যার থেকেও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো সম্ভব।

কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক সম্ভবত এই—তিনি একইসঙ্গে অত্যন্ত স্থানীয় এবং অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। দিল্লির বিজেপি তাঁকে ব্যবহার করেছে বাংলার জন্য, আর তিনি বিজেপিকে ব্যবহার করেছেন নিজের ব্যক্তিগত আরোহনের জন্য। এই সম্পর্কের ভিতরে পারস্পরিক প্রয়োজন আছে, কিন্তু সম্পূর্ণ বিশ্বাস সম্ভবত নেই। কারণ শুভেন্দু খুব ভালো করেই জানেন, জাতীয় দল কখনও কাউকে স্থায়ীভাবে নিজের সমকক্ষ হতে দেয় না।

তাঁকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। বিরোধীরা তাঁকে অভিযুক্ত করেন ভয় ও মেরুকরণের রাজনীতি করার জন্য। তাঁর ভাষা কখনও কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে সঙ্ঘর্ষকে উসকে দেয় বলেও সঙ্গত সমালোচনা হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলার বাস্তব রাজনীতিতে “নরম” নেতাদের সাধারণত বেশি দূর পর্যন্ত মনে রাখা হয় না। শুভেন্দু সেই ঐতিহ্যেরই উত্তরসূরি, যেখানে রাজনৈতিক শক্তি মানে কেবল জনপ্রিয়তা নয়, প্রতিপক্ষের মনে উদ্বেগ তৈরি করার ক্ষমতাও।

আজ তিনি মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তাঁর মুখে প্রায়ই এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়, যেন বিজয়ের মধ্যেও তিনি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন। সম্ভবত কারণ তিনি জানেন, বাংলার রাজনীতি কাউকে দীর্ঘকাল ক্ষমা করে না। এই রাজ্য একসময় জ্যোতি বসুকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য মনে করেছিল, তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এখন শুভেন্দুর সময়। কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হোল এখানে প্রতিটি বিজয়ই সাময়িক আর প্রতিটি ক্ষমতাই ভবিষ্যতের কোনও বিদ্রোহকে নিজের ভিতরেই লালন করে।

কলকাতার পুরোনো রাজনৈতিক মহলে একটা কথা বহুদিন ধরে চালু ছিল—বাংলায় ক্ষমতা কখনও পুরোপুরি আদর্শ দিয়ে চলে না; চলে আঘাতের স্মৃতি দিয়ে। যে নেতা অপমান মনে রাখে, বাংলার রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত সাধারণত সেই নেতাই বেশি দূর যায়। শুভেন্দুকে বুঝতে গেলে এই কথাটা বারবার ফিরে আসে। তাঁর রাজনীতির ভিতরে এক ধরনের দীর্ঘস্মৃতি আছে। তিনি কথা বলেন প্রায় হিসাব মেলানোর ভঙ্গিতে। যেন প্রতিটি জনসভা কেবল বক্তৃতা নয়, বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভের জবাব।

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে তাঁর প্রথম কয়েক সপ্তাহে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় ছিল আচরণের পরিবর্তন। বিরোধী নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন তীব্র, আক্রমণাত্মক, প্রায় ক্রুদ্ধ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার অব‍্যবহিত আগে তাঁর শরীরী ভাষায় এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত সংযম দেখা গেল। যেন তিনি বুঝতে পারছেন, আন্দোলনের ভাষা আর রাষ্ট্রের ভাষা এক নয়। তবু সেই পুরোনো শুভেন্দু পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি। প্রশাসনিক বৈঠকেও কখনও কখনও তাঁর কণ্ঠে সেই পূর্ব মেদিনীপুরের মাটির রূঢ়তা ফিরে আসে।যে রূঢ়তা তাঁর সমর্থকদের কাছে “স্পষ্টবাদিতা”, আর সমালোচকদের কাছে “সংঘর্ষপ্রিয়তা”।

নবান্নে তাঁর প্রবেশের দৃশ্যটি অনেকের কাছেই প্রায় সিনেমার মতো মনে হয়েছিল। কারণ এই ভবনেই একসময় তিনি ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মানুষ। তারপর বহিষ্কৃত। তারপর প্রতিপক্ষ। তারপর প্রধান শত্রু। আর এখন সেই একই প্রশাসনিক কাঠামোর শীর্ষে। রাজনীতিতে এই ধরনের প্রত্যাবর্তন বিরল নয়, কিন্তু বাংলায় তা প্রায় নাট্যরূপ পায়। এখানে ক্ষমতার পরিবর্তন সবসময় ব্যক্তিগত আবেগে রঞ্জিত।

তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দক্ষতা সম্ভবত এই যে, তিনি নিজেকে একাধিক পরিচয়ের মধ্যে একসঙ্গে ধরে রাখতে পারেন। তিনি একইসঙ্গে “ভূমিপুত্র” এবং “জাতীয় দলের নেতা”। একইসঙ্গে আঞ্চলিক এবং কেন্দ্রঘনিষ্ঠ। বিজেপির বহু নেতার তুলনায় তাঁর ভাষা অনেক বেশি বাঙালি রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খায়। তিনি রবীন্দ্রনাথ উদ্ধৃত না করলেও জানেন কোথায় দুর্গাপুজোর আবেগ ব্যবহার করতে হয়, কোথায় উদ্বাস্তু পরিচয়, কোথায় গ্রামীণ ক্ষোভ। বাংলায় বিজেপির প্রথম দিককার সমস্যা ছিল দলটির গায়ে বহিরাগতর তকমা।  শুভেন্দু সেই দূরত্ব কমিয়ে আনতে অনেকটাই সাহায‍্য করেছেন।

কিন্তু তাঁর উত্থানের ভিতরে এক গভীর বৈপরীত্যও আছে। তিনি যে তৃণমূল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়েছেন, সেই সংস্কৃতির বহু কৌশল তিনি নিজেও ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠন, শক্তিশালী স্থানীয় নেটওয়ার্ক, ভয় ও আনুগত্যের সমীকরণ,এসব বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরোনো উপাদান। শুভেন্দু সেই ধারার বাইরের মানুষ নন; বরং সেই ধারারই এক নতুন সংস্করণ। পার্থক্য শুধু মতাদর্শিক ভাষা ও রাজনৈতিক মিত্রতায়।

তাঁর সমর্থকরা তাঁকে দেখেন “বাস্তববাদী” নেতা হিসেবে। এমন একজন, যিনি বুদ্ধিজীবী ভঙ্গিতে রাজনীতি করেন না; করেন ক্ষমতার বাস্তব সমীকরণ বুঝে। তাঁরা বলেন, বাংলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বক্তৃতা শুনেছে, এখন তারা প্রশাসনিক দৃঢ়তা চায়। শুভেন্দু সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। বিশেষ করে শহরতলি ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাঁর জনপ্রিয়তার ভিতর একটা আইনশৃঙ্খলা-কেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। মানুষ সেখানে আদর্শের থেকেও বেশি চায় নিয়ন্ত্রণ, স্থিতি, এবং “কেউ তো আছে” এই অনুভূতি।

তবে তাঁর বিরোধীরাও কম তীক্ষ্ণ নন। তৃণমূলের অনেক নেতা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এখনও তাঁকে “বিশ্বাসঘাতক” বলেই উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, শুভেন্দু আদর্শ নয়, কেবল ক্ষমতার রাজনীতি বোঝেন। আবার বামপন্থীদের একাংশ মনে করেন, তাঁর উত্থান বাংলার রাজনৈতিক ভাষাকে আরও আক্রমণাত্মক ও মেরুকৃত করবে। বিশেষ করে ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে তাঁর বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ বাংলা দীর্ঘদিন ধরে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছিল এক ধরনের প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে এড়িয়ে।

কিন্তু এখানেই শুভেন্দুর রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি। তিনি বুঝেছেন, বাংলার সামাজিক বাস্তবতা বদলেছে। অর্থনৈতিক হতাশা, কর্মসংস্থানের সংকট, সীমান্ত রাজনীতির উদ্বেগ, গ্রামীণ ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, সব মিলিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা আর আগের মতো কাজ করছে না। তিনি সেই পরিবর্তিত আবেগকে ধরেছেন। অনেকটা সেইভাবে, যেভাবে একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধরেছিলেন বামবিরোধী ক্লান্তি।

তাঁর ব্যক্তিজীবনও এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শুভেন্দু খুব সচেতনভাবে নিজের চারপাশে এক আধা-সংযমী, আধা-যোদ্ধা ইমেজ তৈরি করেছেন। বিলাসী অভিজাত রাজনীতিকের বদলে তিনি নিজেকে তুলে ধরেন পরিশ্রমী সাংগঠনিক নেতারূপে যিনি হেলিকপ্টারের থেকেও বেশি সময় কাটিয়েছেন গাড়ির ধুলোয়। এই ভাবমূর্তি বাংলার ভোটারদের কাছে এখনও কার্যকর, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন রাজনীতিকদের প্রতি অবিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে।

তবু তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুরু। বিরোধী নেতা হিসেবে ক্ষোভকে সংগঠিত করা সহজ; মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রত্যাশাকে সামলানো কঠিন। যে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে “পরিবর্তন”-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখন তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে পরিবর্তন বলতে তিনি আসলে কী বোঝেন। প্রশাসনিক সংস্কার? শিল্পায়ন? দুর্নীতি দমন? নাকি কেবল ক্ষমতার নতুন বণ্টন?

কারণ বাংলার মানুষ ইতিহাসগতভাবে অদ্ভুতভাবে নির্মম ভোটার। তারা দীর্ঘসময় কাউকে ভালোবাসে, তারপর হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নেয়,এবার যথেষ্ট হয়েছে। জ্যোতি বসু সেই সত্য দেখেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দেখলেন। শুভেন্দুও নিশ্চয় জানেন, এই রাজ্যে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা নদীর জোয়ারের মতো—দৃশ্যত স্থির, কিন্তু ভিতরে ভিতরে বদলাতে থাকে।

সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর চোখে মাঝে মাঝে বিজয়ের থেকেও বেশি সতর্কতা দেখা যায়। তিনি জানেন, বাংলার রাজনীতি কখনও স্থায়ী ঘর দেয় না। এখানে প্রতিটি মুখ্যমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত নিজেরই তৈরি ইমেজে বন্দি হয়ে পড়েন। আর ইতিহাসের সবচেয়ে সূক্ষ্ম পরিহাস হোল যে বিদ্রোহ একসময় একজন নেতাকে ক্ষমতায় আনে ঠিক সেই বিদ্রোহের বীজই ধীরে ধীরে তাঁকে ক্ষমতাচ‍্যুতও করতে পারে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles