বাংলাস্ফিয়ার: তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার মাত্র দুই দিনের মধ্যে ভারতীয় রাজনীতিতে এক অপ্রত্যাশিত অধ্যায়ের সূচনা হলো। দশকের পর দশক ধরে দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের বিশ্বস্ত জোট-সঙ্গী হিসেবে পরিচিত কংগ্রেস এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিল। ত্রিশঙ্কু বিধানসভায় একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসা অভিনেতা-রাজনীতিবিদ বিজয়ের তামিলাগা বেত্রি কাঝাগমকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে কংগ্রেস কার্যত দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে দিল। বছরের পর বছর মন্ত্রিসভায় উপেক্ষিত থাকার ক্ষোভ, ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের বাস্তব হিসেব এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলানোর তাগিদ — এই তিনটি শক্তি একসঙ্গে কংগ্রেসকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ফলাফলের পটভূমি
৪ মে ২০২৬-এ প্রকাশিত তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ফলে ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিজয়ের তামিলাগা বেত্রি কাঝাগম ১০৮টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হয়, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৮টি। দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের নেতৃত্বাধীন জোট পায় মাত্র ৭৩টি আসন, যার মধ্যে দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম নিজে পায় ৫৯টি এবং কংগ্রেস পায় মাত্র ৫টি।
অন্তরালের দীর্ঘ বিরোধ
দীর্ঘদিন ধরেই কংগ্রেস দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি এবং মন্ত্রিসভায় অংশীদারিত্বের দাবিতে চাপ দিয়ে আসছিল। ২০২১ সালে কংগ্রেস মাত্র ২৫টি আসনে লড়ে ১৮টি জিতেছিল, কিন্তু এবার তারা ৩৫ থেকে ৫০টি আসন দাবি করেছিল। সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা ছিল মন্ত্রিসভা — স্তালিনের পুরো ৩৫ জন মন্ত্রীই দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের, কোনো জোট অংশীদারকে একটিও দপ্তর দেওয়া হয়নি। কংগ্রেস এই পরিস্থিতিকে অপমানজনক মনে করে আসছিল।
কংগ্রেসের যুক্তি এবং তামিলাগা বেত্রি কাঝাগমকে বেছে নেওয়ার কারণ
কে সি বেণুগোপালের বক্তব্য অনুযায়ী, কংগ্রেসের অবস্থান হলো তামিলনাড়ুর নির্বাচনী রায় একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের পক্ষে। ভারতীয় জনতা পার্টি বা কোনো ছদ্ম সরকার গঠিত হোক, কংগ্রেস তা চায় না। বিজয় কামরাজের আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণার কথা বলেছেন — কংগ্রেসের এই মহাপুরুষের উল্লেখ কংগ্রেস নেতৃত্বের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ক্ষমতার হিসেব
কংগ্রেসের রাজনৈতিক বিষয়ক কমিটি তামিলাগা বেত্রি কাঝাগমকে সমর্থনের অনুমোদন দিয়েছে, এবং সূত্র জানাচ্ছে যে কংগ্রেস নতুন মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিত্ব পাওয়ার বিষয়টি লক্ষ্যে রেখেছে। এই পদক্ষেপটি স্পষ্টতই বাস্তববাদী — দ্রাবিড় দ্বিদলীয় আধিপত্যের পরবর্তী যুগে কংগ্রেস তার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে চাইছে।
দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের প্রতিক্রিয়া
দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের মুখপাত্র সারাভানান আন্নাদুরাই প্রকাশ্যে কংগ্রেসকে “বিশ্বাসঘাতক” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে কংগ্রেসের জেতা আসনগুলো মূলত দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের শক্তির কারণেই এসেছে।
সারকথা
মূলত তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে: এক, বছরের পর বছর ধরে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়ার ক্ষোভ; দুই, তামিলাগা বেত্রি কাঝাগমের সঙ্গে জোটে গেলে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা; এবং তিন, বিজয়ের নতুন রাজনৈতিক উত্থানকে ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আদর্শগত ছাদের আড়ালে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্মাণ। দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের সঙ্গ ছাড়াটা আকস্মিক নয় বরং এটা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবহেলার স্বাভাবিক পরিণতি।