মঙ্গলবার মিসৌরির দ্বিতীয় কংগ্রেশনাল আসনে ফ্রেড ওয়েলম্যানের জয় এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে, এনবিসি নিউজের তারকা তথ্যবিশ্লেষক স্টিভ কর্নাকির কাছে সেই ফলাফল দেখানোর জন্য কোনও গ্রাফিকও তৈরি ছিল না। নির্বাচনের রাতে সমর্থকদের সে কথাই জানালেন ওয়েলম্যান।

দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য অ্যান ওয়াগনার নিজের আসন ধরে রাখবেন বলেই ব্যাপকভাবে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের বৃহত্তর ঢেউয়ে তাঁকেও সরে যেতে হল।

একষট্টি বছরের ওয়েলম্যান দীর্ঘদিন মার্কিন সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন। পরে কাজ করেছেন প্রাক্তন সেনাকর্মীদের স্বার্থরক্ষায়। তবে তাঁর বেশি পরিচিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পবিরোধী, গণতন্ত্রপন্থী অনলাইন সংবাদ ও আলোচনা জগতের ব্যক্তিত্ব হিসেবে। এক্সে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৩ লক্ষ ৫৮ হাজারেরও বেশি। তাঁর কথায়, ওই সমাজমাধ্যমেই নিজের বাগ্‌দত্তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাঁর।

প্রগতিশীল, ট্রাম্পবিরোধী মাইডাসটাচ নেটওয়ার্কে ‘অন ডেমোক্রেসি’ নামে একটি পডকাস্ট সঞ্চালনা করেন ওয়েলম্যান। মিসৌরির মতো প্রধানত রক্ষণশীল রাজ্যে তাঁর প্রার্থীপদ তাই ছিল চেনা ছকের বাইরে। মাইডাসটাচের সহপ্রতিষ্ঠাতা বেন মাইসেলাস বলেন, “ফ্রেড বরাবরই একজন লড়াকু মানুষ। সবচেয়ে জরুরি মুহূর্তে তিনি মানুষের হয়ে জোরালোভাবে কথা বলেছেন। তাঁর সাফল্যে আমরা ভীষণ গর্বিত, তাঁর জয় দেখে উচ্ছ্বসিত।”

ওয়েলম্যানের গণমাধ্যমের কাজকেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন ওয়াগনার। কয়েক বছর আগে একটি পডকাস্টে নিজেকে ‘ঘোরতর উদারপন্থী’ বলে বর্ণনা করেছিলেন ওয়েলম্যান। প্রচারের বিজ্ঞাপনে সেই কথাটিকেই সামনে এনেছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী।

চার বছর আগে শুরু করা পডকাস্টটি জাতীয় স্তরে তাঁর পরিচিতি অবশ্যই বাড়িয়েছে। কিন্তু ওয়েলম্যান জানালেন, প্রচারে তিনি সচেতনভাবে জোর দিয়েছিলেন নিজের স্থানীয় শিকড়ের উপর—মিসৌরির কার্কউডে তাঁর বেড়ে ওঠার পরিচয়ের উপর।

তিনি বলেন, “আমি জাতীয় স্তরের কোনও ব্যক্তিত্ব বা জাতীয় স্তরের ট্রাম্পবিরোধী মুখ হয়ে উঠতে চাইনি। আমি হতে চেয়েছিলাম কার্কউডের ফ্রেড। আমার মনে হয়, এই নির্বাচনে আমাদের জয়ের অন্যতম কারণ ছিল সেটাই। নিজের এলাকার নির্বাচনে দাঁড়ানো কোনও ‘বিখ্যাত ব্যক্তি’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা না করে আমি সব সময় বলেছি, আমার কাজ মিসৌরির মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা। আমার মতে, কৌশলগতভাবে এটা ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যার সুফল আমরা পেয়েছি।”

সাক্ষাৎকারটি সংক্ষেপিত এবং বক্তব্যের স্পষ্টতার জন্য সম্পাদিত।

প্রশ্ন: জিতে কি অবাক হয়েছিলেন?

ওয়েলম্যান: না, আমার মনে হয়েছিল আমরা জিতব। অবশ্যই উদ্বেগ ছিল। মনে হচ্ছিল, সম্ভাবনা পঞ্চাশ-পঞ্চাশ। আমার ধারণা, অনেকেই বলছিলেন লড়াইটা যে কোনও দিকে যেতে পারে। ওয়াগনার যে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন চালাতে পারছিলেন, তা নিয়ে আমার সব সময় দুশ্চিন্তা ছিল… কিন্তু নির্বাচনী এলাকায় ঘুরে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমি বুঝেছিলাম, আমরা পারব। আমরা এমন একটা আন্দোলন গড়ে তুলেছি, যাতে দুই দলের মানুষই আছেন, যা দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে। জয়ের জন্য যে সমর্থনের জোটটা গড়া দরকার ছিল, সেটা আমি গড়তে পেরেছিলাম। পুলিশ ও দমকলের সংগঠন ছাড়া শ্রমিক সংগঠনগুলির সবাই আমাদের সঙ্গে এসেছিল। এমনকি পুলিশ ও দমকলের সাধারণ কর্মীরাও আমাকে সমর্থন করছিলেন।

প্রশ্ন: নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জাতীয় গণমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে নিজের পরিচিতিকে কম গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কেন?

ওয়েলম্যান: আমার মনে হয়, স্থানীয় মানুষের কাছে সেটা বিরক্তির কারণ হতে পারে। অনেক সময় তাঁদের মনে হয়, আপনার জাতীয় স্তরের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে, কিংবা আপনি শুধু বিখ্যাত হতে চাইছেন। বিশেষ করে আমার মতো কেউ, যাঁর সমাজমাধ্যমে কিছুটা পরিচিতি আছে, তাঁকে মানুষ এই বলে উড়িয়ে দিতে পারেন যে তিনি শুধু নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও বাড়াতে চাইছেন। আমি তাই একেবারে স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছিলাম—না, আমি পূর্ব মিসৌরির ৭ লক্ষ ৫৯ হাজার মানুষের প্রতিনিধি হয়ে কংগ্রেসে যাওয়ার জন্য লড়ছি। এটাই ছিল আমাদের মনোযোগের কেন্দ্র।

শুধু ইন্টারনেটের খ্যাতির উপর ভরসা না করে আমরা নির্বাচনী এলাকার সর্বত্র গিয়েছি, মানুষের কাছে পৌঁছেছি, তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছি। এভাবে ব্যক্তিগত উপস্থিতির মধ্য দিয়েও নিজেদের কথার প্রমাণ দিয়েছি। আমার মনে হয়, এত ভাল ফল করার এটাও একটা কারণ।

প্রশ্ন: আপনি পডকাস্ট শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে পরিবারের প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

ওয়েলম্যান: এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে এখনও হাসিঠাট্টা হয়। যখন বাগ্‌দত্তাকে বলেছিলাম যে একটা পডকাস্ট শুরু করতে চাই, তাঁর মনে হয়েছিল ব্যাপারটা একেবারেই ভাল হবে না। কারণ, একজন মধ্যবয়সি শ্বেতাঙ্গ পুরুষ পডকাস্ট করছেন—ব্যাপারটা একটু গতানুগতিক হয়ে গিয়েছে। তবে আমার নিজের কথা বলার জন্য এটা একটা দারুণ মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। না, ‘নিজের কথা’ বলাটা ঠিক হল না—গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলা, গণতন্ত্রের বিপদগুলি নিয়ে আলোচনা করা, অসাধারণ কিছু মানুষের ভাবনা তুলে ধরার মঞ্চ: সাংবাদিক, লেখক, রাজনীতিক, চিন্তাবিদ।

কাজটা আমি খুব উপভোগ করেছি। খুব ভাল একটা পরিসর পেয়েছি। অনেক কিছু শিখেছি। আর এত দিন ধরে—চার বছর ধরে—পডকাস্ট করার একটা সুবিধা হল, এমন বিষয় খুব কমই ছিল যার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। ফলে কংগ্রেস সদস্য বা প্রার্থী হওয়ার সময় এমন প্রসঙ্গ খুব কমই উঠেছে, যা কোনও না কোনও সময় আমার নজরে আসেনি।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয়, আপনার প্রার্থীপদ ওয়াগনারকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল?

ওয়েলম্যান: হ্যাঁ, অবশ্যই। এমনকি জাতীয় স্তরেও এই আসনটাকে রিপাবলিকানদের নিরাপদ আসন বলেই ধরা হচ্ছিল। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট কখনও আমাদের আসনকে ‘নিরাপদ রিপাবলিকান’ তকমা থেকে সরায়নি। একবারও না।

আমার মনে হয়, নির্বাচনী পূর্বাভাসদাতারা দেখেছিলেন—আসনটি ৩৪ বছর ধরে রিপাবলিকানদের দখলে, প্রতিদ্বন্দ্বী ১৪ বছর ধরে কংগ্রেস সদস্য, তিনি প্রচার শুরু করেছেন ৪৫ লক্ষ ডলার নিয়ে, আর আমার হাতে তখন শূন্য। আমার সেই আর্থিক সামর্থ্যও ছিল না। ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেশনাল ক্যাম্পেন কমিটি এবং অন্য বড় জাতীয় সংগঠনগুলি যে আমাদের লড়াইয়ে এগিয়ে আসেনি, সেটাকেও তাঁরা আমার প্রচারের দুর্বলতার লক্ষণ বলে ধরে নিয়েছিলেন…

কিন্তু আমরা যখন পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলাম, কী কী সম্ভব তা বিচার করলাম, তখন আমি একটা বাস্তব সুযোগ দেখতে পেলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, কংগ্রেস সদস্য ওয়াগনারকে মানুষ যতটা শক্তিশালী মনে করছেন, আসলে তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল। আমার মনে হয়েছিল, একটা সুযোগ আছে। শেষ পর্যন্ত আমার সেই উপলব্ধিই ঠিক প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করি।

প্রশ্ন: তা হলে রবিবারই ওয়াশিংটন ডিসি যাচ্ছেন?

ওয়েলম্যান: এই রবিবার থেকেই নতুন সদস্যদের পরিচিতিমূলক প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে। কংগ্রেস সদস্য হিসেবে কীভাবে কাজ করতে হয়, সেটা শিখতে হবে। কংগ্রেস সদস্য হওয়ার অ আ ক খ… আমি আগেও জনসেবা করেছি। সতেরো বছর বয়সে যে শপথ নিয়েছিলাম, এ বারও সেই একই শপথ নেব। তবে অবশ্যই এ একেবারে অন্য ধরনের সেবা।

যেমন বললাম, এখন আমার বস ৭ লক্ষ ৫৯ হাজার মানুষ। যাঁরা আমার সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন, যাঁরা আমাকে ভোট দেননি, তাঁদের কাছেও আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। নিজের সাধ্যমতো সেরা কাজটা করা তাঁদের কাছে আমার দায়। যতটা সম্ভব স্বচ্ছ থাকা আমার দায়। আর সততা ও মর্যাদার সঙ্গে কাজ করাও তাঁদের কাছে আমার দায়।