গত মাসে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত অতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতিক ফ্লাভিয়ো বলসোনারো দাবি করেছেন, তাঁর এই হার মানেই ‘ব্রাজিলের শেষ’ নয়। দেশ ছেড়ে আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়ার পরে এখন নিজের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার লড়াই চালাচ্ছেন তিনি।
২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে বামপন্থী বিদায়ী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে ৪০ লক্ষেরও বেশি ভোটে পরাজিত হন বলসোনারো। তার পরেই, গত সপ্তাহের গোড়ায় দেশ ছেড়ে পালান তিনি।
আমেরিকায় পৌঁছনোর পরে বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম বড় কোনও প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে হাজির হন বলসোনারো। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার-আ-লাগো প্রাসাদে দক্ষিণপন্থীদের এক সমাবেশে ভাষণ দিয়ে তিনি দাবি করেন, সামনে এখনও ‘দারুণ সব ঘটনা’ অপেক্ষা করছে।
কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্স বা সিপ্যাক আয়োজিত চার দিনের ‘দূরদর্শীদের সমাবেশ’-এর এক নৈশভোজে ৪৫ বছর বয়সি বলসোনারো বলেন, “আমি জানি, এটাই ব্রাজিলের শেষ নয়। আর আমি জানি, এটাই আমেরিকারও শেষ নয়।” এই অনুষ্ঠানে ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসেরও বক্তৃতা দেওয়ার কথা।
তিনি আরও বলেন, “যেটাকে শেষ বলে মনে হচ্ছে, তা আমাদের প্রত্যাশামতো না হলেও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে হবে। আরও বেশি বিশ্বাস রাখতে হবে যে, এখানেই সব শেষ হয়ে যায়নি। তিনি যে দরজা খুলে দেন, কেউ তা বন্ধ করতে পারে না। আর তিনি যে দরজা বন্ধ করেন, কেউ তা খুলতে পারে না।”
এর আগে, নির্বাচনের পরে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে বলসোনারো ভোটে জালিয়াতি নিয়ে একাধিক প্রমাণহীন অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, দেশ ছেড়ে পালাতে তিনি “কারও কাছ থেকেই কোনও সাহায্য” পাননি।
বলসোনারো বলেন, “সবটাই আমি নিজে করেছি।” অথচ বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্পের উপদেষ্টা জেসন মিলার এবং আর্জেন্টিনার দক্ষিণপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সান্তিয়াগো কাপুতো তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।
কী ভাবে ব্রাজিল ছেড়ে পালিয়েছেন, সেই সম্পূর্ণ কাহিনি নিজের “সঙ্গে কবরে নিয়ে যাবেন” বলেও জানান বলসোনারো। ব্রাজিলে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রীয় পুলিশের তদন্ত চলছে। তিনি কংগ্রেসের সদস্য এবং কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন নির্বাচিত পদে রয়েছেন। কিন্তু আগামী বছরের গোড়ায় তাঁর মেয়াদ শেষ হলে সংসদীয় দায়মুক্তি হারাবেন। তখন তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া চালানো সম্ভব হবে।
ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একমত যে, যে নির্বাচনে তিনি ৫ কোটি ৯০ লক্ষ ভোট পেয়েছেন, তার পরেই দেশ ছেড়ে চলে গিয়ে বলসোনারো কার্যত বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছেন এবং নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। তিনি বন্দি প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর পুত্র।
লেখক এবং গ্লোবোনিউজ টেলিভিশন নেটওয়ার্কের রাজনৈতিক ভাষ্যকার টমাস ট্রাউমান বলেন, “ব্রাজিলে থাকলে ফ্লাভিয়ো বিরোধী পক্ষের নেতৃত্ব দিতে পারতেন। সেই সুযোগ ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মতো বোকামি তিনি করেছেন। তবে বলসোনারো পরিবার এখনও রাজনৈতিক লড়াইয়ে রয়েছে।”
ফ্লাভিয়োর ভাই, প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য এদুয়ার্দো বলসোনারোও আমেরিকায় স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন। ব্রাজিলে ফিরলে জবরদস্তির অপরাধে তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। গত মাসের নির্বাচনে বলসোনারো পরিবারের আরও চার জন কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দুই ভাই কার্লোস ও জাইর রেনান এবং তাঁদের সৎমা মিশেল বলসোনারো।
ট্রাউমানের মতে, জাইর বলসোনারো যদি আলোচনার মাধ্যমে নিজের ২৭ বছরের কারাদণ্ড থেকে মুক্তির কোনও ব্যবস্থা করতে পারেন, তা হলে তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা একেবারে অকল্পনীয় নয়। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে যাওয়ার পরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে তাঁর ওই সাজা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ৭১ বছর বয়সি জাইর ২০৬০ সাল পর্যন্ত কোনও নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তাঁকে গৃহবন্দিও থাকতে হবে।
পরিবারের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নির্বাসনে এবং একজন বন্দি থাকায়, বলসোনারো পরিবার তাদের নামাঙ্কিত জনতাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন ‘বলসোনারিসমো’-র নিয়ন্ত্রণ আর ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সের্জিয়ো আব্রাঞ্চেস এই সপ্তাহে ও গ্লোবো সংবাদপত্রকে বলেন, “নিজের ভুল এবং অপরাধের কারণে এই আন্দোলন মরণঘাতী আঘাত পেয়েছে।”
আব্রাঞ্চেসের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকদের সামনে এখন বলসোনারোদের গণতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন থেকে নিজেদের “আলাদা করে নেওয়ার” সুযোগ এসেছে। ২০৩০ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তাঁরা নতুন পথে এগোতে পারেন।
ফ্লাভিয়ো বলসোনারো বলেছেন, ভবিষ্যতের নির্বাচনে তিনি “অবশ্যই” প্রার্থী হবেন। তবে তাঁর ভবিষ্যৎ আপাতত আমেরিকাতেই—“অন্তত এখনকার মতো”।
ট্রাম্পের কাছ থেকে আমেরিকার ভিসা পাওয়া ফ্লাভিয়ো কোথায় থাকবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাঁর ভাই এদুয়ার্দো গত বছর ব্রাজিল ছাড়ার পরে টেক্সাসের সাউথলেকে বাসা বেঁধেছেন। যদিও কারও কারও ধারণা, তিনি অন্যত্র চলে যেতে পারেন। কারণ, ঐতিহ্যগত ভাবে রক্ষণশীল এই রাজ্যটি এ সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোহোসাকে গভর্নর নির্বাচিত করেছে।
বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানের আগে সিপ্যাকের সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় এদুয়ার্দো বলসোনারো দাবি করেন, ডেমোক্র্যাটদের এই ‘নীল সুনামি’ তাঁদের আমেরিকায় থাকার পথে খুব বড় ঝুঁকি তৈরি করবে না।
তিনি বলেন, “ওরা, অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটরা, আমাদের সমস্যায় ফেলার চেষ্টা করবে। কিন্তু ভিসা বা নাগরিকত্ব বাতিল করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে নেই।”
হিজাব পরতে অস্বীকার করায় প্রাণনাশের আশঙ্কায় ইরান ছেড়ে পালানো কোনও আশ্রয়প্রার্থী নারীর পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের অবস্থার তুলনা টেনে তিনি আরও বলেন, “আমার এখানে থাকা একশো শতাংশ বৈধ। আমার ভাই এবং তার পরিবারের ক্ষেত্রেও তা-ই।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।