বাসিন্দাদের ‘অ-পশ্চিমা’ পটভূমির মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করার সরকারি পদ্ধতি বর্ণবৈষম্যবিরোধী আইনের আওতায় পড়ে কি না, সে বিষয়ে রায় দিতে চলেছে ডেনমার্কের সুপ্রিম কোর্ট।
কোপেনহাগেনের উত্তরে হেলসিঙ্গর শহরের নোইসমহেড-স্যুডভাই আবাসন থেকে উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের আপিলের ভিত্তিতে এই বিচার হতে চলেছে। বিতর্কিত যে আইনটি আগে ‘ঘেটো আইন’ নামে পরিচিত ছিল, তার জেরে যাঁরা নিজেদের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের অনেকের জীবনেই এই মামলার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। সরকার এখন সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিকে ‘সমান্তরাল সমাজ’ বলে উল্লেখ করে।
অন্য আদালতগুলিতে বাসিন্দাদের আবেদন সফল হয়নি। তাঁদের যুক্তি, আবাসন সংস্থার উচ্ছেদের উদ্দেশ্য ছিল এলাকায় ‘অ-পশ্চিমা’ পটভূমির বাসিন্দাদের সংখ্যা কমানো। এর মাধ্যমে এলাকাটি যাতে ‘ঘেটো’ হিসেবে চিহ্নিত না হয় এবং সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল সংস্থাটি। সরকারের পূর্ববর্তী বক্তব্য, এই শ্রেণিবিভাগের সঙ্গে জাতিগত পরিচয়ের কোনও সম্পর্ক নেই।
গত ডিসেম্বরে ইউরোপীয় বিচার আদালত বা ইসিজে জানিয়েছিল, আইনটি বেআইনি হতে পারে। এই আইন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত নয় এমন আবাসনের সংখ্যা ৪০ শতাংশ কমাতে হবে আবাসন সংস্থাগুলিকে। সে জন্য সম্পত্তি বিক্রি, বাড়ি ভেঙে ফেলা কিংবা ভাড়াটেদের ভাড়ার চুক্তি বাতিল করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
সরকার আগে যে এলাকাগুলিকে ‘কঠিন সমস্যাপীড়িত ঘেটো’ বলে চিহ্নিত করেছিল, সেখানে বহুতল আবাসন ভেঙে ফেলার ব্যবস্থাও এই নীতির অন্তর্ভুক্ত। এখন ওই এলাকাগুলিকে বলা হয় ‘রূপান্তর এলাকা’। সেখানে অন্তত অর্ধেক বাসিন্দার পটভূমি ‘অ-পশ্চিমা’। অথচ বেশি বেকারত্ব বা অপরাধের মতো একই ধরনের আর্থসামাজিক সমস্যা থাকা অন্য এলাকাগুলিতে এই ব্যবস্থা প্রযোজ্য নয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। বর্ণবাদ ও অসহিষ্ণুতাবিরোধী ইউরোপীয় কমিশন গত মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘সমান্তরাল সমাজ’ সংক্রান্ত আইন-সহ বিভিন্ন আইন, নীতি ও প্রশাসনিক কাজে ‘অ-পশ্চিমা’ শ্রেণিটি ব্যবহার করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি।
রাষ্ট্রপুঞ্জের বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ কমিটিও ডেনমার্কের কর্তৃপক্ষকে আইন ও নীতিতে ‘পশ্চিমা’ এবং ‘অ-পশ্চিমা’ শব্দের ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। ‘সমান্তরাল সমাজ’ আইনটির ফলে জাতিগত সংখ্যালঘুরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি।
মধ্য কোপেনহাগেনের মিয়োলনারপার্কেন আবাসনের বাসিন্দারা ২০২০ সালে ডেনমার্কে এই আইনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁদের যুক্তি, তাঁরা কোথায় থাকতে পারবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের জাতিগত পরিচয়কে মাপকাঠি করা বৈষম্যমূলক এবং বেআইনি। ডিসেম্বরের রায়ের পরেও তাঁদের মামলাটি এখনও দেশের আদালতে ফেরেনি। এই আইনের কারণে ওই আবাসনের এক হাজারেরও বেশি মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নোইসমহেড-স্যুডভাই মামলাটি মিয়োলনারপার্কেনের মামলাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। শুক্রবার ও সোমবার এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা। ‘অ-পশ্চিমা’ পটভূমি বর্ণবৈষম্যবিরোধী আইনের আওতায় পড়ে কি না, সে বিষয়ে ডেনমার্কের আদালতের একটি রায় এই মামলা থেকে উঠে আসতে পারে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সিস্টেমিক জাস্টিসের আইন বিভাগের প্রধান সুশীলা ম্যাথ বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে ‘অ-পশ্চিমা’ পটভূমির সঙ্গে জাতিগত উৎসের সম্পর্ক রয়েছে এবং বিষয়টি বর্ণবৈষম্যবিরোধী আইনের আওতায় পড়ে, তা হলে ডেনমার্ক রাষ্ট্রের সামনে বিরাট প্রশ্ন উঠে আসবে।”
তাঁর বক্তব্য, সে ক্ষেত্রে এই শ্রেণিবিভাগ সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে ডেনমার্ক রাষ্ট্র। সমাজের নানা ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে পারে।
ম্যাথ বলেন, “নিজেদের সুবিধা হলে সরকার জাতিগত উৎসের কথা উল্লেখ করবে। কিন্তু আদালতের ভিতরে আপনি যা-ই তুলে ধরুন না কেন, ওরা বলবে, ‘অ-পশ্চিমা’ পটভূমির সঙ্গে জাতিগত পরিচয়ের কোনও সম্পর্ক নেই, আর তারা জাতিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করে না।”
জানা যাচ্ছে, নোইসমহেড-স্যুডভাইয়ের বাসিন্দারা মামলায় জিতলে তাঁদের নিজেদের বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হবে। চলতি মাসের শেষের দিকে এই মামলার রায় হতে পারে।
কিন্তু মিয়োলনারপার্কেনের বাসিন্দারা তাঁদের মামলার শুনানি হওয়ার পরে জয়ী হলেও নিজেদের বাড়িতে ফেরা সম্ভবত অনেক বেশি কঠিন হবে। কারণ, তাঁদের বাড়িগুলি ইতিমধ্যেই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে ডেনমার্কের শিশু, প্রবীণ নাগরিক ও আবাসন মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।