Table of Contents
ভারতীয় গবেষণায় নতুন আশার আলো, কঠিনতম ক্যানসারগুলির একটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় সাফল্য
হাইলাইটস
- মুম্বইয়ের Tata Memorial Centre-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
- মূত্রথলি অপসারণের অস্ত্রোপচারের পর রেডিয়েশন থেরাপি দিলে পেলভিসে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে।
- আট বছর ধরে চলা BART (Bladder Adjuvant Radiotherapy Trial) গবেষণায় অংশ নেয় ভারতের চারটি ক্যানসার কেন্দ্র।
- গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে Journal of Clinical Oncology-এ।
- ভারতে প্রতি বছর প্রায় ২২,৫০০ নতুন মূত্রথলি ক্যানসারের রোগী শনাক্ত হন।
ক্যানসারের চিকিৎসায় এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধু একটি নতুন গবেষণার ফল নয়, বরং রোগী ও চিকিৎসক—উভয়ের জন্যই নতুন আশার জানালা খুলে দেয়। মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বৃহৎ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল তেমনই এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মূত্রথলি বা ব্লাডার অপসারণের অস্ত্রোপচারের পরে যদি রোগীদের রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়া হয়, তাহলে শরীরের পেলভিক অঞ্চলে ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার, কারণ মূত্রথলির ক্যানসার দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ পুনরাবৃত্তির হারের জন্য পরিচিত।
বিশ্বব্যাপী ক্যানসারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল ব্লাডার ক্যানসার। ২০২২ সালে পৃথিবীজুড়ে ৬ লক্ষেরও বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ক্যানসারগুলির মধ্যে এটি নবম স্থানে রয়েছে। ভারতে প্রতিবছর প্রায় ২২,৫৪৮ জন নতুন করে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১২,৩৫৩ জনের মৃত্যু ঘটে এই রোগে। ফলে চিকিৎসার আরও কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা ছিল অত্যন্ত জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে BART বা Bladder Adjuvant Radiotherapy Trial বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আট বছর ধরে চলা এই গবেষণায় ভারতের চারটি শীর্ষ ক্যানসার কেন্দ্র অংশ নেয়। অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের একটি অংশকে অতিরিক্ত রেডিয়েশন দেওয়া হয় এবং অন্য অংশকে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে রাখা হয়। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর গবেষকরা দেখেন, যাঁরা রেডিয়েশন পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে পেলভিক অঞ্চলে ক্যানসার ফিরে আসার হার নাটকীয়ভাবে কম।
গবেষণার প্রধান অনুসন্ধানকারী ডা. Vedang Murthy-এর মতে, এই ফলাফল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্লাডার ক্যানসারের অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পরও রোগ পুনরায় ফিরে আসে। একবার পুনরাবৃত্তি ঘটলে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায় এবং রোগীর আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। নতুন গবেষণা সেই ভয়াবহ চক্র ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন অস্ত্রোপচারের পর রেডিয়েশন ব্যবহারের বিষয়ে কিছুটা দ্বিধা ছিল। কারণ পেলভিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপস্থিতির কারণে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছিল বেশি। কিন্তু আধুনিক রেডিয়েশন প্রযুক্তি এখন অনেক বেশি নির্ভুল। ফলে ক্যানসার কোষকে লক্ষ্যবস্তু করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম রেখে।
এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা ও রোগীদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে ফলাফলগুলি ভারতীয় রোগীদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক মানের ক্যানসার গবেষণায় ভারত এখন শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বরং নেতৃত্বদানকারী ভূমিকাও নিতে সক্ষম।
অবশ্য গবেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই চিকিৎসা প্রযোজ্য হবে না। কোন রোগী রেডিয়েশন থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন, তা নির্ধারণের জন্য আরও বিশদ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবুও এই গবেষণা ভবিষ্যতের চিকিৎসা-নির্দেশিকাকে প্রভাবিত করতে পারে বলেই মনে করছেন অনকোলজিস্টরা।
ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনও একক আবিষ্কার চূড়ান্ত সমাধান নয়। কিন্তু টাটা মেমোরিয়ালের এই গবেষণা দেখিয়ে দিল, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা কৌশল প্রয়োগ করলে এমনকি সবচেয়ে জটিল ক্যানসারগুলির বিরুদ্ধেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। হাজার হাজার রোগী এবং তাঁদের পরিবারের কাছে এ এক নতুন আশার বার্তা—যে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, কিন্তু জয়ের সম্ভাবনা আগের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল।