সুমন চট্টোপাধ্যায়: ইরানের দুর্গম পাহাড়ে লুকিয়ে রাখা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তাঁর হস্তগত হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যতটা উত্তেজিত দেখাতো আমাদের বাংলা চ্যানেলের হরেকরকম অ্যাঙ্করদের মাঝেমধ্যে একই রকম উত্তেজিত শোনায় ‘কন্ডোম’ শব্দটি উচ্চারণের সময়।
ভাবতে পারেন ইস্কুল কলেজের দেরাজে কন্ডোম পাওয়া যাচ্ছে! কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাওয়া যাচ্ছে, অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে, মদের খালি বোতল পাওয়া যাচ্ছে, মাটি খুঁড়ে কোটি টাকার ওষুধ উদ্ধার হচ্ছে, তা নিয়ে এদের একেবারে কোনও উত্তেজনা নেই তা নয়।লক্ষ্য করে দেখবেন কতকগুলো অব্যবহৃত রবার পাওয়া গেলেই যত সব্বোনাশ।
একটা সময় ছিল, যখন বাংলা নিউজ চ্যানেলের অ্যাঙ্কররা উত্তেজিত হতেন নির্বাচন নিয়ে, দুর্নীতি নিয়ে, বন্যা নিয়ে, যুদ্ধ নিয়ে। এখন তাঁদের একাংশের নতুন আবিষ্কার—কন্ডোম।
দেশে মূল্যবৃদ্ধি হোক, রাস্তায় গর্ত হোক, হাসপাতালের বেড না থাকুক—এসব নিয়ে যতটা না উদ্বেগ, তার চেয়ে অনেক বেশি উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে একটি ছোট্ট রবারজাত পণ্যকে নিয়ে। এমনভাবে আলোচনা চলছে যেন কন্ডোম কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপন চক্রান্তের অস্ত্র, অথবা অন্ততপক্ষে একটি আন্তঃমহাদেশীয় গুপ্তচর সংস্থা।
বেচারা কন্ডোম!
সে তো জন্ম থেকেই অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত এবং কর্তব্যপরায়ণ। সে কারও জমি দখল করে না, কারও ভোট চুরি করে না, কারও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে না। সে কেবল নিজের কাজটা করে যায়। কিন্তু বাংলা টিভির কিছু স্টুডিওতে তার প্রতি আচরণ দেখে মনে হয়, সে যেন রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার প্রধান অভিযুক্ত।
কল্পনা করুন, এক সন্ধ্যায় একটি কন্ডোম বসে খবর দেখছে।হঠাৎ পর্দায় ব্রেকিং নিউজ—
“কন্ডোম কাণ্ডে তোলপাড়!”
কন্ডোম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।সে ভাবে, “আবার কী করলাম আমি?এরপর শুরু হয় স্টুডিও ডিবেট। চারজন বক্তা, পাঁচজন বিশেষজ্ঞ, দুজন রাজনৈতিক মুখপাত্র এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি যিনি কেন এসেছেন, তা তিনিও জানেন না।সবাই চিৎকার করছেন।
কেউ বলছেন, “এটা সভ্যতার সংকেত!” কেউ বলছেন, “এটা অসভ্যতার সংকেত!”কেউ বলছেন, “এটা সাংস্কৃতিক বিপর্যয়!”আর একজন বলছেন, “এটা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত!”
বেচারা কন্ডোম আরও অবাক।সে ভাবছে, “আমি তো শুধু একটি স্বাস্থ্যসামগ্রী। কখন যে চক্রান্তের দোসর হয়ে গেলাম!”
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এই আলোচনাগুলিতে কন্ডোমকে এমন এক রহস্যময় বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম তার আবির্ভাব ঘটেছে। মনে হয়, কলম্বাস যেমন আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন, তেমনই কোনো প্রতিবেদক সদ্য কন্ডোম আবিষ্কার করেছেন।
প্রতিবেদনের ভাষাও দেখার মতো। একজন রিপোর্টার অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলছেন—“ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে… কিছু… বিশেষ… সামগ্রী…”এখানে “বিশেষ” শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়ে তাঁর গলায় এমন নাটকীয়তা চলে আসে, যেন মঙ্গলগ্রহ থেকে এলিয়েন প্রযুক্তি উদ্ধার হয়েছে।
তারপর ক্যামেরা জুম করে।তারপর লাল বৃত্ত আঁকা হয়।তারপর তীরচিহ্ন দেওয়া হয়।তারপর স্ক্রিনে লেখা ওঠে—
EXCLUSIVE
দর্শক ভাবেন, “আচ্ছা, এত উত্তেজনার কারণটা কী?”
আসলে কন্ডোমের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সে খুবই সাধারণ।সাধারণ জিনিস সংবাদমাধ্যমের পক্ষে বিপজ্জনক। কারণ সাধারণ জিনিসে নাটক কম।তাই তাকে অসাধারণ বানাতে হয়। যে জিনিস বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসচেতনতার অংশ হিসেবে ব্যবহার করে, সেটাকেই এমনভাবে দেখানো হয় যেন এটি কোনো গোপন তান্ত্রিক আচার অনুষ্ঠানের উপকরণ।
এদিকে কন্ডোমের নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভাবুন।সে হয়তো বলছে,“দেখুন, আমি তো বরাবরই প্রতিরোধের পক্ষে। আমি ঝামেলা কমাতে চাই। আমি সমস্যার সংখ্যা কমাই। অথচ আমার নাম শুনলেই এত মানুষ সমস্যায় পড়ে যান কেন?”
এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত কোনো নিউজ স্টুডিও দিতে পারবে না।কারণ আধুনিক টেলিভিশনের একটা অলিখিত নিয়ম আছে, যে বিষয় যত সাধারণ, তাকে তত অসাধারণ করে তুলতে হবে।
একটি গর্তে জল জমেছে? না, সেটা খবর নয়।কিন্তু যদি সেই গর্তের পাশে একটি কন্ডোম পাওয়া যায়, তবে সেটি হয়ে ওঠে জাতীয় বিতর্কের বিষয়। গর্তের পাশে সে কী করে এল? গর্তের ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে টিএমসির পার্টি অফিস।সেখানে থেকেই প্যান্টের চেইন আটকাতে আটকাতে গভীর রাতে কোনও দুষ্কৃতি সেটা ফেলে গেল নাকি! লোকে আর গর্ত দেখছেনা, সবার চোখ ওই একটি বস্তুতে নিবদ্ধ। পুলিশও ঘটনাস্থলে এসেছে। তারা ভাবছে ন্যায় সংহিতার কোন ধারায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির নামে এফ আই আর রুজু করা যায়!
এমনকি কখনও কখনও মনে হয়, কিছু অ্যাঙ্কর কন্ডোমকে দেখে সেই আনন্দ পান, যে আনন্দ একসময় প্রত্নতত্ত্ববিদেরা ডাইনোসরের হাড় দেখে পেতেন।তাঁদের চোখে বিস্ময়।গলায় উত্তেজনা।হাতে কাগজ। মুখে গুরুগম্ভীর অভিব্যক্তি।
আরও মজার বিষয় হলো, যেসব দেশে স্বাস্থ্যশিক্ষা যত উন্নত, সেখানে কন্ডোম নিয়ে উত্তেজনা তত কম। আর যেখানে উত্তেজনা বেশি, সেখানে কন্ডোমকে দেখে মনে হয় যেন সে কোনো রহস্যময় সাহিত্যিক চরিত্র। কেউ তাকে দেখে চমকে ওঠেন। কেউ তাকে দেখে ক্ষুব্ধ হন। কেউ তাকে দেখে সভ্যতার পতন ঘোষণা করেন।কিন্তু কেউ তাকে তার আসল পরিচয়ে দেখতে চান না—একটি সাধারণ জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট পণ্য হিসেবে।
ভাবুন তো, যদি একদিন কন্ডোম প্রেস কনফারেন্স ডাকে! সে বলতে“বন্ধুগণ, আমি অত্যন্ত ক্লান্ত। আমি কোনো রাজনৈতিক দল নই। আমি কোনো মতাদর্শ নই। আমি কোনো ষড়যন্ত্রেও নই। আমাকে নিয়ে প্রতিদিন প্রাইম টাইম বিতর্ক করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার জীবন অত্যন্ত সাদামাটা। আপনারা আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন।”
তারপর সাংবাদিকদের প্রশ্ন।“আপনি কি আন্তর্জাতিক শক্তির হয়ে কাজ করেন?”“আপনার বিরুদ্ধে সংস্কৃতি নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে, কী বলবেন?”“আপনার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পিছনে কারা আছে?”
কন্ডোম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“আমি সত্যিই জানি না। আমি তো শুধু আমার কাজটাই করি।”
শেষ পর্যন্ত এই কাহিনির সবচেয়ে করুণ চরিত্র সম্ভবত কন্ডোম নিজেই।সে পৃথিবীতে এসেছে ঝামেলা কমাতে।কিন্তু বাংলা টিভির কিছু স্টুডিওতে ঢুকতেই সে নিজেই ঝামেলার কারণ হয়ে যায়। একটি নিরীহ রবারজাত বস্তু, যার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য প্রতিরোধ, তাকে এমনভাবে বিচার করা হয় যেন সে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধী।
তাই কন্ডোমের প্রতি আমাদের সামান্য সহানুভূতি থাকা উচিত। সে কোনো বিপ্লব চায় না। কোনো বিতর্ক চায় না। কোনো প্রাইম টাইম শোও চায় না।সে শুধু চায়, মানুষ তাকে নিয়ে একটু কম চিৎকার করুক।কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম, একটি স্বাস্থ্যসামগ্রীকে তার নিজের অস্তিত্বের জন্য টেলিভিশনের কাছে বারবার জবাবদিহি করতে হচ্ছে।
বেচারা কন্ডোম এখনও বুঝে উঠতে পারেনি—সে আসলে জনস্বাস্থ্যের বন্ধু, নাকি বাংলা নিউজ চ্যানেলের স্থায়ী অতিথি।