বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে অনুষ্ঠান জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের স্মরণে আয়োজিত হওয়ার কথা ছিল, লেখকের মতে সেটি শুরু থেকেই অন্য রূপ নেয়। অনুষ্ঠানের আগের দিন সমর্থকদের কাছে পাঠানো আমন্ত্রণবার্তায় “আমেরিকা ফিরে এসেছে” স্লোগানের সঙ্গে সবচেয়ে বড় করে ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি। পেছনে ছিল ওয়াশিংটন মনুমেন্ট, আর আকাশে যুদ্ধবিমান—যেন একটি রাজনৈতিক প্রচারণার পোস্টার।
লেখকের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্র ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রচারের সীমারেখা ক্রমশ মুছে দেওয়া। স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির মতো জাতীয় অনুষ্ঠানও সেই প্রবণতার বাইরে থাকেনি। যে উপলক্ষটি সব রাজনৈতিক মতের মানুষের মিলনের ক্ষেত্র হতে পারত, সেটিকে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও জনপ্রিয়তা তুলে ধরার মঞ্চে পরিণত করেছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরিবেশও লেখকের কাছে ছিল অস্বাভাবিক। সামরিক কোরাসের গান, যুদ্ধবিমানের প্রদর্শনী এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রশংসাবাক্য—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিকতা ও রাজনৈতিক প্রচারের মধ্যে পার্থক্য প্রায় বিলীন হয়ে যায়। একজন মন্ত্রী দর্শকদের পরিবার গঠন ও বেশি সন্তান নেওয়ার পরামর্শও দেন, যা অনুষ্ঠানটিকে আরও রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক রূপ দেয়।
এরপর ট্রাম্প বক্তৃতায় দাবি করেন, তাঁর ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং দেশের ক্ষমতা “দূরের রাজনৈতিক অভিজাতদের” কাছ থেকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যদিও বক্তৃতায় কিছু প্রস্তুত করা অংশ ছিল, বেশির ভাগ সময় তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সমসাময়িক রাজনীতি, ইরান, জ্বালানির দাম, সীমান্ত, করনীতি ও বিশ্বকাপ ফুটবল পর্যন্ত নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। লেখকের পর্যবেক্ষণ, স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের বদলে এটি অনেকটাই নির্বাচনী জনসভার আবহ তৈরি করে।
লেখকের বিশ্লেষণে, হোয়াইট হাউসের মূল কৌশল ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাঁর মাগা আন্দোলন এবং মার্কিন দেশপ্রেমকে একই প্রতীকে পরিণত করা। স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির জাতীয় উদ্যাপনকে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে ট্রাম্পকে কেবল একজন রাষ্ট্রপতি নয়, বরং আমেরিকার পুনর্জাগরণের প্রধান প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা যায়।
এই প্রচেষ্টার নানা দৃষ্টান্তও সামনে আসে। ট্রাম্পের প্রতিকৃতি স্মারক মুদ্রায় স্থান পায়। এমনকি তাঁর ছবি-সংবলিত ২৫০ ডলারের নোট চালুর ধারণাও আলোচনায় আসে। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ভবনের গায়ে পাশাপাশি ঝুলিয়ে দেওয়া হয় দুই বিশাল প্রতিকৃতি—এক পাশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন, অন্য পাশে ট্রাম্প। একজনের পরিচয় ছিল “আমেরিকার প্রথম”, অন্যজনের পরিচয় “আমেরিকা ফার্স্ট”। লেখকের মতে, এই বিন্যাস ছিল সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
কিন্তু এই প্রচারের সঙ্গে জনমতের একটি স্পষ্ট বৈপরীত্যও তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি সমর্থন প্রায় ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা মূলত তাঁর অনুগত সমর্থকগোষ্ঠীর আকারের সমান। ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের কর্তৃত্ববাদী আচরণ—এসব কারণে জনপ্রিয়তা চাপে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি তথ্য এসেছে গ্যালপ-এর দীর্ঘমেয়াদি জরিপ থেকে। ২০০১ সালে যেখানে ৮৭ শতাংশ মানুষ নিজেদের “খুব গর্বিত” বা “অত্যন্ত গর্বিত” আমেরিকান বলে মনে করতেন, এখন সেই হার নেমে এসেছে ৫৮ শতাংশে। শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই নয়, নির্দলীয় ভোটারদের মধ্যেও এই পতন স্পষ্ট। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই শ্রেণির ভোটারদের মনোভাব রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে লেখক মনে করেন।
প্রথম পরিকল্পনা ছিল, প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব প্রদর্শনী থাকবে, পরে হবে একাধিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায়। ঘোষিত শিল্পীদের বড় অংশ অনুষ্ঠান থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন। প্রতিবেদনের মতে, তাঁরা রাজনৈতিকভাবে বিভাজনমূলক অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের নাম জড়াতে চাননি। ফলে আয়োজকদের সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা কার্যত ভেঙে পড়ে।
এরপর ট্রাম্প সেই সমালোচনাকেই রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেন। তিনি বলেন, ব্যয়বহুল গায়কদের প্রয়োজন নেই; অনুষ্ঠানের আসল আকর্ষণ তিনিই। নিজের সামাজিক মাধ্যমে তিনি এমনও দাবি করেন যে, তাঁর সমাবেশে যত মানুষ আসে, তা নাকি এলভিস প্রিসলির জনপ্রিয়তার সঙ্গেও তুলনীয়।
লেখকের মতে, এর ফলে স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির উদ্যাপন ধীরে ধীরে একটি জাতীয় স্মরণানুষ্ঠান থেকে সরে এসে এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের রূপ নিতে শুরু করে।
প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালের উদ্যাপনের সঙ্গে ১৯৭৬ সালের মার্কিন স্বাধীনতার দ্বিশতবার্ষিকী উদ্যাপনের তুলনা করেছে। লেখকের মতে, দুই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র নানা সংকটে ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রপতিরা সেই সংকট মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিলেন।
১৯৭৬ সালে ক্ষমতায় ছিলেন জেরাল্ড ফোর্ড। তার আগে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জেরে রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগ, ভিয়েতনাম যুদ্ধের তিক্ত সমাপ্তি, জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দেশ বিপর্যস্ত ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ফোর্ড স্বাধীনতার ২০০ বছর পূর্তিকে জাতীয় আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠাতা আদর্শ, স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্ব তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।
ফোর্ডের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—স্বাধীনতা এমন এক মূল্যবোধ, যাকে প্রতিনিয়ত রক্ষা ও লালন করতে হয়। তাঁর মতে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সরকারের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে নয়, বরং সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লেখা হয়েছিল। তাই আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার নিজে শত্রু নয়; বরং মানুষের কল্যাণে একটি প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। লেখকের মতে, ফোর্ড জাতীয় ঐক্যের ভাষায় কথা বলেছিলেন।
এর বিপরীতে, ২০২৬ সালের উদ্যাপনে ট্রাম্পের কৌশল ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দেশকে দুটি শিবিরে ভাগ করে দেখতে চান—একদিকে তাঁর সমর্থকেরা, যাঁদের তিনি প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে তুলে ধরেন; অন্যদিকে বিরোধীরা, যাঁদের তিনি আমেরিকাকে দুর্বল করে দেওয়া শক্তি হিসেবে চিত্রিত করেন।
এই বিভাজন শুধু রাজনৈতিক নয়, আদর্শগতও। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নতুন প্রগতিশীল নেতাদের বিরুদ্ধে “কমিউনিস্ট” শব্দ ব্যবহার, তাঁদের “মার্ক্সবাদী” বলে আক্রমণ—এসব উদাহরণ তুলে ধরে লেখক বলেন, দেশপ্রেমকে এখন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। ফলে দেশপ্রেম আর সবার অভিন্ন পরিচয় নয়; বরং তা হয়ে উঠছে একচেটিয়া রাজনৈতিক দাবি।
প্রতিবেদনটি আরও বলছে, এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক ধরনের রক্ষণশীল সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি। সেখানে একটি শ্বেতাঙ্গ, খ্রিস্টান-প্রধান আমেরিকার কল্পচিত্রকে সামনে আনা হচ্ছে। আদিবাসীদের ইতিহাস, দাসপ্রথার উত্তরাধিকার কিংবা জাতিগত বৈষম্যের মতো জটিল বিষয়গুলিকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং সেগুলি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। লেখকের মতে, এর ফলে আমেরিকার বহুমাত্রিক ইতিহাসকে একটি সরল ও রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক বর্ণনায় সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনের শেষ অংশে লেখক যুক্তি দিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু বর্তমানের রাজনীতি নয়; অতীতের ব্যাখ্যাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা। ২০২৫ সালের মার্চে জারি হওয়া একটি নির্বাহী আদেশের উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রশাসন অভিযোগ করেছে যে গত এক দশকে মার্কিন ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে দেশটিকে মূলত বর্ণবাদী, বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। এই প্রবণতা থামাতেই সরকারি জাদুঘর ও ঐতিহাসিক প্রদর্শনীর ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
লেখকের মতে, এখানেই বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়। ইতিহাসের ব্যাখ্যা কি ইতিহাসবিদদের হাতে থাকবে, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতে? তাঁর যুক্তি, যখন রাষ্ট্রই ঠিক করে দেয় অতীতকে কীভাবে মনে রাখতে হবে, তখন ইতিহাস গবেষণার জায়গা দখল করে নেয় রাজনৈতিক মতাদর্শ। স্মৃতি, বিতর্ক ও জটিল বাস্তবতার পরিবর্তে সামনে আসে বাছাই করা জাতীয় পুরাণ।
প্রতিবেদনটি আরও বলছে, ২৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ভাষা ও প্রতীকও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। হোয়াইট হাউসের বার্তায় নাগরিকদের “ঈশ্বরের অধীনে এক গৌরবময় জাতি” হিসেবে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্নবীকরণের আহ্বান জানানো হয়। লেখকের বিশ্লেষণ, এটি কেবল দেশপ্রেমের ভাষা নয়; বরং খ্রিস্টীয় জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাঁর মতে, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে খুব ধর্মপ্রাণ হিসেবে পরিচিত না হলেও, এই মতাদর্শকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন।
প্রতিবেদনটি শেষ হয়েছে ওয়াশিংটনের একটি ছোট কিন্তু প্রতীকী ঘটনাকে কেন্দ্র করে। লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সামনে বিখ্যাত প্রতিফলন-পুকুর সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। অল্প খরচে এটিকে আগের চেয়ে সুন্দর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সংস্কারের পর জল সবুজ হয়ে যায়, শৈবাল জমে, রং উঠে যেতে থাকে। সমালোচনা বাড়তেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায় চাপানো হয় কথিত “ভাঙচুরকারীদের” ওপর। চারদিকে বেড়া দেওয়া হয়, পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং তদন্তের কথাও বলা হয়।
লেখকের কাছে এই ঘটনাটি শুধুই একটি ব্যর্থ সংস্কার প্রকল্প নয়। তাঁর ব্যাখ্যায়, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতীক—উচ্চকণ্ঠ প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার, সমালোচনার মুখে দোষ অন্যের ওপর চাপানো এবং প্রতিটি জাতীয় ইস্যুকে রাজনৈতিক সংঘর্ষে রূপান্তরিত করা।