দেশ

‘বন্দে মাতরম্’ না গাইলেই শাস্তি নয়, বহাল ১৯৮৬-র রায়

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ‘নকশালপন্থীর ভাবনা মেনে আইন তৈরি হতে পারে না’—সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার মন্তব্যে তীব্র আপত্তি জানালেন সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণের আইনজীবী।
  • ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া নিয়ে মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানাল, বিবেকগত বা ধর্মবিশ্বাসজনিত আপত্তির কারণে কেউ গানটি গাইতে না চাইলে তাঁকে ফৌজদারি শাস্তির মুখে ফেলা…
  • এ বিষয়ে ১৯৮৬ সালের বিজয় ইমানুয়েল মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের ঘোষিত আইনি অবস্থান এখনও বহাল রয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

‘নকশালপন্থীর ভাবনা মেনে আইন তৈরি হতে পারে না’—সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার মন্তব্যে তীব্র আপত্তি জানালেন সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণের আইনজীবী।

‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া নিয়ে মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানাল, বিবেকগত বা ধর্মবিশ্বাসজনিত আপত্তির কারণে কেউ গানটি গাইতে না চাইলে তাঁকে ফৌজদারি শাস্তির মুখে ফেলা যায় না। এ বিষয়ে ১৯৮৬ সালের বিজয় ইমানুয়েল মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের ঘোষিত আইনি অবস্থান এখনও বহাল রয়েছে।

শুনানিতে কৃষ্ণের আবেদনের বিরোধিতা করতে গিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, “নকশালপন্থীর ভাবনা অনুযায়ী আইন তৈরি হতে পারে না।” কৃষ্ণের আইনজীবী মুরলীধর এর প্রতিবাদ করে মন্তব্যটি প্রত্যাহারের দাবি জানান। মেহতা অবশ্য তা প্রত্যাহার করেননি। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, ওই মন্তব্য আদালত আমলে নেয়নি; বিচারাধীন সাংবিধানিক প্রশ্নেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনা।

কৃষ্ণের আবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ছ’টি স্তবকই গাওয়ার নির্দেশিকা সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করছে। কারণ, শেষ চারটি স্তবকে হিন্দুধর্মের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

বিচারপতি বাগচী বলেন, “জাতীয় স্তোত্রে কোনও নির্দিষ্ট দেবতা বা ঈশ্বরের কোনও বিশেষ রূপের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন থাকলে তা হয়তো ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রভাবিত করে না। কিন্তু বিবেকগত কারণে আপত্তি রয়েছে এমন কাউকে শাস্তির মুখে ফেলা যায় কি না, আপনার এই প্রশ্নটি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন হতে পারে।”

তিনি জানান, এ বিষয়ে বর্তমান আইনি অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে ‘বিজয় ইমানুয়েল ও অন্যান্য বনাম কেরল রাজ্য ও অন্যান্য’ মামলার রায়ে। ১৯৮৬ সালের ওই মামলায় জেহোভার সাক্ষি সম্প্রদায়ের কয়েক জন পড়ুয়া জাতীয় সঙ্গীত চলাকালে সম্মানের সঙ্গে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেও তা গাইতে অস্বীকার করেছিল। সেই কারণে তাদের স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, ওই বহিষ্কার তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে।

বিচারপতি বাগচী বলেন, “বিজয় ইমানুয়েল মামলায় এই আদালত যে আইন ঘোষণা করেছে, দেশের সেই আইন মেনেই বর্তমান আইনটি প্রয়োগ করা হবে বলে আমরা আশা করব। জাতীয় স্তোত্র কোনটি, তা নিয়ে কোনও বিরোধ নেই। বিজয় ইমানুয়েল মামলায় ঘোষিত আইনি অবস্থান এখনও প্রশ্নের মুখে পড়েনি।”

মুরলীধর বলেন, “আইন সংশোধন করতে গিয়ে তাঁরা ‘জাতীয় স্তোত্র’ কথাটি যুক্ত করেছেন। কিন্তু জাতীয় স্তোত্র বলতে কী বোঝায়, আইনে তার সংজ্ঞা নেই। এটি আইনের একটি গুরুতর ত্রুটি। এর অপব্যবহার হতে পারে। কারণ, তাঁরা যে দফতরি স্মারকলিপিটি এনেছেন, সেটি এমনকি গেজেটেও প্রকাশিত হয়নি। কোন বিধানের অধীনে এটি আনা হয়েছে, জানি না; তাঁরা কোনও বিধানের উল্লেখও করেননি।”

কেন্দ্র ১৯৭১ সালের জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ আইনের ৩ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘জন গণ মন’-এর মতো ‘বন্দে মাতরম্’-কেও একই আইনি সুরক্ষা দিয়েছে।

আবেদনকারীর বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে মেহতা বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা কখনও এত সংকীর্ণ হতে পারে না।”

মুরলীধর বলেন, “কোনও দণ্ডমূলক আইন অস্পষ্ট থাকতে পারে না। আইনে জাতীয় স্তোত্রের সংজ্ঞা দিচ্ছেন না, অথচ বিষয়টিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনছেন।”

বিচারপতি বাগচী বলেন, “প্রথা ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী জাতীয় স্তোত্র বলতে বরাবরই ‘বন্দে মাতরম্’-কে বোঝানো হয়েছে।”

মুরলীধর সঙ্গে সঙ্গে বলেন, “কিন্তু কেবল দু’টি স্তবক। ৮০ বছর পরে এই প্রথম তাঁরা আমাদের বলার চেষ্টা করছেন, দু’টি স্তবক নয়। সেই কারণেই ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করলে কিছুটা জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা হতে হবে। জোর করে চাপিয়ে দিতে পারেন না, শাস্তির ব্যবস্থাও করতে পারেন না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় সেটাই।”

বিচারপতি বাগচী বলেন, শাস্তির বিধান কত দূর প্রযোজ্য হতে পারে, তা “খতিয়ে দেখা প্রয়োজন”।

মেহতা বলেন, “এই চাঞ্চল্য সৃষ্টির চেষ্টার মধ্যে জাতীয় স্তোত্রকে টেনে আনবেন না। প্রত্যেক আধিকারিক ‘জয় হিন্দ’ বলেন। কিন্তু সংবিধানে তো ‘জয় হিন্দ’-এর উল্লেখ নেই।”

আদালতকে নোটিস জারি না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, তাতে শুধু “চাঞ্চল্য তৈরি হবে, আর সেটিই উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছে”।

বিচারপতি বাগচী বলেন, “সলিসিটর মহাশয়, চাঞ্চল্য সৃষ্টির জন্য কোনও নোটিস জারি করার ইচ্ছা আমাদের নেই। কিন্তু বিজয় ইমানুয়েল মামলায় এই আদালত যে আইন ঘোষণা করেছে, সেই আইন মেনেই বর্তমান আইনটি প্রয়োগ করা হবে বলে আমরা আশা করব। জাতীয় স্তোত্র কোনটি, তা নিয়ে বিরোধ নেই। বিজয় ইমানুয়েল মামলায় ঘোষিত আইনি অবস্থান এখনও প্রশ্নের মুখে পড়েনি।”

তিনি আরও বলেন, “জাতীয় স্তোত্র কী হবে, দু’টি স্তবক না চারটি স্তবক—তা নির্ধারণ করা এবং জাতির আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাজ। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন তাঁর ২৫ বা ২৬ অনুচ্ছেদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, কিংবা বিবেকগত কারণে তাঁর আপত্তি থাকে, তা হলে তাঁকে শাস্তির মুখে ফেলা যাবে না।”

বিচারপতি বাগচী বলেন, “‘বন্দে মাতরম্’-এর সঙ্গে জড়িত জাতীয় আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা কী, তা নতুন করে বিচার করা আদালতের কাজ নয়। সেটি রাষ্ট্রের বিষয়। বিবেকগত আপত্তি থাকলে কেউ জাতীয় স্তোত্রের একটি বা সব ক’টি স্তবকই উচ্চারণ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। রাষ্ট্র তাঁকে সে জন্য ফৌজদারি শাস্তির মুখে ফেলবে না।”

এই সময় মেহতা বলেন, “সংবিধান মেনেই আইন তৈরি হয়। নকশালপন্থীর ভাবনা অনুযায়ী আইন তৈরি হতে পারে না।”

মুরলীধর প্রতিবাদ করে বলেন, “উনি এইমাত্র যে কথাটি ব্যবহার করলেন, তা প্রত্যাহার করবেন। এই শুনানি সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে। ভারতের সলিসিটর জেনারেলের মুখে এমন কথা সরাসরি সম্প্রচারিত হোক, আমি চাই না। আমি তীব্র আপত্তি জানাচ্ছি।”

এর পর দু’পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। বিচারপতি বাগচী বলেন, “অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা ও আবেগ” তৈরি হচ্ছে।

মুরলীধর বলেন, “সরকারের আইন আধিকারিক কেন এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করছেন? এক জন আইন আধিকারিকের মুখে এ কথা শোভা পায় না।”

প্রধান বিচারপতি জানান, বেঞ্চ আইনি প্রশ্নটি খতিয়ে দেখার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছে। মেহতাকে দু’সপ্তাহের মধ্যে জবাবি হলফনামা জমা দিতে বলা হয়।

আদালতের নির্দেশ লেখা হয়ে যাওয়ার পর মুরলীধর আবারও মেহতাকে মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। মেহতা জবাব দেন, “আমি যা বলেছি, আবারও বলব।”

বিচারপতি বাগচী বলেন, “ওই মন্তব্যগুলি আমরা আমলে নিইনি। আমরা সাংবিধানিক প্রশ্নের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছি।”

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles