Table of Contents
হাইলাইটস:
- ১৯৭৬ সালের নগর ভূমি (সিলিং ও নিয়ন্ত্রণ) আইন পুনর্বিবেচনার ঘোষণা।
- বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পে জমি সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইনটিকে অন্যতম বাধা হিসেবে দেখছে সরকার।
- শহরাঞ্চলে জমির সর্বোচ্চ মালিকানা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণীত হয়েছিল।
- সরকারের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই আইন বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
- শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস ও আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগ আনতে নীতিগত সংস্কারের ইঙ্গিত।
বাংলাস্ফিয়ার: দেশে বড় শিল্প ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে কেন্দ্র সরকার ১৯৭৬ সালের নগর ভূমি (সিলিং ও নিয়ন্ত্রণ) আইন বা আরবান ল্যান্ড সিলিং আইনের কার্যকারিতা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের মতে, কয়েক দশক আগে প্রণীত এই আইন বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং আধুনিক পরিকাঠামো নির্মাণের যুগে বৃহৎ পরিসরের জমির প্রয়োজন হয়। কিন্তু পুরনো আইনগত কাঠামো এবং তার নানা বিধিনিষেধের কারণে বহু প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয় না। ফলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমে যায়।
কেন আনা হয়েছিল এই আইন?
১৯৭৬ সালে তৎকালীন কেন্দ্র সরকার নগর ভূমি (সিলিং ও নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শহরাঞ্চলে অল্প কয়েকজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিপুল পরিমাণ জমির মালিকানা কেন্দ্রীভূত হওয়া রোধ করা।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দ্রুত নগর বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জমির দাম বাড়তে থাকে। বড় ব্যবসায়ী ও জমি জল্পনাকারীদের হাতে বিপুল পরিমাণ নগর জমি জমা হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকার নির্দিষ্ট সীমার বেশি নগর জমি ব্যক্তিগত মালিকানায় রাখার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।
আইনের আওতায় নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত জমি সরকার অধিগ্রহণ করতে পারত। সেই জমি পরে আবাসন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প অথবা ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের কাজে ব্যবহারের কথা ছিল।
কেন বিতর্কিত হয়ে ওঠে?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। শিল্প মহল ও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মতে, আইনটি তার ঘোষিত উদ্দেশ্য পূরণে খুব বেশি সফল হয়নি।
সমালোচকদের বক্তব্য ছিল—
- অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
- জমি ক্রয়-বিক্রিয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হয়েছে।
- নগর উন্নয়ন প্রকল্পে বিলম্ব ঘটেছে।
- আবাসন খাতে জমির সরবরাহ কমেছে।
- বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
অনেক রাজ্য সরকারও মনে করেছিল, এই আইন বাস্তবে উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
১৯৯৯ সালের বড় পরিবর্তন
এই সমালোচনার প্রেক্ষিতে কেন্দ্র ১৯৯৯ সালে নগর ভূমি (সিলিং ও নিয়ন্ত্রণ) আইন বাতিলের জন্য একটি প্রত্যাহার আইন আনে। তবে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী জমি রাজ্যের বিষয় হওয়ায় প্রত্যেক রাজ্যকে পৃথকভাবে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।
ফলে কিছু রাজ্য আইনটি বাতিল করে দেয়, আবার কয়েকটি রাজ্য দীর্ঘদিন তা বহাল রাখে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি সংক্রান্ত নীতিতে বৈচিত্র্য তৈরি হয়।
যেসব রাজ্য আইনটি প্রত্যাহার করেছে, সেখানে শিল্প ও আবাসন প্রকল্প তুলনামূলকভাবে দ্রুত এগিয়েছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞের মত। অন্যদিকে, যেখানে আইন বা তার প্রভাব দীর্ঘদিন বজায় ছিল, সেখানে জমি সংক্রান্ত জটিলতা বেশি দেখা গেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেন পুনর্বিবেচনা?
ভারত বর্তমানে উৎপাদন, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক, লজিস্টিকস হাব, গুদাম পরিকাঠামো এবং নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উপর জোর দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের সুযোগ কাজে লাগাতে কেন্দ্র চাইছে বিদেশি এবং দেশীয় উভয় ধরনের বৃহৎ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে শিল্পগোষ্ঠীগুলি অভিযোগ করেছে যে বড় প্রকল্পের জন্য একত্রে পর্যাপ্ত জমি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারের ধারণা, পুরনো জমি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা গেলে বহু হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
বিশেষত—
- শিল্প করিডর,
- স্মার্ট সিটি,
- ডেটা সেন্টার,
- গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার,
- লজিস্টিকস পার্ক,
- বিমানবন্দর ও বন্দর সংলগ্ন উন্নয়ন প্রকল্প
এসব ক্ষেত্রে বৃহৎ জমির প্রয়োজন হয়।
বিনিয়োগ ও নগর উন্নয়নের নতুন সমীকরণ
সরকার মনে করছে, আগামী দশকে ভারতের নগর জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। সেই অনুযায়ী নতুন আবাসন, পরিবহণ ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং শিল্প অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের একাংশের মতে, জমির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হলে আবাসনের দাম বাড়ে এবং শহর পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জমির ব্যবহার আরও নমনীয় এবং বাজারমুখী করার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইনটি মূলত তৈরি হয়েছিল জমির অসম বণ্টন রোধ করার জন্য। ফলে সম্পূর্ণ উদারীকরণের পথে গেলে নতুন করে জমি কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মত
নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশের মতে, আইনটির পুরনো কাঠামো সংশোধন করা প্রয়োজন হলেও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। শুধু শিল্প বিনিয়োগের স্বার্থে জমির উপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলে ভবিষ্যতে আবাসন বৈষম্য এবং জমি জল্পনার সমস্যা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে শিল্পমহল বলছে, স্বচ্ছ ও সহজ জমি নীতি ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা কঠিন। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশ দ্রুত জমি বরাদ্দের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। ভারতকেও সেই পথে এগোতে হবে।
কী হতে পারে আগামী পদক্ষেপ?
সরকার এখন আইনটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখবে। বিশেষজ্ঞ কমিটি, রাজ্য সরকারের মতামত এবং শিল্পমহলের পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন সুপারিশ আসতে পারে।
সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে—
- জমির মালিকানা সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার পুনর্মূল্যায়ন,
- নগর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিশেষ বিধান,
- শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্রুত অনুমোদন,
- আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষা,
- ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড এবং স্বচ্ছ জমি বাজার গঠন।
সব মিলিয়ে, প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরনো নগর ভূমি সিলিং আইনকে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। সরকার মনে করছে, এই সংস্কার দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।