হাইলাইটস:
- হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের জন্য ‘টোল’ নয়, ‘সেবামূলক ফি’ নেওয়ার কথা জানাল ইরান।
- আন্তর্জাতিক আইনে প্রাকৃতিক জলপথে টোল আরোপের সুযোগ নেই, তবে নির্দিষ্ট পরিষেবার জন্য ফি নেওয়া যেতে পারে।
- যুদ্ধের আগে হরমুজে কোনও ধরনের অর্থপ্রদান ছাড়াই জাহাজ চলাচল করত।
- বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইরানের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন ব্যয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
- ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে।
বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ঘোষণা করেছিলেন যে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে যাবে এবং তা “চিরস্থায়ীভাবে টোলমুক্ত” থাকবে, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি আগের অবস্থায় ফিরবে। কিন্তু সোমবার ইরানের বক্তব্য সেই আশাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তেহরান জানিয়েছে, তারা সরাসরি কোনও ‘টোল’ আরোপ করতে চায় না। তবে প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলির কাছ থেকে ‘সেবা প্রদানের বিনিময়ে’ ফি নেওয়া হবে। আপাতদৃষ্টিতে শব্দের এই পার্থক্য সামান্য মনে হলেও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের দৃষ্টিতে এর তাৎপর্য বিপুল।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রাণরেখা। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হওয়া বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই যায়। ফলে এখানে সামান্য পরিবর্তনও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেছেন, “আমরা ট্রানজিট টোল আরোপ করতে চাই না। তবে যে পরিষেবা দেওয়া হবে, তার জন্য ফি নেওয়া হবে।” কিন্তু সেই পরিষেবাগুলি কী, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। ইরানের কিছু কর্মকর্তা পরিবেশগত রক্ষণাবেক্ষণ বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত পরিষেবার কথা উল্লেখ করেছেন।
সমস্যা হল, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন প্রাকৃতিক জলপথে অবাধ যাতায়াতের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। হরমুজ, মালাক্কা বা তাইওয়ান প্রণালীর মতো প্রাকৃতিক পথ ব্যবহার করতে কোনও রাষ্ট্র সাধারণত অর্থ দাবি করতে পারে না। অন্যদিকে সুয়েজ খাল বা পানামা খালের মতো কৃত্রিম জলপথে টোল আদায় বৈধ, কারণ সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ, নাব্যতা ও পরিকাঠামোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশ ব্যয় বহন করে।
মার্কিন নৌ-যুদ্ধ কৌশল বিশেষজ্ঞ জেমস আর. হোমসের মতে, “আন্তর্জাতিক আইনে কোনও উপকূলবর্তী রাষ্ট্র প্রাকৃতিক জলপথ ব্যবহার করার জন্য অর্থ নিতে পারে না, সেটা টোল বলুন বা ফি বলুন।” তাঁর মতে, হরমুজে ইরানের একমাত্র ‘পরিষেবা’ যদি হয় জাহাজে হামলা না করা, তবে তা বৈধ পরিষেবার সংজ্ঞায় পড়ে না।
আসলে এই বিতর্কের সূত্রপাত যুদ্ধ চলাকালীন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার জবাবে ইরান আঞ্চলিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে লক্ষ্য করে একাধিক আক্রমণ চালায়। এরপর মার্চ মাসে প্রথমবার ইরানি কর্মকর্তারা হরমুজে যাতায়াতের জন্য অর্থ নেওয়ার ধারণা সামনে আনেন।
মে মাসে তেহরান ‘পার্সিয়ান গাল্ফ স্ট্রেট অথরিটি’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করে। তাদের দাবি, এই সংস্থা নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতি এবং নৌপথ পরিচালনার কাজ করবে। একই সময়ে ওমানের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থপ্রদানের একটি কাঠামো নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
তবে সমালোচকদের মতে, এর ফলে হরমুজের যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থা আর ফিরবে না। এতদিন যে পথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য কার্যত উন্মুক্ত ছিল, সেখানে এখন নতুন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, অনুমতি এবং অর্থপ্রদানের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “আমরা আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করব এবং হরমুজে কোনও টোল যাতে না বসে, তার জন্য যা করার প্রয়োজন তা করব।”
ট্রাম্প প্রশাসনও এই বিষয়ে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান নিয়েছে। গত মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমরা চাই এই পথ সম্পূর্ণ মুক্ত থাকুক। কোনও টোল চাই না।” মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “এটা হতে পারে না। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এমন হলে কূটনৈতিক সমঝোতাই ভেঙে পড়বে।”
তবে বাস্তবতা হল, যুদ্ধবিরতির পরও হরমুজকে ঘিরে বিরোধ শেষ হয়নি। ‘টোল’ শব্দটি এড়িয়ে ‘ফি’ ব্যবহার করে ইরান আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁকফোকর খোঁজার চেষ্টা করছে বলে অনেকের ধারণা। কিন্তু বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলি যদি এই ব্যবস্থাকে মেনে না নেয়, তাহলে নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এই ফি আদায়ের ব্যবস্থা কার্যকর হলে তার খরচ শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে? উত্তর সহজ—শিপিং কোম্পানি, তেল আমদানিকারক দেশ এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তা। অর্থাৎ যুদ্ধ থেমে গেলেও তার অর্থনৈতিক অভিঘাত বহুদিন ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে তাড়া করতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই নতুন দ্বন্দ্ব তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের ভবিষ্যৎ, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুহূর্ত।