Table of Contents
হাইলাইটস
- বন্দি হাতি রামনের হেফাজত অবিলম্বে কেরল সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের।
- আদালতের নির্দেশ অমান্য করে মন্দিরের অনুষ্ঠানে হাতি ব্যবহারের অভিযোগে মালিকপক্ষকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত।
- বিচারপতিদের মন্তব্য, “বোবা প্রাণীদের কল্যাণের প্রশ্নে আদালত নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না।”
- রামনকে উপযুক্ত উদ্ধার বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখার নির্দেশ।
- আদালত অবমাননার জন্য ২,০০০ টাকা জরিমানা।
সুপ্রিম কোর্ট কেরল সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে বন্দি হাতি ‘রামন’-এর হেফাজত গ্রহণ করে তাকে একটি উপযুক্ত উদ্ধার বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করতে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বোবা প্রাণীদের কল্যাণের প্রশ্নে আদালত কখনও “নীরব দর্শক” হয়ে থাকতে পারে না।
বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চ এই নির্দেশ জারি করে। একই সঙ্গে আদালত এক কেরলবাসী কৃষ্ণনকুট্টিকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে। কারণ, তিনি সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া একটি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছিলেন। ওই অঙ্গীকারে বলা হয়েছিল, রামনকে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনও মন্দিরের অনুষ্ঠান বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হবে না।
রায়ে আদালত বলেছে—
“এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে রামন, যে কেরল রাজ্যের সবচেয়ে লম্বা হাতি বলেও পরিচিত, তাকে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাও আবার এই আদালতের সামনে দেওয়া অঙ্গীকারের ভিত্তিতে। আমরা যদি এই অবাধ্যতার দিকে চোখ বন্ধ করে থাকি, তবে বোবা প্রাণীদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হব। বিশেষত বোবা প্রাণীদের কল্যাণের প্রশ্নে আমরা নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারি না, কারণ তাদের সুস্থতা ও মঙ্গলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”
দীর্ঘদিনের মালিকানা ও হেফাজত বিতর্ক
রামনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই মালিকানা ও হেফাজত নিয়ে আইনি লড়াই চলছে।
জয়কৃষ্ণ মেননের দাবি, হাতিটি আসলে মাতা অমৃতানন্দময়ী মঠের সম্পত্তি। কেবল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাময়িকভাবে কৃষ্ণনকুট্টির কাছে তাকে দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে কৃষ্ণনকুট্টি দাবি করেন, ২০১৭ সালে সম্পাদিত উপহারপত্রের মাধ্যমে তিনি হাতিটির বৈধ মালিক হয়েছেন।
এই বিরোধ বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। কেরলের বিভিন্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি আপিলগুলিতে হাতিটির অন্তর্বর্তীকালীন হেফাজত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্দেশ
মামলা বিচারাধীন থাকাকালীন ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট কেরলের প্রধান বন সংরক্ষক বা রাজ্যের সর্বোচ্চ বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আধিকারিককে রামনের স্বাস্থ্য ও সার্বিক অবস্থার পরিদর্শন করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
সেদিনই কৃষ্ণনকুট্টির আইনজীবী আদালতে অঙ্গীকার করেন যে, রামনকে কোনও বাণিজ্যিক বা মন্দির-সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা হবে না।
মন্দির উৎসবে অংশগ্রহণের অভিযোগ
কিন্তু পরে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া রিপোর্টে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি যখন হাতিটির বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়, তখন তাকে চাভাক্কাডে একটি মন্দির উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আদালত আরও লক্ষ্য করে যে, কৃষ্ণনকুট্টি নিজেও লিখিত বক্তব্যে স্বীকার করেছেন যে অন্য একটি হাতি অসুস্থ হয়ে পড়ায় রামনকে ওই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তাঁর দাবি ছিল, এটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, কেবল ভক্তদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানাতেই করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, যদি আদালত মনে করে এটি নির্দেশ লঙ্ঘন, তবে তিনি দুঃখিত।
আদালতের কড়া অবস্থান
সুপ্রিম কোর্ট কৃষ্ণনকুট্টির এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি।
বেঞ্চ জানায়, আদালতের সামনে দেওয়া অঙ্গীকার ছিল একেবারেই স্পষ্ট। সেখানে মন্দির-সংক্রান্ত বা বাণিজ্যিক কোনও কার্যকলাপে হাতিকে ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছিল।
তাই রামনকে মন্দিরের শোভাযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠান বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নিয়ে যাওয়াই সেই অঙ্গীকারের সরাসরি লঙ্ঘন।
আদালত মন্তব্য করে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকা অবস্থায়ও হাতিটিকে অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছে, যা আদালতের নির্দেশের অবমাননা।
রামনের হেফাজত নেবে সরকার
হাতিটির কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে কেরল সরকার অবিলম্বে রামনের হেফাজত গ্রহণ করবে এবং তাকে উপযুক্ত উদ্ধার বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখবে।
তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, এটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। মূল মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন হেফাজত নিয়ে চূড়ান্ত রায় যা হবে, সেই অনুযায়ী ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হতে পারে।
এছাড়া সরকারকে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন, ১৯৭২-এর বিধান মেনে নিজস্ব খরচে হাতিটির পরিচর্যার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
আদালত অবমাননার দায়ে জরিমানা
কৃষ্ণনকুট্টিকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২,০০০ টাকা জরিমানা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। চার সপ্তাহের মধ্যে সেই অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রাজ্য সরকারের বন ও বন্যপ্রাণী বিভাগের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে আনা আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আদালত বলেছে, আধিকারিকরা হাতিটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সে সময় রামন ‘মস্ত’ অবস্থায় থাকায় প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পরে তাঁরা সফলভাবে পরিদর্শন ও রিপোর্ট পেশ করেছেন। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে অবমাননার অভিযোগ টেকসই নয়।
রামনকে ঘিরে এই রায় শুধু একটি হেফাজত-সংক্রান্ত নির্দেশ নয়; এটি প্রাণীকল্যাণ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কঠোর অবস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে মানুষের মতোই বোবা প্রাণীদের অধিকার ও কল্যাণ রক্ষার ক্ষেত্রেও আইন এবং বিচারব্যবস্থা সমানভাবে সজাগ থাকবে।