হাইলাইটস
- তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহ ও অসন্তোষ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে।
- একের পর এক নেতা-কর্মীর দূরত্ব তৈরি হওয়ায় দলের সাংগঠনিক সংকট গভীরতর।
- এই পরিস্থিতিতে বিরোধী শিবিরের বৃহত্তর ঐক্যকে সামনে এনে রাজনৈতিক চাপ কমানোর চেষ্টা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
- ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠককে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে তৃণমূল।
- প্রশ্ন উঠছে, জাতীয় রাজনীতির মঞ্চ কি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দিতে পারবে?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত কয়েক সপ্তাহে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নিঃসন্দেহে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট। একসময় যে দলকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অদম্য রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীক বলে মনে করা হতো, সেই দলই এখন অসন্তোষ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে।
এই পরিস্থিতিতে দলের অন্দরের আগুন নেভানোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজর ক্রমশ জাতীয় রাজনীতির দিকে ঘুরছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। বিশেষ করে বিরোধী দলগুলির ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সক্রিয়তাকে সামনে এনে তিনি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে চাইছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর পিছনে রয়েছে একটি স্পষ্ট কৌশল। রাজ্যে যখন তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট সংবাদ শিরোনামে উঠে আসছে, তখন জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে নিজের অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করতে চাইছেন মমতা।
তৃণমূলের বর্তমান সমস্যার মূল উৎস শুধু নির্বাচনী পরাজয় নয়। বরং পরাজয়ের পর দলের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ ক্রমশ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। অনেক নেতার অভিযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিসর প্রায় নেই বললেই চলে। জেলার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে নেতৃত্বের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছয় না। আবার নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব এবং সংগঠনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলার অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।
এই অসন্তোষ এতদিন দলীয় বৈঠকের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা প্রকাশ্য মন্তব্য, পদত্যাগ এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তার মাধ্যমে সামনে চলে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে তাঁকে বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালাতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের দলের ভেতরের ক্ষোভও সামাল দিতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক এবং বিরোধী ঐক্যের রাজনীতি তাঁর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
কারণ জাতীয় স্তরে বিরোধী ঐক্যের প্রশ্ন সামনে এলে সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুও বদলে যায়। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বদলে বিজেপি বনাম বিরোধী জোটের বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াই সামনে চলে আসে। এতে অন্তত সাময়িকভাবে দলের অভ্যন্তরীণ সংকটের চাপ কমানো সম্ভব।
তবে এখানেই শেষ নয়। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের রাজনীতির মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিদ্রোহী নেতাদের কাছেও একটি বার্তা দিতে চাইছেন বলে মনে করা হচ্ছে। সেই বার্তা হল, তিনি এখনও জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা অটুট।
দলের অন্দরে যখন নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন জাতীয় মঞ্চে সক্রিয় উপস্থিতি সেই প্রশ্নের মোকাবিলার একটি উপায় হতে পারে।
কিন্তু সমস্যাও কম নয়।
‘ইন্ডিয়া’ জোট নিজেই বর্তমানে নানা টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেস এবং আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে সংঘাত বেড়েছে। কোথাও আসন সমঝোতা নিয়ে বিরোধ, কোথাও নেতৃত্বের প্রশ্নে মতবিরোধ। ফলে এই জোটকে কার্যকর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
তাছাড়া তৃণমূলের বর্তমান সংকট মূলত সাংগঠনিক এবং নেতৃত্বকেন্দ্রিক। জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক কর্মসূচি সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।
একজন প্রবীণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের কথায়, “দলের ভিতরে আগুন জ্বলছে আর আপনি বাইরে আতশবাজি দেখাচ্ছেন—এতে কিছু সময়ের জন্য মানুষের নজর ঘুরতে পারে, কিন্তু আগুন নেভে না।”
এই মন্তব্য হয়তো কঠোর, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই।
কারণ তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের মূল অভিযোগগুলি এখনও অমীমাংসিত। সাংগঠনিক সংস্কার হবে কি না, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসবে কি না, নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার সুযোগ পাবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে বিজেপিও পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে। বিরোধী শিবিরে ভাঙন বা অসন্তোষ তৈরি হলে তার রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা যে হবে, তা বলাই বাহুল্য।
ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল দলকে পুনর্গঠন করা এবং ক্ষুব্ধ কর্মী-নেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, অনেক সময় নির্বাচনী পরাজয়ের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয় পরাজয়ের পর দলের অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়। কারণ ভোটে হারলে পরবর্তী নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, কিন্তু সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে গেলে সেই ক্ষতি পূরণ করা অনেক কঠিন।
তৃণমূল কংগ্রেস আজ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
এই মুহূর্তে ‘ইন্ডিয়া’ জোট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য একটি রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল, একটি বৃহত্তর মঞ্চ এবং একটি প্রতীকী শক্তির উৎস হতে পারে। কিন্তু সেটি দলের ভেতরের সংকটের বিকল্প নয়।
বিদ্রোহী শিবিরকে উপেক্ষা করে কিংবা শুধুমাত্র জাতীয় রাজনীতির আলোয় নিজেদের সমস্যাকে আড়াল করে রাখার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে তৃণমূল নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি সামলায়, বিদ্রোহীদের সঙ্গে সম্পর্কের কী পরিণতি হয় এবং ‘ইন্ডিয়া’ জোটের রাজনীতি কতটা সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে—সেই দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
কারণ আপাতত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—তৃণমূলের ভিতরের আগুন কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই নেভাতে পারবেন, নাকি সেই আগুন আরও ছড়িয়ে পড়বে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটে?