Home খবর দুই বিশ্বাসের রাজত্ব: ক্লাব, খেলা, সংস্কৃতি আর ক্ষমতার সর্বগ্রাসী মহাকাব্য

দুই বিশ্বাসের রাজত্ব: ক্লাব, খেলা, সংস্কৃতি আর ক্ষমতার সর্বগ্রাসী মহাকাব্য

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 2 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • দীর্ঘদিন ধরে বাংলার ক্লাব-রাজনীতি, ক্রীড়া প্রশাসন এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে এক বিশেষ ধরনের প্রভাববলয়ের অভিযোগ ঘুরে ফিরে এসেছে।
  • সমর্থকদের চোখে দক্ষ সংগঠক, সমালোচকদের চোখে সর্বব্যাপী ক্ষমতার প্রতীক—দুই বিপরীত বয়ানের মাঝখানে গড়ে উঠেছে এক রাজনৈতিক কিংবদন্তি।
  • ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক আনুগত্যের সম্পর্ক কীভাবে বদলেছে, সেই ইতিহাসেরও অংশ এই কাহিনি।
  • ক্ষমতা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তার চারপাশে কী ধরনের সংস্কৃতি তৈরি হয়, এই গল্প তারই একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিচ্ছবি।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক শক্তিশালী নেতা এসেছেন। কেউ বক্তৃতার জন্য পরিচিত হয়েছেন, কেউ সংগঠন গড়ার জন্য, কেউ প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য। কিন্তু এমন কিছু রাজনৈতিক চরিত্রও থাকেন যাঁদের পরিচয় কোনও নির্দিষ্ট পদবির মধ্যে আটকে রাখা যায় না। তাঁরা ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থানে পৌঁছে যান, যেখানে তাঁদের পরিচয় হয়ে ওঠে একটি প্রভাববলয়, একটি নেটওয়ার্ক, একটি অদৃশ্য অথচ বহুল অনুভূত উপস্থিতি। বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দুই বিশ্বাসকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভাবমূর্তি অনেকটাই সেই ধরনের।

বহু বছর ধরে রাজ্যের জনজীবনে এমন একটি ধারণা কাজ করেছে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেবল নবান্ন, বিধানসভা বা দলীয় কার্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষমতার একটি অংশ ঘুরে বেড়ায় ক্লাবের মঞ্চে, ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, পুজো কমিটির বৈঠকে, ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সমাবেশে। ফলে অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক কাঠামোর চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে সেইসব মানুষ, যাঁরা এই বিস্তৃত অরাজনৈতিক-দেখতে-লাগা কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক পরিসরগুলিকে সংযুক্ত করে রাখেন।

বাংলার ক্লাব সংস্কৃতি একসময় সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল। সেখানে খেলাধুলা হত, নাটক হত, পাঠচক্র হত, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা হত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্লাবের চরিত্র বদলাতে শুরু করে। ক্লাব আর শুধুমাত্র ক্লাব রইল না; সেটি হয়ে উঠল স্থানীয় প্রভাবের কেন্দ্র। কোনও এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝার জন্য অনেক সময় দলীয় কার্যালয়ের চেয়ে ক্লাবঘর বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তন ছিল কেবল সাংগঠনিক বিবর্তন নয়; এটি ছিল ক্ষমতার নতুন স্থাপত্য নির্মাণের একটি অংশ, যেখানে ভোটের রাজনীতি, সামাজিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে মজার দিক ছিল এর স্বাভাবিকতা। কেউ কখনও প্রকাশ্যে বলত না যে ক্লাবের গুরুত্ব রাজনৈতিক কারণে বেড়েছে। বরং বলা হত, সমাজসেবা হচ্ছে, ক্রীড়া প্রসার হচ্ছে, সাংস্কৃতিক কাজ হচ্ছে। বাস্তবেও সেসব কাজ অনেক ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সমাজসেবা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্যটাই ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছিল। স্থানীয় মানুষের একাংশের ধারণা ছিল, কোনও কাজ দ্রুত করতে হলে সরকারি নিয়মের চেয়ে সঠিক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় থাকা বেশি কার্যকর। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এই ধারণা মোটেই সুখকর নয়, কারণ এতে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে এবং ব্যক্তিনির্ভরতা বাড়ে।

ক্রীড়া প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিতর্ক বহু বছর ধরে চলেছে। খেলাধুলা সাধারণত প্রতিযোগিতা, প্রতিভা এবং পরিশ্রমের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই দেখিয়ে আসছেন যে ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলিও ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফুটবল, ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলাধুলার প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ হয়েছে, ততই সমালোচনা বেড়েছে। অনেকের অভিযোগ ছিল, খেলাধুলার সাফল্যের চেয়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। আবার সমর্থকদের বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এত বিপুল পরিকাঠামো বা আয়োজন সম্ভব হত না। এই দুই মতের সংঘর্ষই দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও প্রায় একই দৃশ্য দেখা গিয়েছে। বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসর ঐতিহাসিকভাবে বহুমাত্রিক। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র—সব ক্ষেত্রেই মতভেদ, বিতর্ক এবং স্বাধীন সৃজনশীলতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু যখন কোনও রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, তখন সংস্কৃতির উপরও তার প্রভাব বিস্তার করা স্বাভাবিক। সমস্যার শুরু হয় তখন, যখন শিল্প ও রাজনৈতিক আনুগত্যের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। সমালোচকদের একাংশ মনে করতেন, সাংস্কৃতিক পরিসরের অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা একটি অদৃশ্য যোগ্যতা হিসেবে কাজ করছিল। যদিও এই অভিযোগের পাল্টা যুক্তিও ছিল, এবং বহু শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী তা মানতে রাজি ছিলেন না।

ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্বের সঙ্গে আরেকটি বিষয় প্রায় অবধারিতভাবে জুড়ে থাকে। সেটি হল প্রশংসাবাহিনীর বিস্তার। পৃথিবীর সব রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেই ক্ষমতার চারপাশে এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরি হয়, যাঁদের প্রধান কাজ হল নেতৃত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্তের মধ্যে দূরদর্শিতা খুঁজে বের করা। এই প্রবণতা কোনও একটি দল বা মতাদর্শের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। কিন্তু ক্ষমতা যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, এই প্রবণতাও তত শক্তিশালী হয়। ফলে সমালোচনা ধীরে ধীরে অসুবিধাজনক হয়ে ওঠে এবং আত্মসমালোচনা প্রায় বিলুপ্ত হতে শুরু করে। যে কোনও রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য এটি বিপজ্জনক লক্ষণ, কারণ তখন বাস্তব পরিস্থিতি এবং ক্ষমতাকেন্দ্রের ধারণার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।

দুই বিশ্বাসকে ঘিরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক আখ্যানের কেন্দ্রে আসলে এই প্রশ্নগুলিই রয়েছে। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে কতটা জনপ্রিয় ছিলেন বা কতটা দক্ষ সংগঠক ছিলেন, তা নিয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু তাঁদের ঘিরে যে সর্বব্যাপী উপস্থিতির ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেটি বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। অনেক মানুষের মনে এমন ধারণা জন্মেছিল যে রাজ্যের নানা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং সামাজিক পরিসরে কিছু নির্দিষ্ট মুখের উপস্থিতি এতটাই প্রবল যে প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব পরিচয় অনেক সময় আড়ালে চলে যাচ্ছে।

ইতিহাসের একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল, এটি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, প্রবণতার বিচার করে। কোনও নির্দিষ্ট নেতা বা সংগঠকের মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ব্যক্তি-নির্ভরতা, সর্বব্যাপী প্রভাব এবং প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে ওঠা ক্ষমতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, ইতিহাস সাধারণত সেই সংস্কৃতিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে। দুই বিশ্বাসকে ঘিরে তৈরি হওয়া কিংবদন্তি, সমালোচনা, প্রশংসা এবং ব্যঙ্গ—সবকিছু মিলিয়ে তাই এটি মূলত দুই ব্যক্তির গল্প নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করেছে, কীভাবে বিস্তৃত হয়েছে এবং কীভাবে নিজস্ব এক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করেছে, সেই বৃহত্তর গল্পেরই একটি অধ্যায়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles