হাইলাইটস:

  • পরপর টুইট করে দল, সরকার ও রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বাবুল সুপ্রিয়।
  • কিন্তু যে প্রশ্নগুলি তিনি তুলছেন, তার অনেকগুলিই নতুন নয়।
  • সমালোচকদের প্রশ্ন, বিবেক কি হঠাৎ জাগল, নাকি রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলাতেই তার অ্যালার্ম বেজে উঠল?
  • রাজনীতিতে বিবেকেরও কি নির্দিষ্ট ঋতু আছে?

বাংলাস্ফিয়ার: বাংলা রাজনীতিতে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যার ব্যাখ্যা ইতিহাসবিদরা দিতে পারেননি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দিতে চাননি, আর সাধারণ মানুষ শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। বাবুল সুপ্রিয়র সাম্প্রতিক টুইটার-পর্ব সম্ভবত সেই বিরল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি এমন সব টুইট করছেন, যা পড়ে বোঝা যাচ্ছে তিনি কিছু একটা বলতে চাইছেন। কিন্তু ঠিক কী বলতে চাইছেন, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। কখনও তিনি নীতির কথা বলছেন, কখনও গণতন্ত্রের কথা বলছেন, কখনও দলীয় সংস্কৃতির কথা বলছেন, আবার কখনও এমন ভঙ্গিতে প্রশ্ন তুলছেন যেন তিনি নিজেই এই রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক।

সমস্যা হল, দর্শকরা তাঁকে এখনও রাজনীতির মঞ্চেই দেখতে পাচ্ছেন।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—বাবুলবাবুর বিবেক কি সত্যিই জেগে উঠেছে, নাকি বহুদিন ঘুমিয়ে থাকার পর হঠাৎ মোবাইলের অ্যালার্ম বেজে উঠেছে?

রাজনীতিতে বিবেক বড় বিচিত্র জিনিস। সাধারণ মানুষের বিবেক জাগে অন্যায়ের প্রতিবাদে। সাহিত্যিকের বিবেক জাগে সমাজের সংকটে। সাংবাদিকের বিবেক জাগে সত্য গোপন করা হলে। কিন্তু রাজনীতিবিদের বিবেকের নিজস্ব ক্যালেন্ডার আছে। সেটি সাধারণত জাগে দলবদলের আগে, দলবদলের পরে, টিকিট না পেলে, মন্ত্রিত্ব চলে গেলে, অথবা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে।

এই কারণে বাবুল সুপ্রিয়র সাম্প্রতিক বিবেক-জাগরণকে মানুষ কৌতূহল নিয়ে দেখছে।

কারণ তিনি যে প্রশ্নগুলি এখন তুলছেন, তার অধিকাংশই বাংলার রাজনৈতিক আড্ডায় বহু বছর ধরে ঘুরছে। এগুলি এমন কোনও গোপন তথ্য নয় যা হিমালয়ের গুহায় তপস্যা করে আবিষ্কার করতে হয়েছে। এগুলি সেই ধরনের প্রশ্ন যা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসা মানুষও বহুদিন ধরে করে আসছেন। কিন্তু তখন বাবুলবাবুর সামাজিক মাধ্যম ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত। এখন আচমকা তাঁর টুইটগুলো দেখে মনে হচ্ছে তিনি যেন রাজনৈতিক নৈতিকতার নতুন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন।

সবচেয়ে মজার বিষয় হল, তাঁর বক্তব্যগুলির মধ্যে প্রায়ই এমন এক সুর থাকে যেন তিনি এই গোটা ব্যবস্থার সঙ্গে কোনওদিন যুক্তই ছিলেন না। যেন তিনি দূর থেকে সবকিছু দেখেছেন, পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং অবশেষে সত্য বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এখানেই সমস্যাটা। কারণ জনগণের স্মৃতিশক্তি রাজনৈতিক নেতাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

মানুষ মনে রাখে কে কোথায় ছিলেন, কোন সময়ে কী বলেছিলেন, কোন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন এবং কোন বিষয় নিয়ে নীরব ছিলেন। তাই যখন কোনও রাজনীতিবিদ হঠাৎ করে নৈতিকতার পতাকা হাতে তুলে নেন, তখন সাধারণ মানুষ প্রথমেই জিজ্ঞাসা করে—“এতদিন ছিলেন কোথায়?”

এই প্রশ্নের উত্তর সাধারণত পাওয়া যায় না। রাজনীতিতে অবশ্য উত্তর না পাওয়াটাও একধরনের উত্তর।

বাবুল সুপ্রিয়র বর্তমান অবস্থান অনেকটা সেই ছাত্রের মতো, যে পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বেজে যাওয়ার পরে উঠে দাঁড়িয়ে বলছে, প্রশ্নপত্রে গুরুতর ত্রুটি ছিল। কথাটা সত্যও হতে পারে। কিন্তু পরীক্ষক তখন স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইবেন—ভাই, তিন ঘণ্টা ধরে চুপ করে বসে ছিলে কেন? এখানেই তাঁর টুইটগুলির সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি যা বলছেন, তার চেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে তিনি কখন বলছেন।

বাংলার রাজনীতিতে এই দৃশ্য অবশ্য নতুন নয়। এখানে অনেক নেতাই সময়মতো নীরব এবং সময় পেরিয়ে গেলে অত্যন্ত সোচ্চার হয়ে ওঠেন। যেন রাজনৈতিক বিবেকও সরকারি অফিসের মতো। ঠিক সময়ে কাজ করে না, কিন্তু ফাইল বন্ধ হওয়ার পরে প্রচণ্ড সক্রিয় হয়ে ওঠে।

ফলে বাবুলবাবুর সাম্প্রতিক টুইটগুলি পড়ে অনেকেরই মনে হচ্ছে, তিনি যেন কোনও রাজনৈতিক সংকেত পাঠাতে চাইছেন। কিন্তু সংকেতের ভাষা এতটাই অস্পষ্ট যে দর্শক বুঝতে পারছেন না এটি বিদ্রোহ, অভিমান, আত্মসমালোচনা নাকি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানের বিজ্ঞাপন।

রাজনীতিতে অস্পষ্টতা অনেক সময় কৌশল হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অস্পষ্টতা বজায় থাকলে মানুষ ধরে নেয় বক্তা নিজেও জানেন না তিনি ঠিক কী বলতে চাইছেন।

অবশ্য এটাও সম্ভব, বাবুল সুপ্রিয় সত্যিই তাঁর মনের কথা বলছেন। সেটাও রাজনীতিতে বিরল নয়। সমস্যা হল, রাজনীতিতে মানুষ শুধু কথার মূল্যায়ন করে না, সময়েরও মূল্যায়ন করে।

কথা ঠিক সময়ে বলা হলে তা সততা বলে মনে হয়। দেরিতে বলা হলে তা প্রায়ই আত্মরক্ষার চেষ্টা বলে মনে হয়। এই কারণেই তাঁর সাম্প্রতিক বিবেক-জাগরণকে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।

বাঙালির একটা বদঅভ্যাস আছে। সে শুধু বক্তব্য শোনে না, বক্তাকেও দেখে। ফলে এখানে নৈতিকতার বক্তৃতা দেওয়ার আগে বক্তার পুরনো বক্তৃতাগুলিও খুঁজে দেখা হয়। আর সেখানেই বিপদ।

রাজনীতির আর্কাইভ বড় নির্মম জায়গা। সেখানে পুরনো বক্তব্য, পুরনো অবস্থান, পুরনো প্রশংসা এবং পুরনো নীরবতা সবকিছু জমা থাকে। তাই বাবুল সুপ্রিয়র বর্তমান টুইট-পর্বের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত তাঁর বক্তব্য নয়, তাঁর সময় নির্বাচন।

তিনি কী বলতে চাইছেন, তা হয়তো একদিন স্পষ্ট হবে। কিন্তু তারও আগে বাংলার রাজনৈতিক দর্শক সম্ভবত আরেকটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবেন— বিবেকবাবু এতদিন কোথায় ছিলেন?

আর যদি সত্যিই তিনি এখন জেগে উঠে থাকেন, তাহলে আশা করা যায় তিনি আর ঘুমোবেন না। কারণ বাংলা রাজনীতিতে ঘুমন্ত বিবেকের সংখ্যা এমনিতেই কম নয়। নতুন করে আর একজন যোগ হলে জায়গার অভাব হয়ে যেতে পারে।