মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে রাত আড়াইটেয় বন্ধুকে অসুস্থতার বার্তা পাঠিয়েছিলেন নানা পাটেকর

যা জানা জরুরি
- গভীর রাতে পাঠানো বার্তাটি দেরিতে দেখেছিলেন বন্ধু।
- ভোর চারটে নাগাদ গোয়ায় অভিনেতার বাড়িতে পৌঁছে দেখেন, তিনি ঘামছেন এবং শ্বাস নিতে হাঁসফাঁস করছেন।
- ভোর পাঁচটা কুড়ি মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গভীর রাতে পাঠানো বার্তাটি দেরিতে দেখেছিলেন বন্ধু। ভোর চারটে নাগাদ গোয়ায় অভিনেতার বাড়িতে পৌঁছে দেখেন, তিনি ঘামছেন এবং শ্বাস নিতে হাঁসফাঁস করছেন। ভোর পাঁচটা কুড়ি মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পুণেতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করবে মহারাষ্ট্র সরকার।
নানা পাটেকর গোয়ায় তাঁদের পারিবারিক বাড়িতে ছিলেন। গোয়ার মণিপাল হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শেখর সালকার সংবাদমাধ্যমকে জানান, অভিনেতার বন্ধু তাঁর পাঠানো বার্তাটি দেরিতে দেখেছিলেন।
সালকার বলেন, “আমরা যত দূর জানতে পেরেছি, রাত আড়াইটে নাগাদ তিনি তাঁর বন্ধুকে বার্তা পাঠিয়ে জানান যে তাঁর শরীর ভাল লাগছে না, অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু অনেক রাত হওয়ায় আমার মনে হয়, তাঁর বন্ধু সময়মতো বার্তাটি দেখতে পাননি।”
তিনি আরও বলেন, “তাঁর বন্ধু ভোর চারটে নাগাদ বাড়িতে পৌঁছে দেখেন, তিনি ঘামছেন এবং শ্বাস নিতে হাঁসফাঁস করছেন। এর পর তাঁর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হাসপাতালে এসে অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে কাছেই তাঁর বাড়িতে যান। আমাদের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক দল সেখানে পৌঁছে দেখে, তাঁর কোনও সাড়াশব্দ নেই। তখনই তাঁরা বুকে চাপ দিয়ে হৃদ্যন্ত্রের কাজ ফেরানোর চেষ্টা শুরু করেন। বাড়িতেই সিপিআর শুরু করা হয়। সিপিআর দিতে দিতেই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু তত ক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। ভোর পাঁচটা কুড়ি মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।”
সালকার জানান, “ভোর চারটে কুড়ি মিনিট নাগাদ নানা পাটেকরকে আমাদের হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল। আমরা সিপিআর দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।”
আগে থেকে পাটেকরের হৃদ্রোগ ছিল কি না, হাসপাতালের তা জানা নেই বলেও জানান সালকার। তাঁর কথায়, “হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা এটি। তবে তার কারণ আমরা জানি না। তাঁর আগে থেকে হৃদ্রোগ ছিল কি না, কিংবা তিনি কোনও ওষুধ খাচ্ছিলেন কি না, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই।”
মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল বলে ঘটনাটি চিকিৎসা ও আইনি তদন্তসাপেক্ষ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। সালকার বলেন, “পুলিশ এসেছিল। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ গোয়া মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।”
তাঁর মৃত্যুতে চলচ্চিত্রজগৎ, রাজনৈতিক মহল এবং অনুরাগীদের কাছ থেকে শোকবার্তা আসতে থাকে। দেবেন্দ্র ফড়নবীস বলেন, “পর্দায় নানা যত বড় শিল্পী ছিলেন, মানুষ হিসেবেও তাঁর হৃদয় ছিল ততটাই বড়। মারাঠি ও হিন্দি চলচ্চিত্রকে তিনি একটি গোটা যুগ উপহার দিয়েছেন। ‘ক্রান্তিবীর’ থেকে ‘নটসম্রাট’—তাঁর অভিনয়ের শক্তি, দক্ষতা ও বৈচিত্র্যের তুলনা হয় না। তাঁর মৃত্যু চলচ্চিত্রজগতের বিরাট ক্ষতি।” নাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কৃষক ও খরাপীড়িত মানুষের জন্য পাটেকরের কাজের কথাও স্মরণ করেন ফড়নবীস।
গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ন্ত লেখেন, “প্রবীণ অভিনেতা শ্রী নানা পাটেকরজির প্রয়াণের সংবাদে আমি স্তম্ভিত এবং গভীরভাবে শোকাহত। নাট্যমঞ্চ, হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে তাঁর অসামান্য যাত্রা, শক্তিশালী অভিনয় এবং স্বতন্ত্র শিল্পসত্তা ভারতীয় চলচ্চিত্রে অমোচনীয় ছাপ রেখে গিয়েছে। তাঁর পরিবার, বন্ধুবান্ধব, অনুরাগী এবং গোটা চলচ্চিত্র পরিবারের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা।”
অভিনেতা রীতেশ দেশমুখ লেখেন, “আমি এতটাই স্তম্ভিত যে ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে, একটা ট্রাক এসে আমাকে ধাক্কা মেরেছে। নানা পাটেকরজির প্রয়াণের সংবাদে গভীরভাবে শোকাহত। তিনি ছিলেন অসাধারণ অভিনেতা, যাঁর সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়ভঙ্গি ও নিজস্বতা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। এমন কোনও চরিত্র ছিল না, যা তিনি অভিনয় করতে পারতেন না। সাধারণের চেয়ে অনেক বড় মাপের নায়ক, ভয়ংকর খলনায়ক কিংবা মুখ গম্ভীর রেখে হাসানোর অভিনয়—সবেতেই তিনি ছিলেন অনবদ্য। পর্দার বাইরেও তিনি ছিলেন নায়ক। নিজের দাতব্য উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে নিরলস কাজ করেছেন।”
নাট্যমঞ্চ থেকেই পাটেকরের অভিনয়জীবনের শুরু। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ১৯৮৯ সালের ‘পরিন্দা’ তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। এই ছবির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪) তাঁকে এনে দেয় সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। ‘অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৯৬)-তে অভিনয়ের জন্য ফের সেরা পার্শ্ব অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান। এটি ছিল তাঁর তৃতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
তাঁর অন্যান্য প্রশংসিত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘অব তক ছপ্পন’, ‘অপহরণ’ এবং ‘রাজনীতি’। ‘ওয়েলকাম’ (২০০৭) ছবিতে গ্যাংস্টার উদয় শেট্টির চরিত্রে অভিনয় করে কৌতুকাভিনয়েও নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ (২০১৫)-এ আবার সেই চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে।
মারাঠি ছবি ‘নটসম্রাট’ (২০১৬)-এ এক অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চাভিনেতার চরিত্রে অভিনয় করেন পাটেকর। এটি তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম বহুলপ্রশংসিত কাজ। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ (১৯৯১) ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা ও চিত্রনাট্য রচনাও করেছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।
চলচ্চিত্রের বাইরেও খরাপীড়িত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পাটেকর। অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে ২০১৫ সালে গড়ে তোলেন নাম ফাউন্ডেশন। এই সংস্থার মাধ্যমেই কৃষকদের জন্য কাজ করতেন তিনি। প্রায় পাঁচ দশক বিস্তৃত ছিল তাঁর অভিনয়জীবন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



