ডাইনি অপবাদে মহিলাকে বিবস্ত্র করে মারধর ওড়িশায়, ছয় জনের বিরুদ্ধে মামলা

যা জানা জরুরি
- ডাইনি সন্দেহে এক মহিলাকে প্রকাশ্যে বিবস্ত্র করে মারধরের অভিযোগ উঠল ওড়িশার ভদ্রক জেলায়।
- অভিযোগ, বাড়িতে ঢুকে হামলার পর তাঁকে রাস্তায় টেনে এনে নির্যাতন করা হয়।
- চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়েও হামলাকারীরা পিছু ছাড়েনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ডাইনি সন্দেহে এক মহিলাকে প্রকাশ্যে বিবস্ত্র করে মারধরের অভিযোগ উঠল ওড়িশার ভদ্রক জেলায়। অভিযোগ, বাড়িতে ঢুকে হামলার পর তাঁকে রাস্তায় টেনে এনে নির্যাতন করা হয়। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়েও হামলাকারীরা পিছু ছাড়েনি। অটোরিকশা আটকে তাঁকে নামিয়ে ফের মারধর করা হয়। পুলিশ গিয়ে মহিলাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। ঘটনায় দুই মহিলা-সহ ছয় জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, আক্রান্ত মহিলার বয়স ৫৪ বছর। ঘটনাস্থল ভদ্রক গ্রামীণ থানা এলাকার বানিটিয়া গ্রাম। গত ২৫ সেপ্টেম্বর হামলা হয় বলে অভিযোগ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান ওই মহিলা। তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ভদ্রক গ্রামীণ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সুব্রত দাস। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মারধর, বাড়ির সম্পত্তি নষ্ট করা এবং জিনিসপত্র লুট করার কথাও।
মহিলার অভিযোগ, গ্রামের কয়েক জন তাঁর বাড়িতে চড়াও হয়ে তাঁকে জাদুটোনা করার অভিযোগে আক্রমণ করে। লোহার শাবল ও কাঠের লাঠি দিয়ে মারা হয়। বাড়ির বেড়া এবং গ্রিলও ভাঙচুর করা হয়। হামলার পর পরিবারের লোকজন ও স্থানীয় সরপঞ্চ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু পথেই অটোরিকশা থামিয়ে তাঁকে আবার আক্রমণ করা হয় বলে অভিযোগ। পরে ভদ্রক জেলা সদর হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে পুলিশ।
আক্রান্তের ভাই স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুর প্রায় দুটোয় তাঁর বোনের বাড়িতে হামলা হয়। এক গ্রামবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নিজের মোটরসাইকেল খারাপ থাকায় অন্যের মোটরসাইকেল ধার করতে হয় তাঁকে। গ্রামের রাস্তার জল ও গর্তের কারণে শেষ কিছুটা পথ হেঁটেও যেতে হয়। বাড়িতে পৌঁছে তিনি ভাঙা গ্রিল ও বেড়া দেখতে পান এবং ভিতর থেকে বোনের কান্না শুনতে পান।
ওই ভাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বোন তাঁকে জানান, জাদুটোনার অভিযোগ তুলে শাবল ও লাঠি দিয়ে মারা হয়েছে। কেন তাঁকে এ ভাবে আক্রমণ করা হল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। আক্রান্ত মহিলার আরও অভিযোগ, এর আগেও তিনি এবং তাঁর ছেলে হামলার শিকার হয়েছিলেন। সেই ঘটনায় ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারের উপর আক্রমণের ঘটনা আগেও ঘটেছে।
তবে ঘটনার পটভূমি সম্পর্কে পুলিশের বক্তব্যে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কথাও উঠে এসেছে। থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক জানিয়েছেন, মূলত জমির বিবাদকে কেন্দ্র করেই এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগকারিণী জানিয়েছেন, ডাইনি সন্দেহে তাঁকে নির্যাতন করা হচ্ছে। ফলে জমির বিরোধ এবং ডাইনি অপবাদে নির্যাতনের অভিযোগ, দুটিই সামনে এসেছে। কোন পরিস্থিতিতে হামলা হয়েছে এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তদন্তে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এমন সময়ে এই ঘটনা সামনে এল, যখন ডাইনি অপবাদে নির্যাতন রুখতে নতুন নীতির খসড়া তৈরি করেছে ওড়িশা সরকার। নারী ও শিশুবিকাশ দফতরের প্রস্তাবিত নীতিতে আক্রান্তদের দ্রুত উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ আদালত এবং প্রশিক্ষিত সরকারি আইনজীবীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করার প্রস্তাবও রয়েছে। অভিযোগ নিতে বা যথাযথ তদন্ত করতে গাফিলতি হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথাও খসড়ায় আছে। পুনর্বাসনের জন্য পৃথক তহবিল গড়ার প্রস্তাবও রয়েছে, যাতে উদ্ধার হওয়ার পর আক্রান্তদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দেওয়ার জন্য অর্থের ব্যবস্থা করা যায়।
খসড়া নীতিতে জমি ও সম্পত্তির বিরোধ, সামাজিক বঞ্চনা এবং বিজ্ঞানমনস্কতার অভাবকেও এই ধরনের হিংসার পটভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাম চিহ্নিত করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রতিরোধের কাজে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। ভদ্রকের ঘটনায় তাই অভিযুক্তদের শনাক্ত করার পাশাপাশি আক্রান্ত মহিলা ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



