এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারদের ফেরাতে ২০ রাজ্যে বিশেষ অভিযান

যা জানা জরুরি
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সংশোধনী পদক্ষেপ করল নির্বাচন কমিশন।
- যে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর শেষ হয়েছে, সেখানে তালিকার বাইরে থাকা যোগ্য ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করতে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- ২৯ সেপ্টেম্বর লিখিত নির্দেশ পাঠানোর পরে বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, রাজ্যগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের সঙ্গে ভিডিও বৈঠকেও বিষয়টি জানানো হয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সংশোধনী পদক্ষেপ করল নির্বাচন কমিশন। যে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর শেষ হয়েছে, সেখানে তালিকার বাইরে থাকা যোগ্য ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করতে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর লিখিত নির্দেশ পাঠানোর পরে বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, রাজ্যগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের সঙ্গে ভিডিও বৈঠকেও বিষয়টি জানানো হয়।
এই অভিযানে নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে হবে ফর্ম ৬-এ। কমিশনের ২৬ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসআইআর চলাকালীন কিংবা তার পরে যাঁদের নাম তালিকার বাইরে থেকে গিয়েছে, তাঁরা সংশ্লিষ্ট ভোটার নিবন্ধন আধিকারিকের কাছে আবেদন করতে পারবেন। সুযোগ পাবেন নতুন ও প্রথমবারের ভোটারেরাও। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ-সহ এসআইআর সম্পূর্ণ হওয়া অঞ্চলগুলিতে তালিকার ধারাবাহিক সংশোধনের ব্যবস্থাতেই এই কাজ হবে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, জেলা নির্বাচনী আধিকারিক এবং ভোটার নিবন্ধন আধিকারিকদের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ফর্ম ৬-এর অতিরিক্ত ঘোষণাটি সরিয়ে দেওয়া। অনলাইন ফর্মে জানতে চাওয়া হচ্ছিল, আগের নিবিড় সংশোধনের তালিকায় আবেদনকারীর নিজের অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা দাদু-ঠাকুমার নাম ছিল কি না। এসআইআর শেষ হওয়া রাজ্যগুলিতে এই ঘোষণাটি আর থাকছে না। কমিশনের ইসিআইনেট পোর্টাল থেকেও সংশ্লিষ্ট অংশটি সরানো হয়েছে। তবে যেখানে এসআইআর এখনও চলছে, সেখানে ঘোষণাটি বহাল রয়েছে।
এই প্রশ্ন সংযোজন নিয়েই আপত্তি জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রশ্নটি বাধ্যতামূলক বলে চিহ্নিত না থাকলেও উত্তর না দিয়ে অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়া যেত না। ফলে কাগজে সাধারণ আবেদনপত্র থাকা সত্ত্বেও অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদনকারীকে বাড়তি শর্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। বিশেষ করে পরিবারের পুরনো ভোটার তালিকার তথ্য দিতে অক্ষম তরুণদের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্ন উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
দুই কমিশনারের আপত্তির মূল ছিল আইনি পদ্ধতি। ফর্ম ৬ নির্ধারিত হয়েছে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধির অধীনে। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সেই বিধি সংশোধন না করে এসআইআরের নির্দেশিকা দিয়ে ফর্মের বিষয়বস্তু বদলানো যায় না। মে মাসে জোশী বিষয়টি লিখিতভাবে জানান; সান্ধুও সহমত হন। অগস্টে সান্ধু আবার পরিবর্তনটিকে অনুমোদনহীন ও বেআইনি বলে চিহ্নিত করে তা সরানোর দাবি জানান, যাতে যোগ্য নতুন ভোটারদের হয়রানি না হয়।
ফলে বর্তমান সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু একটি প্রশ্ন বাদ দেওয়া নয়। এসআইআর শেষ হওয়ার পরেও তার বিশেষ যাচাইয়ের শর্ত সাধারণ ভোটার নিবন্ধনের পথে বাধা হয়ে থাকবে কি না, সেই সংশয়ের অন্তত একটি অংশ দূর হচ্ছে। যদিও অতিরিক্ত ঘোষণা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত নির্দিষ্টভাবে এসআইআর-পরবর্তী সময়ের জন্য; দেশজুড়ে চলতে থাকা গোটা সংশোধন প্রক্রিয়া প্রত্যাহারের ঘোষণা কমিশন করেনি।
বিশেষ অভিযান বাস্তবায়নের একটি উদাহরণ গুজরাত। সেখানে ১১, ১৮ ও ২৫ অক্টোবর এবং ১ নভেম্বর, পরপর চার রবিবার বুথে আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থা হচ্ছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কর্মী ও বুথস্তরের আধিকারিকেরা উপস্থিত থাকবেন। নতুন ভোটার এবং তালিকায় নাম না থাকা অন্য যোগ্য নাগরিকেরা ফর্ম ৬ জমা দিতে পারবেন। কাজ পর্যবেক্ষণ করবেন তত্ত্বাবধায়কেরা; জেলা ও নিবন্ধন আধিকারিকেরাও পরিদর্শন করবেন।
প্রযুক্তিগত বাধায় যোগ্য ভোটারের নাম না ওঠার অভিযোগও এই বিতর্কের কেন্দ্রে। গোয়ায় স্থানীয় আধিকারিকদের অনুমোদন সত্ত্বেও ৯৭ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় না থাকার ঘটনা সামনে এসেছিল। ১ অক্টোবর কমিশন জানায়, তাঁদের মধ্যে ৮৮ জনের ক্ষেত্রে ফর্ম ৬ জমা পড়েছে অথবা আবেদন গৃহীত হয়েছে। বাকি ন’জনের তিনজন পর্তুগিজ পাসপোর্টধারী এবং ছ’জন বিদেশে রয়েছেন বলে কমিশনের বক্তব্য। বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
গোয়ার ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে, স্থানীয় আধিকারিক কোনও ব্যক্তিকে যোগ্য বলে মেনে নিলেও কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার কেন তাঁর নাম অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা হবে। কমিশন ইতিমধ্যে ইসিআইনেট পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছে। একজন প্রবীণ উপনির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে সেই কমিটিতে আইআইটি বা আইআইআইটির একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ থাকবেন। আইন ও বিধির সঙ্গে সফটওয়্যারের সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখাই হবে তাঁদের কাজ।
একই সঙ্গে চলমান এসআইআরে শুনানির নিয়মও কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। পুরনো তালিকার সঙ্গে নামের যোগসূত্র না মেলা বা তথ্যের অসংগতির জন্য নোটিস পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়িতে গিয়ে নথি সংগ্রহ করবেন বিএলওরা। সাধারণভাবে তাঁদের নিবন্ধন আধিকারিকের দপ্তরে যেতে হবে না। ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে শুনানি হলে অনলাইন পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; প্রয়োজনে অনুমোদিত প্রাপ্তবয়স্ক পরিবারের সদস্যও প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন।
কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়েও পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে। বৈঠকের আগে আলোচ্যসূচি পাঠানো, পরে কার্যবিবরণী প্রকাশ এবং কমিশনারদের নির্দেশ যথাযথভাবে পালনের কথা বলা হয়েছে। এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তি প্রকাশ্যে আসার পরে এই পদক্ষেপগুলি নেওয়া হয়। তবে কমিশন আগেই দাবি করেছে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময়ও পূর্ণ কমিশনের অনুমোদনের কথা জানানো হয়েছে।
তবু বিশেষ অভিযান মানেই বাদ পড়া সমস্ত নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসবে, এমন নয়। ঘোষিত ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আবেদন করতে হবে, তার পরে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত হবে। ফলে এই সংশোধনী উদ্যোগের কার্যকারিতা বোঝা যাবে কতজন আবেদন করার সুযোগ পেলেন, কত দ্রুত নিষ্পত্তি হল এবং কতজন যোগ্য ভোটার বাস্তবে তালিকায় ফিরলেন, তার ভিত্তিতে। নাগরিকের কাছে শেষ পর্যন্ত জরুরি বিষয়টি সহজ: ফর্ম জমা দেওয়ার সুযোগের সঙ্গে ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি ফিরে পাওয়াও নিশ্চিত হতে হবে। সেই ফলাফলের হিসাব প্রকাশ পেলে উদ্যোগটির বাস্তব সাফল্যও স্পষ্ট বোঝা যাবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



