খবর

রুশ তেল কেনার শাস্তি, ১০০ শতাংশ শুল্ক

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে গিয়ে ভারত-সহ রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতাদের বিরুদ্ধেও চড়া শুল্ক বসানোর পথ খুলে দিল মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি সভা।
  • বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২৬২–১৫৯ ভোটে পাশ হয়েছে রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিল।
  • সেনেটে আগেই অনুমোদিত হওয়ায় সেটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হচ্ছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে গিয়ে ভারত-সহ রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতাদের বিরুদ্ধেও চড়া শুল্ক বসানোর পথ খুলে দিল মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি সভা। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২৬২–১৫৯ ভোটে পাশ হয়েছে রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিল। সেনেটে আগেই অনুমোদিত হওয়ায় সেটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হচ্ছে। তিনি সই করলে আইন হবে। তবে ভারতের পণ্যে সঙ্গে সঙ্গে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়ে যাবে, এমন নয়।

এর আগের দিন ২১৪–২১১ ভোটে বিলটি আলোচনায় আনার প্রক্রিয়াগত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। বুধবারের ভোট সেই প্রাথমিক ধাপের পুনরাবৃত্তি নঝএর মাধ্যমে প্রতিনিধি সভায় বিলটির চূড়ান্ত অনুমোদনের সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হল।

বিলটির নাম ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’। প্রয়াত রিপাবলিকান সেনেটর গ্রাহাম এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। গত মাসে সেনেটে বিলটি ৮৬–১১ ভোটে পাশ হয়। মূল লক্ষ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ চালানোর জন্য মস্কোর হাতে অর্থ পৌঁছনোর পথ সংকুচিত করা। রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহণে ব্যবহৃত ট্যাঙ্কারবহরকে এর আওতায় আনা হয়েছে।

ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে অন্য একটি বিধান। রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনে, এমন দেশের পণ্য আমেরিকায় ঢোকার সময় সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পাবেন প্রেসিডেন্ট। অর্থাৎ রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির আয় কমাতে চাপ দেওয়া হবে তার ক্রেতাদের উপরও। ভারত ও চিন রুশ তেলের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে থাকায় এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাব সরাসরি তাদের বাণিজ্যে পড়তে পারে।

সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণেও কয়েকটি শর্ত রয়েছে। আইন কার্যকর হওয়ার আগের বারো মাসে পরিমাণের হিসাবে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম পাঁচ আমদানিকারক দেশকে বিবেচনা করা হবে। আইন হওয়ার ত্রিশ দিন পরেও জেনেশুনে নতুন করে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। রুশ তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তাকারী প্রধান পাঁচ দেশের বিরুদ্ধেও শুল্কের সুযোগ রয়েছে। ফলে শুধু আমদানির অঙ্কই একমাত্র বিবেচ্য নয়।

তবে অনুমোদিত ক্ষমতা আর সেই ক্ষমতার প্রয়োগ এক বিষয় নয়। কোন দেশের বিরুদ্ধে, কখন, কত হারে শুল্ক বসবে, তার জন্য প্রেসিডেন্টের পৃথক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের যুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর হাতে থাকছে। তাই বিল পাশের খবরকে ভারতের উপর ইতিমধ্যেই নতুন শুল্ক জারির ঘোষণা হিসেবে পড়লে ভুল হবে। একই কারণে, সর্বোচ্চ হারটিই অনিবার্যভাবে কার্যকর হবে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না।

ভারত-সহ দশটি দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ করার একটি সংশোধনী এনেছিলেন ডেমোক্র্যাট সদস্য স্টেনি হোয়ার ও মার্সি ক্যাপটুর। সেখানে চিন, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশের নামও ছিল। কিন্তু প্রতিনিধি সভার বিধি সংক্রান্ত কমিটি সংশোধনীটি বিবেচনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব ৩–৭ ভোটে খারিজ করে। ফলে ওই নামের তালিকা চূড়ান্ত বিলে ঢোকেনি। তার অর্থ অবশ্য ভারত ঝুঁকিমুক্ত নয়; মূল বিলের আমদানি সংক্রান্ত মানদণ্ডই প্রযোজ্য থাকবে।

ভোটাভুটিতে দুই দলের ভিতরেই মতভেদ প্রকাশ পেয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের আপত্তি সত্ত্বেও দলের ৫৮ জন সদস্য বিলের পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষে যান সাত রিপাবলিকান। বিরোধিতার বড় কারণ রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন নয়, ট্রাম্পের হাতে আরও বিস্তৃত শুল্কক্ষমতা তুলে দেওয়া। ডেমোক্র্যাটদের আশঙ্কা, এর সাহায্যে আমেরিকার মিত্র দেশগুলিকেও নিশানা করা যেতে পারে এবং বাড়তি আমদানি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত মার্কিন ক্রেতাদের উপর পড়বে।

প্রতিনিধি সভার বিদেশবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি মিকসের বক্তব্য, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের যথেষ্ট ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের ইতিমধ্যেই রয়েছে। নতুন করে ব্যাপক শুল্কক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে বিলের সমর্থকদের যুক্তি, রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর আর্থিক সামর্থ্যে আঘাত করতে শক্তিশালী ব্যবস্থা দরকার। রিপাবলিকান সদস্য মাইকেল ম্যাককল একে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও বিলটির পক্ষে সওয়াল করেছেন।

প্রস্তাবের শুল্কহার আগের তুলনায় অবশ্য অনেকটাই কমেছে। প্রাথমিক উদ্যোগে রুশ জ্বালানির ক্রেতা দেশগুলির বিরুদ্ধে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের কথা ছিল। সংশোধিত ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সীমা হয়েছে ১০০ শতাংশ। পাশাপাশি রাশিয়ায় নতুন মার্কিন বিনিয়োগ এবং রুশ সরকারি ঋণপত্র কেনার উপর বিধিনিষেধের ব্যবস্থাও রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর বিধান যুক্ত হওয়ায় বিলটির পরিধি শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

ভারতের জন্য সময়টিও অস্বস্তিকর। নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের বাণিজ্য সমঝোতার আলোচনা চলার মধ্যেই সম্ভাব্য শুল্কের এই নতুন চাপ তৈরি হল। রুশ তেল কেনার পিছনে ভারতের যুক্তি সাশ্রয়ী জ্বালানি ও সরবরাহের নিরাপত্তা। কিন্তু সেই সুবিধার বিপরীতে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্য বিক্রির খরচ বেড়ে গেলে রফতানিকারকদের হিসাব বদলাবে। বিল পাশের আগেই এই অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতীয় রফতানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।

সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ফলটি সহজ। অতিরিক্ত শুল্কে আমেরিকার আমদানিকারকের খরচ বাড়লে তিনি ভারতীয় সরবরাহকারীর কাছে দাম কমানোর দাবি জানাতে পারেন, অন্য দেশ থেকে পণ্য কিনতে পারেন অথবা ক্রেতার উপর বাড়তি দাম চাপাতে পারেন। কোনটি ঘটবে, তা পণ্য, প্রতিযোগিতা ও চুক্তির উপর নির্ভর করবে। ফলে শুল্কের অভিঘাত শুধু দুই সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্কে আটকে থাকবে না; তা ব্যবসার মুনাফা, বরাত এবং উৎপাদনের সিদ্ধান্তেও পৌঁছতে পারে।

এখন নজর ট্রাম্পের স্বাক্ষর এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে। ভারতের ক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন, ওয়াশিংটন এই ক্ষমতা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে রাখবে, না বাস্তবে ব্যবহার করবে। রাশিয়াকে চাপে রাখার মার্কিন উদ্যোগ তাই নয়াদিল্লির সামনে জ্বালানির খরচ, রফতানির স্বার্থ এবং কূটনৈতিক স্বাধীনতা একসঙ্গে সামলানোর পরীক্ষা হয়ে উঠছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles