দুর্গাপুজোর সময়ে মাছ-মাংস না-খাওয়ার আবেদন করেছিলেন বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি ও ধর্মাচরণের উপর বাইরের নির্দেশ বলে তার প্রতিবাদ করেন কংগ্রেস নেতা অতনু দাস এবং অন্য কর্মীরা। তাঁরা শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ জানান এবং তাঁর ছবি পোড়ান। তার পর বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দক্ষিণ কলকাতার বাড়ি থেকে অতনু দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ এনেছে। গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টা আগে বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুলিশ কমিশনারকে ছবি পোড়ানোর ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। সময়ের এই নৈকট্যেই বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, পুলিশ স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগ না করে রাজনৈতিক নির্দেশ মেনেছে।

ছবি পোড়ানো ভারতীয় প্রতিবাদের পুরনো রীতি। তা অশোভন বা উত্তেজক হতে পারে, কিন্তু প্রত্যেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধ হয় না। কোনও বক্তব্য সত্যিই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দিয়েছে কি না, তার জন্য ব্যবহৃত ভাষা, শ্রোতা, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব ক্ষতির সম্ভাবনা পরীক্ষা প্রয়োজন। শুধু কারও ধর্মীয় অনুভূতি আহত হয়েছে—এই অভিযোগে গ্রেফতার করলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে।

অন্য দিকে শাস্ত্রীর বক্তব্যও সাধারণ খাদ্যপরামর্শ নয়। বাংলার দুর্গাপুজোর বিভিন্ন রীতিতে মাছ-মাংসের ব্যবহার রয়েছে। আবার বহু পরিবার সম্পূর্ণ নিরামিষও থাকে। কোনও এক ধর্মীয় নেতা এই বহুত্বের উপর একটিমাত্র আচরণ চাপালে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ স্বাভাবিক। রাজ্য বিজেপির কয়েকজন নেতাও বাংলার নিজস্ব খাদ্যরীতিকে সম্মান করার কথা বলেছেন—দলের ভিতরেই তাই এক ধরনের দূরত্ব দেখা গেছে।

গ্রেফতার ও পরবর্তী সমন শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; রাষ্ট্র কার ‘অনুভূতি’ রক্ষা করছে, সেই প্রশ্নও তুলেছে। শাস্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে করা মূল অভিযোগের তদন্ত কোথায় পৌঁছেছে এবং প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কত দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে—দুটি পাশাপাশি দেখা দরকার।

কংগ্রেস রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদের ঘোষণা করেছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলিরও দায়িত্ব রয়েছে উত্তেজনা না-বাড়িয়ে আইনি ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নটি স্পষ্ট করা। খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে কোনও ধর্মাবলম্বীকে সামগ্রিকভাবে আক্রমণ করা যেমন ভুল, ধর্মীয় সম্মানের নামে বাংলার বহুমাত্রিক আচরণকে এক ছাঁচে ফেলার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য নয়।

আদালতে অভিযোগের ধারা ও গ্রেফতারের প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা হবে। ততক্ষণে একটি বিষয় পরিষ্কার: নবমীর রান্নাঘর থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক রাষ্ট্র, ধর্ম ও মতপ্রকাশের সংঘাতে পৌঁছে গেছে। কারও পাতে কী থাকবে, তার উত্তর আইনসভা বা ধর্মগুরুর নির্দেশে নয়—ব্যক্তি ও পরিবারের বিশ্বাসে নির্ধারিত হওয়াই সাংবিধানিক বহুত্বের পথ।