বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মী বদলির বিল পাশ, ঘাটতি মেটানোর যুক্তি শুভেন্দুর

যা জানা জরুরি
- রাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলির পথ খুলতে সংশোধনী বিল পাশ করল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা।
- বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, এক দিনের বিশেষ অধিবেশনে বিলটি পেশ করেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়।
- মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতি মেটানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে জনবল বিনিময়ের প্রয়োজনেই এই উদ্যোগ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলির পথ খুলতে সংশোধনী বিল পাশ করল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, এক দিনের বিশেষ অধিবেশনে বিলটি পেশ করেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতি মেটানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে জনবল বিনিময়ের প্রয়োজনেই এই উদ্যোগ। তবে শিক্ষক সংগঠনগুলি একে স্বশাসন ও চাকরির নিরাপত্তার উপর আঘাত বলে দেখছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীতে নতুন ১৪এ ধারা যুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে আচার্য ‘প্রশাসনিক কারণে’ কর্মীদের বদলি করতে পারবেন। বদলি হবে রাজ্য বিধানসভার প্রণীত আইনে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে। বদলির নির্দেশে চাকরির শর্ত নির্দিষ্ট থাকবে; সংশ্লিষ্ট কর্মীকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিযুক্ত বলে গণ্য করা হবে।
বদলি হওয়া কর্মী চাইলে মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদে নিজের অধিকার বা ‘লিয়েন’ বজায় রাখতে পারবেন, অথবা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। নির্ধারিত হারে বদলিভাতা ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পরিবহণের খরচ দেওয়ার সংস্থানও রয়েছে। জনস্বার্থে বদলি হওয়া কর্মী মূল প্রতিষ্ঠানে লিয়েন না রাখলে সংশ্লিষ্ট পদ বা কর্মীবর্গে তাঁর প্রথম নিয়োগের তারিখ অনুসারে সিনিয়রিটি নির্ধারিত হবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় একই রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলির সুযোগ রয়েছে। নতুন সংশোধনী সেই পরিসর বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে সম্প্রসারিত করছে। ফলে সিদ্ধান্তটির তাৎপর্য শুধু কর্মস্থল পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকছে না; পৃথক নিয়োগব্যবস্থা ও নিজস্ব পরিচালনবিধি থাকা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে কর্মী স্থানান্তরের জন্য একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
সরকারের যুক্তি, পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের দক্ষতা অপেক্ষাকৃত নতুন প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগানো দরকার। শুভেন্দু ঝাড়গ্রাম ও কোচবিহারের উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিজ্ঞ শিক্ষকেরা সেখানে গিয়ে পঠনপাঠন পরিচালনা, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্ধারণ এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে সাহায্য করতে পারবেন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে উৎকর্ষের কেন্দ্রে গড়ে তুলতে তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এই যুক্তিতে বদলিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দেওয়ার উপায় হিসেবে তুলে ধরছে সরকার।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসনের সঙ্গে সরকারের কাছে জবাবদিহির ভারসাম্য রাখতে চান তাঁরা। তাঁর আশ্বাস, বদলির ফলে পিএইচডি গবেষণার তত্ত্বাবধান কিংবা চলতি প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হবে না।
বিধানসভায় উচ্চশিক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, তৃণমূল আমলে তৈরি নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনও স্থায়ী শিক্ষক নেই। প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলিকে উন্নত করাই লক্ষ্য বলে জানান তিনি। মন্ত্রীর আশ্বাস, ব্যবস্থাটির অপব্যবহার হতে দেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে বৈষম্য কমানোর যুক্তিও দেন তিনি। যদিও কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কত শূন্যপদ, কতজন শিক্ষক প্রয়োজন এবং বদলি কীভাবে সেই ঘাটতি মেটাবে, সেই হিসাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আপত্তি অবশ্য আরও মৌলিক। সংগঠনের বক্তব্য, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিয়ম ও কাজের পদ্ধতি রয়েছে; সেই শর্ত মেনেই কর্মীদের নিয়োগ হয়। তাঁদের সম্পূর্ণ ভিন্ন শর্তের অধীনে কাজ করতে বাধ্য করা ন্যায়সংগত নয়। গোটা ব্যবস্থাকে সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা দুর্বল হবে বলেও অভিযোগ তাদের। সংগঠনটি এই উদ্যোগকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী বলে দাবি করেছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি সনাতন চট্টোপাধ্যায় বিল আনার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার দাবি জানিয়েছিলেন। আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে নিয়োগের সময়কার শর্ত, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং শিক্ষকদের কাজের ধারাবাহিকতা। কর্মী বদলির সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে, শিক্ষকের বিশেষজ্ঞতার সঙ্গে গন্তব্য প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন কীভাবে মেলানো হবে, সেই প্রশ্নও ব্যবস্থাটির মূল্যায়নে প্রাসঙ্গিক।
বিল নিয়ে বিতর্কে সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতও সামনে এসেছে। সিপিএম বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমানের অভিযোগ, একটি বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ; এতে স্বশাসন ও শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী বদলির বিরোধীদের কটাক্ষ করে বলেন, নির্দেশ পছন্দ না হলে তাঁরা চাকরি ছেড়ে দলের সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে গণশক্তি বিক্রি করতে পারেন। যাদবপুরে ছাত্রসংগঠনগুলির সংঘাতের আবহে এই মন্তব্য বদলির প্রশাসনিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বিতর্কও বাড়িয়েছে।
বাস্তবায়নের বিচারে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হবে, ‘প্রশাসনিক কারণ’ কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে। কোনও বিভাগে শিক্ষকের প্রয়োজন মেটানো এবং কোনও ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া একই সিদ্ধান্তের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য হতে পারে। তাই বদলির কারণ, বাছাইয়ের মাপকাঠি এবং আপত্তি জানানোর সুযোগ স্পষ্ট থাকা দরকার। শুধু সিনিয়রিটি বা স্থানান্তরের খরচের নিশ্চয়তা দিয়ে গবেষণাগার, গবেষকদল কিংবা দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাপ্রকল্পের ধারাবাহিকতার প্রশ্ন মেটানো যায় না।
এই আশ্বাসের কার্যকারিতা নির্ভর করবে কার্যকর ব্যবস্থার উপর। কোনও গবেষকের তত্ত্বাবধায়ক দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলে নিয়মিত যোগাযোগ, পরীক্ষাগারের ব্যবহার এবং গবেষণার মূল্যায়ন কীভাবে চলবে, তা আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে বসে স্থির করা প্রয়োজন। আবার নতুন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো অধ্যাপকের জন্য উপযুক্ত গবেষণার পরিবেশ না থাকলে তাঁর অভিজ্ঞতার পুরো সুবিধাও পাওয়া কঠিন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর প্রয়োজনকে একসঙ্গে বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্তের শিক্ষাগত ফল বিচার করতে হবে।
একইভাবে, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক সরিয়ে অন্যটির ঘাটতি পূরণ করলে রাজ্যের মোট শিক্ষকসংখ্যা বাড়ে না। বরং যে প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক যাবেন, সেখানে নতুন অভাব তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। দক্ষতার সুষম বণ্টন প্রয়োজন হলেও স্থায়ী নিয়োগ, অর্থবরাদ্দ এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে বদলিনীতির সম্পর্ক স্পষ্ট করা জরুরি। বিল পাশের পর শিক্ষাঙ্গনের নজর তাই থাকবে বদলির নির্দেশের বাস্তব প্রয়োগে: নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কতটা উপকৃত হচ্ছে, আর প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন ও গবেষণা কতটা সুরক্ষিত থাকছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



