পুরভোটে একলা চলার ঘোষণা বিজেপির, তবু জোটের আশায় এনসিপিআই

যা জানা জরুরি
- কলকাতা ও হাওড়ার আসন্ন পুরভোটে একাই লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিজেপি।
- কেন্দ্রের শাসক জোটের শরিক পরিচয় সামনে রেখে তৃণমূলত্যাগী সাংসদদের দল এনসিপিআই আসন সমঝোতার আশা করলেও রাজ্য বিজেপি সেই সম্ভাবনা খারিজ করছে।
- বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পরে দুই গুরুত্বপূর্ণ পুরসভায় নিজেদের শক্তি যাচাই করতে চায় দল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতা ও হাওড়ার আসন্ন পুরভোটে একাই লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিজেপি। কেন্দ্রের শাসক জোটের শরিক পরিচয় সামনে রেখে তৃণমূলত্যাগী সাংসদদের দল এনসিপিআই আসন সমঝোতার আশা করলেও রাজ্য বিজেপি সেই সম্ভাবনা খারিজ করছে। বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পরে দুই গুরুত্বপূর্ণ পুরসভায় নিজেদের শক্তি যাচাই করতে চায় দল। ফলে দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্ক বাংলার নির্বাচনী ময়দানে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, বিধানসভায় দল নিজের শক্তিতে লড়ে বড় জয় পেয়েছে; কলকাতা ও হাওড়াতেও একা জেতার ক্ষমতা রয়েছে। কোনও শরিকের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির পরিকল্পনা নেই। তবে জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে থাকবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। এই শেষ কথাটিই তাৎপর্যপূর্ণ: রাজ্য নেতৃত্বের আপত্তি স্পষ্ট হলেও সর্বভারতীয় স্তরে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
শমীক দিল্লি ও কলকাতার প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরত্বের প্রসঙ্গও টেনেছেন। তাঁর ইঙ্গিত, জাতীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতা এবং বাংলায় দলের সাংগঠনিক স্বার্থ আলাদা বিবেচনার বিষয়। কেন্দ্রীয় বোঝাপড়া তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানীয় জোটে পরিণত হবে না।
এনসিপিআই সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার অবশ্য নিজেদের এনডিএর বৃহত্তম শরিক বলে দাবি করে পুরভোটেও জোটের অংশ হিসেবে লড়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর আশা, নির্বাচন এগিয়ে এলে সমঝোতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। অন্যদিকে শমীকের যুক্তি, এনসিপিআইয়ের সাংসদেরা তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছিলেন; তাঁদের এনডিএতে যোগদানের সঙ্গে রাজ্য বিজেপির নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সরাসরি সম্পর্ক নেই।
এই টানাপড়েনের পটভূমিতে রয়েছে বিধানসভা ভোটের পরে তৃণমূলের ভাঙন। কাকলির নেতৃত্বে দলত্যাগী সাংসদেরা এনসিপিআইয়ের ছাতার তলায় পৃথক সংসদীয় গোষ্ঠী গড়েন। জুলাইয়ে কাকলি জানান, তাঁদের কুড়ি জনের গোষ্ঠী নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের নেতৃত্বে কাজ করতে চায়। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে সরকারের উদ্যোগ সমর্থনের কথাও বলেন তিনি। গোষ্ঠীতে আট জন মহিলা সাংসদ রয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন কাকলি।
এনসিপিআইয়ের অবস্থান বিচার করতে এই সংসদীয় যাত্রাপথ মনে রাখা জরুরি। দলটির নেতারা জাতীয় স্তরে সহযোগিতার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। কিন্তু কাউন্সিলর নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন প্রতিটি এলাকায় প্রার্থী, কর্মী এবং ভোটারদের সমর্থন। সংসদে সাংসদসংখ্যার গুরুত্ব আর পাড়ার নির্বাচনে সাংগঠনিক উপস্থিতির গুরুত্ব এক নয়। পুরভোট সেই ব্যবধান কতটা, তা বোঝার সুযোগ দেবে।
সংসদে এই সহযোগিতার রাজনৈতিক মূল্য থাকলেও পুরভোটে তার প্রতিদান আসন দিয়ে মেটানো হবে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। এনসিপিআইয়ের কাছে সমঝোতা স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা তৈরির সুযোগ হতে পারে। বিজেপির কাছে আবার আসন ছাড়ার অর্থ নিজের কর্মীদের কিছু দাবি সংযত করা। ফলে দুই দলের প্রয়োজন এক জায়গায় মিলছে কি না, তার পরীক্ষা এখনও বাকি।
রাজ্য বিজেপির আপত্তির পিছনে কর্মীদের মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ নেতা বলেছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে এত দিন দলের কর্মীরা লড়েছেন, তাঁদের সঙ্গে হাত মেলালে ভুল বার্তা যাবে। তৃণমূলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগও জোটবিরোধী যুক্তিতে তুলে ধরা হচ্ছে। এগুলি বিজেপি নেতৃত্বের রাজনৈতিক বক্তব্য; অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তির বিবরণ ওই বক্তব্য থেকে পাওয়া যায় না।
কলকাতার নির্বাচনী প্রস্তুতির দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজেপি নেতা রীতেশ তিওয়ারি সব কটি আসনে লড়ার কথা জানিয়েছেন। দুর্নীতি এবং পুরপরিষেবাকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখতে চায় দল। রাস্তা, নিকাশি, পানীয় জল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আলো নিয়ে প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে। কলকাতার ভোটের দায়িত্ব পেয়েছেন সুকান্ত মজুমদার, হাওড়ার দায়িত্ব রাহুল সিনহা। বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিজেদের সুবিধা করে দিতে পারে বলেও বিজেপির একাংশ মনে করছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির সঙ্গে পাল্টাচ্ছে দুই শহরের নির্বাচনী মানচিত্র। কলকাতায় ওয়ার্ডের সংখ্যা ১৪৪ থেকে ২০৯ এবং হাওড়ায় ৫০ থেকে ৬৮ করার ব্যবস্থা হচ্ছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কলকাতা ও হাওড়া-সহ আটটি পুরসভার নির্বাচন ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা হবে। অন্য ছয়টি হল বালি, হলদিয়া, ঝাড়গ্রাম, ধূপগুড়ি, কালিম্পং এবং কার্শিয়াং। ভোট হবে নির্বাচন কমিশনের ১ জুলাই প্রকাশিত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে।
হাওড়ায় ২০১৮ সাল থেকে পুরভোট বকেয়া। কলকাতায় ফিরহাদ হাকিমের মেয়র পদে ইস্তফার পরে ৮ জুন পুরবোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়; বর্তমানে প্রশাসক পুরসভা চালাচ্ছেন। ফলে এই নির্বাচন দুই শহরেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে পুরপরিচালনা ফেরানোর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। শুধু দলগুলির শক্তি পরিমাপ নয়, নাগরিকদের কাছে সরাসরি জবাবদিহির ব্যবস্থাও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
কলকাতায় ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের খসড়া নিয়ে শুনানি ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের কাছ থেকে প্রায় তিনশো পরামর্শ এবং আপত্তি জমা পড়েছে। শুনানির প্রতিবেদন দেখে পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর চূড়ান্ত সীমানা প্রকাশ করবে। তার পরে কোন ওয়ার্ড মহিলা, তফসিলি জাতি কিংবা তফসিলি জনজাতির জন্য সংরক্ষিত হবে, তা ঠিক করবে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। এই সিদ্ধান্ত প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ওয়ার্ডের চূড়ান্ত সীমানা এবং সংরক্ষণের তালিকা প্রকাশিত হলে দলগুলিকে সেই অনুযায়ী প্রার্থী তালিকা সাজাতে হবে। একটি পুরনো ওয়ার্ড ভাগ হলে পরিচিত ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রও বদলাতে পারে। আবার সংরক্ষণ বদলালে প্রার্থীর নির্বাচনক্ষেত্র বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। ফলে জোটের আলোচনা থাকুক বা না থাকুক, চূড়ান্ত তালিকার আগে আসনভিত্তিক হিসাব স্থির করা কঠিন। সব দলের প্রস্তুতিতেই এই প্রশাসনিক ধাপটি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এদিকে তৃণমূল ও কংগ্রেস পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তৃণমূলের কুণাল ঘোষের অভিযোগ, বিজেপি সুবিধা পেতে সীমানা বদলাচ্ছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও প্রক্রিয়াটির বিরোধিতা করে সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। আপাতত তাই পুরভোটের আগে দুটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া বাকি: চূড়ান্ত ওয়ার্ডবিন্যাস এবং এনসিপিআইকে নিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



