বাংলাস্ফিয়ার: ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার জেরে দানিয়ুব নদীর জলস্তর রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ায় নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটে পড়েছে রোমানিয়া ও হাঙ্গেরি। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শীতলীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় জল পৌঁছে দিতে রোমানিয়ার নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নদীর প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে, হাঙ্গেরি জানিয়েছে, তাদের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হয়তো আর মাত্র দু’দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
দানিয়ুবের জল ব্যবহার করে শীতলীকরণ করা হয়—এমন পারমাণবিক চুল্লি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে দুই দেশ। নদীর জলস্তর এতটাই নেমে গেছে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিরাপদভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোমানিয়ার একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চেরনাভোদার একটি চুল্লি ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে। পরিস্থিতির জেরে দেশজুড়ে আগস্ট মাসের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার।
চেরনাভোদা কেন্দ্রের শীতলীকরণ খালে আরও বেশি জল প্রবাহিত করতে দানিয়ুবের তলদেশে প্রবাহ আটকে থাকা একটি বিশাল পাথর উড়িয়ে দিতে ১৮০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। বিস্ফোরণের পর জলরাশির বিশাল স্তম্ভ আকাশে উঠে যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, এরপর ওই এলাকায় একটি অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে পারমাণবিক কেন্দ্রের দিকে আরও বেশি জল সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাডু মিরুতা বলেন, “বুধবার বা বৃহস্পতিবারের পরও যদি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা যায়, সেটাই বড় সাফল্য। কেন্দ্রটি একদিন সচল থাকলেই এই অভিযানের খরচের তুলনায় তিন গুণ বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা মিলবে।”
হাঙ্গেরির ৪৪ বছর পুরনো পাকশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা দেশটির প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, বর্তমানে অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায় চলছে। কর্তৃপক্ষ আগে জানিয়েছিল, রবিবারই কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পরে জানানো হয়, সীমিত ক্ষমতায় সোমবার বা মঙ্গলবার পর্যন্ত চালানো সম্ভব হতে পারে।
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পেতের মাজার জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দানিয়ুবের জল দ্রুত বাড়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকায় এই অচলাবস্থা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “সোমবার থেকেই জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে। আরও বড় বিপর্যয় এড়াতে সমন্বিত পদক্ষেপ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম প্রয়োজন।”
তিনি আরও জানান, রবিবার নাগরিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছায় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর ফলে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট চাহিদা কমেছে, যা জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেকটাই কমিয়েছে। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রিখটারও আগামী তিন সপ্তাহে তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার ৫০ শতাংশের বেশি কমানোর কথা ঘোষণা করেছে।
সংকট কেবল রোমানিয়া ও হাঙ্গেরিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সার্বিয়ার প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও দানিয়ুবের জল কমে যাওয়ায় মাত্র ২০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী জুরো মাচুত জরুরি বৈঠক ডেকেছেন।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। ফলে দানিয়ুবের জলস্তর দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার আশা নেই।
১০টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম এই নদীর বহু অংশে জলস্তর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নদীর শুকিয়ে যাওয়া তলদেশ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাহাজডুবির ধ্বংসাবশেষ, একটি অবিস্ফোরিত বোমা এবং এমনকি একটি লোমশ ম্যামথের জীবাশ্মও সম্প্রতি উদ্ধার হয়েছে। বুলগেরিয়ার উত্তরাঞ্চলের রিয়াহোভো গ্রামের কাছে স্থানীয় এক বাসিন্দা নদীর শুকিয়ে যাওয়া অংশে ম্যামথের হাড় দেখতে পেয়ে কর্তৃপক্ষকে খবর দিলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেটি পরীক্ষা করতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। অর্থাৎ জলস্তরের নিম্নপর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া আড়ালে থাকা ইতিহাসের দলিল প্রকাশে সহায়ক হয়েছে।