কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের বক্সিং দল আবারও প্রমাণ করল, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তারা এখন অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ভারতীয় বক্সারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে উচ্ছ্বসিত বক্সিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (BFI)-এর সভাপতি অজয় সিং। তাঁর কথায়, দলের পারফরম্যান্স শুধু প্রত্যাশা পূরণই করেনি, বরং প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।
প্রতিযোগিতা শেষে অজয় সিং বলেন, ভারতীয় বক্সাররা অসাধারণ লড়াইয়ের মানসিকতা দেখিয়েছেন। কঠিন ড্র, চাপের ম্যাচ এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁরা যে আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা ভারতের বক্সিংয়ের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তাঁর মতে, এই সাফল্য কেবল পদকের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতীয় বক্সিংয়ের ধারাবাহিক উন্নতির প্রতিফলন।
পুরুষ দলের প্রধান কোচ সি. এ. কুট্টাপ্পাও একই সুরে প্রশংসা করেছেন তাঁর শিষ্যদের। তিনি বলেন, এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কঠোর অনুশীলন, শৃঙ্খলা এবং আত্মত্যাগ। প্রতিটি বক্সার নিজের সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন। অনেকেই কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছেন, যা দলের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ।
কুট্টাপ্পার মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এখন আর শুধুমাত্র প্রতিভা যথেষ্ট নয়। শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতি, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় বক্সাররা এই সমস্ত ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছেন।
অন্যদিকে, মহিলা দলের প্রধান কোচ সান্তিয়াগো নিয়েভা এই সাফল্যকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে উল্লেখ করলেও আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, কমনওয়েলথ গেমসের এই ফলাফল ভবিষ্যতের বড় প্রতিযোগিতাগুলির জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়াবে ঠিকই, কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না।
নিয়েভা বলেন, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, এশিয়ান গেমস এবং অলিম্পিকের মতো আরও কঠিন প্রতিযোগিতা সামনে রয়েছে। সেই লক্ষ্যেই এখন থেকে পরিকল্পনা করতে হবে। তিনি মনে করেন, তরুণ এবং অভিজ্ঞ বক্সারদের সঠিক সমন্বয় তৈরি করতে পারলে ভারত আগামী কয়েক বছরে বিশ্ব বক্সিংয়ের অন্যতম শক্তিধর দেশ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের বক্সিংয়ের এই সাফল্য অবশ্য হঠাৎ করে আসেনি। গত এক দশকে প্রশিক্ষণ পরিকাঠামো, বৈজ্ঞানিক কোচিং, আন্তর্জাতিক এক্সপোজার এবং প্রতিভা অন্বেষণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে উঠে আসা তরুণ বক্সারদের নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তারই ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে ধারাবাহিকভাবে।
একসময় ভারতীয় বক্সিং মূলত কয়েকজন তারকা খেলোয়াড়ের উপর নির্ভরশীল ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বিভিন্ন ওজন বিভাগে একাধিক প্রতিভাবান বক্সার উঠে আসছেন। ফলে দল নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক মান বাড়াতে সাহায্য করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কমনওয়েলথ গেমসে এই পারফরম্যান্সের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ভারতীয় বক্সাররা শুধু অভিজ্ঞ প্রতিযোগীদের উপর নির্ভর করেননি। নতুন প্রজন্মের বক্সাররাও নিজেদের প্রমাণ করেছেন। এর ফলে আগামী কয়েক বছরের জন্য ভারতীয় বক্সিংয়ের শক্ত ভিত তৈরি হয়েছে।
এই সাফল্য দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছেও বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। ক্রিকেটের বাইরে বক্সিংয়ের মতো খেলাতেও আন্তর্জাতিক সাফল্য যে সম্ভব, তা আবারও প্রমাণিত হল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু কিশোর-কিশোরী ইতিমধ্যেই বক্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হচ্ছে। এই সাফল্য সেই প্রবণতাকে আরও জোরদার করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ক্রীড়া প্রশাসকদের মতে, এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, পুষ্টি, স্পোর্টস সায়েন্স, মানসিক প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বাড়াতে হবে। কারণ বিশ্ব বক্সিংয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে এবং শীর্ষে থাকতে হলে উন্নতির ধারাকে অব্যাহত রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের বক্সিং দলের পারফরম্যান্স শুধু পদক জয়ের গল্প নয়। এটি ভারতীয় বক্সিংয়ের ক্রমবর্ধমান শক্তি, পরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল বার্তা। বক্সিং ফেডারেশন, কোচ এবং খেলোয়াড়— সকলের লক্ষ্য এখন একটাই, এই সাফল্যকে ভিত্তি করে আগামী বিশ্বমঞ্চেও ভারতের তেরঙ্গাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরা।