বাংলাস্ফিয়ার: প্রায় ১৮ বছর পর শুক্রবার কলকাতায় ফিরলেন নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘদিন পর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি বলেন, “আমি খুবই খুশি। সবাইকে ধন্যবাদ।”

বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক অনুমতিতে দিল্লিতে বসবাসকারী তসলিমা দু’দিনের জন্য কলকাতায় এসেছেন। ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’, ‘হিউম্যান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ার্স’ এবং ‘সেকুলার মিশন’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেবেন। ওই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তসলিমা বলেন, “বিশ্বাসই করতে পারছি না যে আমি কলকাতায় এসেছি। ২০০৭ সালে আমাকে এই শহর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম, আবার নিশ্চয়ই ফিরতে পারব। কলকাতা তো একটি প্রগতিশীল শহর। কিন্তু বছর গড়াতে গড়াতে মনে হতে থাকে, হয়তো আর কোনও দিনই ফেরা হবে না। পরে সেকুলার মিশনের ওসমান গনি মল্লিক আমাকে আমন্ত্রণ জানান এবং সমস্ত ব্যবস্থা করেন।”

১৯৯৪ সালে লজ্জা বই প্রকাশের পর বাংলাদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীর হুমকি এবং প্রাণনাশের আশঙ্কার মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর বাংলাদেশে একটি হিন্দু পরিবারের ওপর হওয়া নির্যাতনের কাহিনি উঠে এসেছিল ওই বইয়ে। পরে তিনি ইউরোপে চলে যান এবং সুইডেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দিল্লিতে বসবাস করছেন।

২০২৫ সালে সংসদে তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গে ফেরার অনুমতি দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন শমীক ভট্টাচার্য। শুক্রবার তিনি বলেন, “আমি আগেই বলেছিলাম, তসলিমা নাসরিনের বাংলায় আসা উচিত। আয়োজকদের উদ্যোগে সেটা সম্ভব হয়েছে। আমি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকব।”

অন্যদিকে, সিপিএমের প্রবীণ নেতা তথা ২০০৭ সালের কলকাতার তৎকালীন মেয়র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য তসলিমার প্রত্যাবর্তন নিয়ে কটাক্ষ করেন। তাঁর দাবি, “তাঁকে তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য আনা হচ্ছে না। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি এবং আরএসএস-এর পক্ষে কথা বলে আসছেন বলেই তাঁকে আনা হয়েছে।”

২০০৭ সালে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ দ্বিখণ্ডিত-এ ইসলাম ধর্মকে অবমাননার অভিযোগ তুলে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন তসলিমার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নামে। সেই বিক্ষোভ পরবর্তীতে সহিংসতায় রূপ নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী নামাতে হয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার তাঁকে কলকাতা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর তিনি কলকাতা ত্যাগ করেন।

সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তসলিমা বলেন, “আমি ভেঙে পড়েছিলাম। বাংলাদেশ সরকার আমাকে নির্বাসিত করেছে, সেটা কোনওভাবে বুঝতে পারতাম। আসলে মৌলবাদীরাই আমাকে তাড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু শুধু তারা পারত না—সরকারও তা চেয়েছিল। কলকাতার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। সরকার চাইলে আমি এখানেই থাকতে পারতাম।”

অতীত ভুলে যেতে চান বলেও জানান তিনি। তাঁর কথায়, “সবকিছু ভুলে যেতে চাই। এক বাংলায় (বাংলাদেশে) ফিরতে না পারলেও অন্য বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গে) ফিরতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত।”