Table of Contents
হাইলাইটস
- স্পেসএক্সের ঐতিহাসিক শেয়ারবাজারে অভিষেকের পর ইলন মাস্কের সম্পদ বেড়ে ১.১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
- প্রথম দিনের লেনদেনেই সংস্থার বাজারমূল্য ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
- মাত্র একদিনে মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ বেড়েছে ৬২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
- মহাকাশ ব্যবসার চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ই স্পেসএক্সের বিপুল মূল্যায়নের মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
- তবু এই বিপুল সম্পদের ভিত্তি এখনও অনিশ্চিত; এআই-নির্ভর ভবিষ্যৎ সফল না হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতেও পারে।
ইতিহাসে প্রথমবার কোনও ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করল। আর সেই ব্যক্তির নাম ইলন মাস্ক। শুক্রবার স্পেসএক্সের নজিরবিহীন শেয়ারবাজারে আত্মপ্রকাশের ফলে বিশ্বের ধনীতম মানুষ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ১,১০০ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মাস্ক এর আগেও বহুবার সম্পদের নতুন রেকর্ড গড়েছেন। কিন্তু এবার তিনি এমন এক সীমা অতিক্রম করলেন, যা এতদিন পর্যন্ত অর্থনীতির পাঠ্যবই বা কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই বেশি মানানসই ছিল।
কী ঘটল স্পেসএক্সের আইপিওতে?
শুক্রবার স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে অভিষেক ছিল অভূতপূর্ব। সংস্থাটি তাদের প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি বা আইপিও থেকে ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। এটি ইতিহাসের বৃহত্তম আইপিওগুলির মধ্যে অন্যতম।
শেয়ারের ইস্যু মূল্য ছিল ১৩৫ ডলার। বাজারে লেনদেন শুরু হয় ১৫০ ডলারে। দুপুর নাগাদ দাম উঠে যায় ১৭৬ ডলারে। শেষ পর্যন্ত বাজার বন্ধ হওয়ার সময় শেয়ারের মূল্য দাঁড়ায় ১৬১ ডলার, যা ইস্যু মূল্যের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।
এই উত্থানের ফলে স্পেসএক্সের বাজারমূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার। আর মাস্ক, যিনি এখনও সংস্থার বিপুল অংশীদার, তাঁর সম্পদও লাফিয়ে বাড়ে।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র একদিনে মাস্কের সম্পদ বেড়েছে ৬২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
১.১ ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত?
ট্রিলিয়ন ডলার কথাটি এত বড় সংখ্যা যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কল্পনা করাও কঠিন।
১.১ ট্রিলিয়ন ডলার এমন একটি অঙ্ক, যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের চেয়েও বেশি। পৃথিবীর মাত্র কুড়ি-একটি দেশের মোট অর্থনীতি এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।
মাস্কের জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকার বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদের অর্ধেকেরও কম।
আরও সহজ করে বললে, এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে ২৪৩ বিলিয়ন গ্যালন পেট্রোল কেনা সম্ভব। গত বছর আমেরিকায় যত পেট্রোল ব্যবহৃত হয়েছে, তারও অনেক বেশি।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। এই বিপুল সম্পদের বেশিরভাগই নগদ অর্থ নয়। তা বিভিন্ন সংস্থার শেয়ার, মালিকানা এবং বিনিয়োগের আকারে রয়েছে। ফলে মাস্ক চাইলে আগামীকালই ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে পারবেন না।
সম্পদের বিস্ফোরণ
মাত্র পনেরো বছর আগে, ২০১১ সালে, ইলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৮০ মিলিয়ন ডলার। আজকের হিসাব অনুযায়ী তা এক ট্রিলিয়নেরও বেশি।
২০১৬ সালের দিকে তাঁর সম্পদ ছিল প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর শুরু হয় বিস্ফোরক উত্থান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সালের পর থেকে মাস্কের সম্পদ বৃদ্ধির গ্রাফ দেখতে অনেকটা হকিস্টিকের মতো। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় অপেক্ষাকৃত সমতল থাকার পর হঠাৎ খাড়া উল্লম্ফন।
সেই সময়ই টেসলা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থায় পরিণত হয়। একইসঙ্গে মাস্ক বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক কুইন স্লোবোডিয়ান বলছেন, “মাস্ক এমন কিছু শিল্পক্ষেত্র তৈরি করতে পেরেছেন, যা আগে কার্যত ছিলই না। অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে ইলন মাস্কের বিরুদ্ধে বাজি ধরা উচিত নয়।”
স্পেসএক্স না এআই—আসল গল্প কোনটি?
অনেকের ধারণা, স্পেসএক্সের মূল্যায়নের মূল কারণ মহাকাশ প্রযুক্তি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আসল কারণ হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
কয়েক মাস আগে মাস্ক তাঁর এআই সংস্থা xAI-কে স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত করেন। এই সিদ্ধান্ত বাজারকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
মাস্ক ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, ভবিষ্যতে মহাকাশে বিপুল সংখ্যক তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার স্থাপন করা হতে পারে। তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে মানব উপনিবেশ গড়ে তোলা।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক মিহির দেশাই মনে করেন, শুধু মহাকাশ ব্যবসা দিয়ে স্পেসএক্স এত বড় মূল্যায়ন পেত না। এআই-ই বিনিয়োগকারীদের কল্পনাকে উসকে দিয়েছে।
বর্তমানে বাজারে একটি শক্তিশালী বিশ্বাস কাজ করছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো সহস্রাব্দে একবার আসা প্রযুক্তিগত বিপ্লব। সেই সম্ভাবনার উপর ভর করেই বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের বিশাল মুনাফার স্বপ্ন দেখছেন।
কিন্তু লাভ কোথায়?
আশ্চর্যের বিষয়, স্পেসএক্স এখনও বিপুল ক্ষতির মুখে।
সংস্থার নথি অনুযায়ী, এআই বিভাগ গত বছর ৬.৪ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করেছে। উন্নত এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য বিশাল পরিমাণ গণনাশক্তি এবং তথ্যকেন্দ্রের প্রয়োজন হয়। সেই খরচই ক্ষতির প্রধান কারণ।
স্পেসএক্স নিজেই তাদের বিনিয়োগপত্রে সতর্ক করেছে যে সংস্থা হয়তো কোনওদিনও লাভজনক নাও হতে পারে।
তবু বিনিয়োগকারীরা কেন টাকা ঢালছেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কাজ করছে ভবিষ্যৎ লাভের আশা এবং সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়।
অনেকেই মনে করছেন, আজ যদি এআই বিপ্লবে অংশ না নেন, তবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ হারাতে পারেন।
‘আর্থিক সম্প্রদায়’ নাকি ‘ভক্তগোষ্ঠী’?
মিহির দেশাই মাস্কের সবচেয়ে অনুগত বিনিয়োগকারীদের বর্ণনা করতে গিয়ে একটি বিতর্কিত শব্দ ব্যবহার করেছেন—‘আর্থিক সম্প্রদায়’ বা ‘ফিনান্সিয়াল কাল্ট’।
তাঁর বক্তব্য, এই বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করেন যে মাস্ক এতটাই মেধাবী যে বর্তমান পণ্য বা ব্যবসায়িক মডেল দুর্বল হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সফল হবেন।
এই বিশ্বাস নতুন নয়।
২০১০ সালে টেসলার আইপিওর দিন কেউ যদি ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করতেন, তাহলে আজ সেই বিনিয়োগের মূল্য ২০ লক্ষ ডলারেরও বেশি হত।
এই ধরনের অতীত সাফল্যই মাস্ককে বিনিয়োগকারীদের কাছে এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রে এখনও মাস্ক
স্পেসএক্সের আইপিওর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, মাস্ক তাঁর কোনও শেয়ার বিক্রি করেননি।
বরং তিনি এখনও সংস্থার ভোটাধিকারযুক্ত শেয়ারের ৮২ শতাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করেন।
অর্থাৎ, কোম্পানি এখন তালিকাভুক্ত হলেও কার্যত মাস্কের হাতেই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়ে গেছে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে তাঁকে সরানো বা তাঁর সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলা অত্যন্ত কঠিন হবে।
এই ট্রিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য কতটা স্থায়ী?
যদিও আজ মাস্ক ইতিহাসের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার, তবু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে এই সম্পদ পাথরে খোদাই করা নয়।
স্পেসএক্স, xAI, টেসলা—সবকিছুর ভবিষ্যৎ এখন অনেকাংশে এআই বিপ্লবের সফলতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
যদি এআই প্রত্যাশামতো বিপুল লাভ এনে দিতে না পারে, যদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়, তাহলে এই মূল্যায়ন দ্রুত কমতেও পারে।
স্লোবোডিয়ানের কথায়, “এটি কোনও অটুট সম্পদ নয়। ইতিহাসের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হয়তো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইতিহাসের প্রথম ‘সাবেক’ ট্রিলিয়নিয়ার হয়ে যেতে পারেন।”
তবে আপাতত সেই আশঙ্কা দূরে। শুক্রবারের শেয়ারবাজারের উল্লাসে স্পষ্ট, বিশ্বের আর্থিক বাজার এখনও ইলন মাস্কের ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখতে প্রস্তুত। আর সেই বিশ্বাসই তাঁকে মানুষের ইতিহাসে সম্পদের এক সম্পূর্ণ নতুন স্তরে পৌঁছে দিয়েছে।