স্কুলে তালা, পথে পড়ুয়ারা!

যা জানা জরুরি
- শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা, শিক্ষকের অভাব, জরাজীর্ণ স্কুলবাড়ি—একগুচ্ছ অভিযোগ নিয়ে ফ্রান্সজুড়ে ফের রাস্তায় নামল হাইস্কুলের পড়ুয়ারা।
- আন্দোলনের দশম দিনেও পিছু হটার কোনও ইঙ্গিত নেই।
- বৃহস্পতিবার লিল, রেন, নঁত, লিয়ঁ, তুলোঁ ও মার্সেই-সহ একাধিক শহরে স্কুল অবরোধ করে মিছিল করেন তারা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
স্কুলে তালা, পথে পড়ুয়ারা!
শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা, শিক্ষকের অভাব, জরাজীর্ণ স্কুলবাড়ি—একগুচ্ছ অভিযোগ নিয়ে ফ্রান্সজুড়ে ফের রাস্তায় নামল হাইস্কুলের পড়ুয়ারা। আন্দোলনের দশম দিনেও পিছু হটার কোনও ইঙ্গিত নেই। বৃহস্পতিবার লিল, রেন, নঁত, লিয়ঁ, তুলোঁ ও মার্সেই-সহ একাধিক শহরে স্কুল অবরোধ করে মিছিল করেন তারা। আন্দোলনে শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমিক সংগঠনগুলির সমর্থনও ক্রমশ বাড়ছে। যদিও বিক্ষোভের জেরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং বলপ্রয়োগের অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে বিভিন্ন শহরে।
প্যারিসে বৃহস্পতিবারের মিছিল গিয়ে পৌঁছয় শহরের কেন্দ্রস্থলে প্লাস দ্য লা বাস্তিল চত্বরে। সেখানে আনুমানিক ২৫ হাজার পড়ুয়া জড়ো হয়েছিল। তাদের কয়েক জন চত্বরের মাঝখানে থাকা স্মারকস্তম্ভে উঠে ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা ওড়ায়। গেয়ে ওঠে জাতীয় সংগীত ‘লা মার্সেইয়েজ’। ১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিবাহী এই চত্বরে পড়ুয়াদের জমায়েত যেন প্রতিবাদের প্রতীকী মঞ্চ হয়ে ওঠে।
তবে সন্ধ্যা নামতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের সরাতে কাঁদানে গ্যাস ও ভিড় ছত্রভঙ্গ করার গুলি ব্যবহার করে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ। বারবার লাঠিচার্জেরও অভিযোগ ওঠে। পাল্টা বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল, রাস্তার পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছোড়ে। আন্দোলনের এই পর্যায়ে কয়েকশো মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
প্যারিসের মিছিলে যোগ দেওয়া ১৬ বছরের ছাত্রী এলিয়ান জানায়, সে এসেছে “আমার স্কুলের চেয়েও খারাপ অবস্থায় থাকা হাইস্কুলগুলির পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের উৎসাহ দিতে”। মিছিলকে ‘অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করে তার বক্তব্য, বাস্তবে পরিবর্তন না দেখা পর্যন্ত প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে সে।
সরকারের আশ্বাস, পড়ুয়াদের অনাস্থা
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপের ঘোষণা করেছে ফরাসি সরকার। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বৃহস্পতিবার রাতে টিএফ১ টেলিভিশনকে জানান, শিক্ষকসংকট বিশেষভাবে তীব্র এমন প্রায় ১০০টি হাইস্কুলে তিন হাজার বিকল্প শিক্ষক পাঠানো হবে। তাঁর কথায়, শুক্রবার থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।
পাশাপাশি, “কয়েকশো” নতুন শিক্ষক নিয়োগের অনুমতিও দেবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু আবার ২০২৭ সালের বাজেটে সংশোধনী আনার প্রস্তাব দেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, এর মাধ্যমে পড়ুয়াদের কিছু দাবিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে, বিশেষত অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে।
কিন্তু সরকারের এই আশ্বাসে এখনও ভরসা পাচ্ছে না আন্দোলনকারীদের একাংশ। হাইস্কুলের পড়ুয়াদের একটি সংগঠনের সভাপতি রিয়াদ রানি অভিযোগ করেন, “কোনও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথাই শোনেনি, আমাদের দাবিরও কোনও জবাব পায়নি” আন্দোলনকারীরা। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, প্রতিবাদ চলবে।
অন্য একটি ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি সাব্রিন খারবাখের দাবি, শিক্ষকসংকট, স্কুলে দীর্ঘ সময় কাটানোর চাপ এবং জরাজীর্ণ ভবনের সমস্যা মেটাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাঁর কথায়, যত দিন না স্কুলগুলির জন্য ১০ বিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ এক হাজার কোটি ইউরো বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তত দিন আন্দোলন চলবে। কয়েক জন বামপন্থী রাজনীতিকও ফ্রান্সের স্কুলগুলিতে জরুরি ভিত্তিতে এই পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের পক্ষে সওয়াল করেছেন।
দাবিতে সমর্থন, বিক্ষোভে আপত্তি
পড়ুয়াদের দাবির প্রতি জনসমর্থনের ইঙ্গিতও মিলেছে একটি সমীক্ষায়। বিএফএম টিভির জন্য এলাবের করা জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, ফ্রান্সের ৭২ শতাংশ মানুষ মনে করেন, পড়ুয়াদের দাবিগুলি ন্যায্য। তবে ৫৫ শতাংশের মতে, বিক্ষোভ বন্ধ হওয়া উচিত। অর্থাৎ, শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আন্দোলনের পদ্ধতি ও স্থায়িত্ব নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
এদিকে পড়ুয়াদের সমর্থনে আগামী মঙ্গলবার ফের দেশজুড়ে কর্মসূচির ডাক দিয়েছে শ্রমিক ও কর্মচারী সংগঠনগুলি। ফলে স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই আন্দোলন আরও বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদের রূপ নিতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলির তুলনায় বৃহস্পতিবার কম স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। সকালে ২২৪টি হাইস্কুল বন্ধ থাকলেও দুপুরের মধ্যে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৫৭-তে। মন্ত্রকের দাবি, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ হাইস্কুল অন্তত আংশিকভাবে খোলা ছিল।
তবে রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাবে, বৃহস্পতিবার ৭১ হাজারের বেশি মানুষ প্রতিবাদে অংশ নেন। প্যারিসের কয়েকটি স্কুলের সামনে ব্যারিকেড ঘিরে পুলিশের সঙ্গে ফের সংঘর্ষ হয়। রেন শহরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ।
‘কথা শোনার বেলায় ছোট, গ্যাস খাওয়ার বেলায় বড়’
পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও আন্দোলনের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। প্যারিসের মিছিলে একটি ব্যানারে লেখা ছিল, “আমাদের কথা শোনার বেলায় আমরা খুব ছোট, কিন্তু কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার বেলায় যথেষ্ট বড়।”
ব্যানারের এই বক্তব্যেই ধরা পড়েছে পড়ুয়াদের ক্ষোভ—শিক্ষার পরিকাঠামো ও শিক্ষকসংকটের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যায় তাদের দাবি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি প্রতিবাদের জবাবে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
সরকারের তরফে নিয়োগ ও বাজেটের আশ্বাস মিললেও পড়ুয়ারা যে এখনই আন্দোলন গুটিয়ে নিতে রাজি নয়, তা দশম দিনের কর্মসূচি স্পষ্ট করে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ, স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং বরাদ্দ বৃদ্ধির মতো দাবিতে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আসে, তার উপরই নির্ভর করবে ফ্রান্সের এই ছাত্রবিক্ষোভের পরবর্তী গতিপথ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



