International

নকলের চকচকে ডিস্ক

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • প্রতিবেদন: ভিনাইলের চকচকে মোড়ক, পরিচিত শিল্পীর নাম, হাতে ধরার মতো একটি রেকর্ড—সবই আসল মনে হতে পারে।
  • কিন্তু লন্ডনে এমনই ‘আসল’-এর আড়ালে চলছিল নকলের কারবার।
  • বিটলস থেকে টেলর সুইফট—বিভিন্ন শিল্পীর নাম ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ নকল ভিনাইল তৈরির মামলায় রেহান আহমেদকে সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রতিবেদন: ভিনাইলের চকচকে মোড়ক, পরিচিত শিল্পীর নাম, হাতে ধরার মতো একটি রেকর্ড—সবই আসল মনে হতে পারে। কিন্তু লন্ডনে এমনই ‘আসল’-এর আড়ালে চলছিল নকলের কারবার। বিটলস থেকে টেলর সুইফট—বিভিন্ন শিল্পীর নাম ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ নকল ভিনাইল তৈরির মামলায় রেহান আহমেদকে সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। ১৮ সেপ্টেম্বর ইনার লন্ডন ক্রাউন কোর্টে সাজা ঘোষণা হয়; সিটি অব লন্ডন পুলিশ বিস্তারিত জানায় ২১ সেপ্টেম্বর। রায়ের দিন এবং পুলিশের সংবাদ প্রকাশের দিন আলাদা।

পশ্চিম লন্ডনের সাউথলের বাসিন্দা ৪০ বছরের আহমেদ অ্যাক্টনে ‘ফিনিক্স অব ভিনাইল’ নামে ব্যবসা চালাতেন। পুলিশের হিসাবে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলা এই কারবারে প্রায় ২৭ লক্ষ ৪৩ হাজার পাউন্ড রাজস্ব এসেছিল। তবে এটি বিক্রয় থেকে আসা আয়; একে নিট মুনাফা বা শিল্পীদের প্রমাণিত আর্থিক ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তদন্তের সূত্র মেলে সংগীতশিল্পের সংস্থা বিপিআইয়ের পরীক্ষামূলক কেনাকাটায়। কেনা রেকর্ড পরীক্ষা করে নকলের সন্দেহ নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশের মেধাস্বত্ব অপরাধ দমন ইউনিট তদন্ত শুরু করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ যে বিপুল পরিমাণ সামগ্রী উদ্ধার করে, তাদের দাবি অনুযায়ী, সেটি ব্রিটেনে নকল ভিনাইল উদ্ধারের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলির একটি। এই ‘সবচেয়ে বড়’ মূল্যায়ন পুলিশের; কোনও স্বাধীন আন্তর্জাতিক তালিকার নয়।

উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর তালিকাও চমকে দেওয়ার মতো। ছিল ২,৭৯১টি রেকর্ড, প্রায় ৩,০০০টি ছাঁচ এবং চারটি পুরনো রেকর্ড-প্রেস। সব মিলিয়ে পুলিশ প্রায় ১৮ টন প্রমাণসামগ্রী সরিয়ে নেয়। ছাঁচ দিয়ে একাধিক রেকর্ড তৈরি করা যায়, তাই উদ্ধার হওয়া রেকর্ডের সংখ্যা আর সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা এক নয়। পুলিশের হিসাবে, উদ্ধার হওয়া সামগ্রীতে ১০৮ জন শিল্পীর কাজের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।

দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এ প্রকাশিত পিএ সংবাদসংস্থার প্রতিবেদনে অ্যাডেল, আরিয়ানা গ্র্যান্ডে, এড শিরান, ব্যাড বানি, ড্রেক, বিয়ন্সে ও রিহানার মতো শিল্পীদের নামও এসেছে। অর্থাৎ শুধু পুরনো দিনের দুর্লভ রেকর্ডের সংগ্রাহকরাই লক্ষ্য ছিলেন না। বিভিন্ন প্রজন্মের জনপ্রিয় সংগীতের বাজারকেও একই উৎপাদনব্যবস্থায় টার্গেট করা হয়েছিল বলে মামলার তথ্য থেকে বোঝা যায়।

এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলায় আদালতে দোষসিদ্ধি ও সাজা হয়েছে। ফলে বিষয়টি কেবল কোনও সংস্থার অভিযোগ বা সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সন্দেহের পর্যায়ে নেই। আবার এই একটি মামলার রাজস্বের অঙ্ককে শিল্পীদের মোট আর্থিক ক্ষতি বলাও ঠিক হবে না। বিক্রয় থেকে আসা আয়, নকল পণ্যের মূল্য এবং অধিকারীদের সম্ভাব্য হারানো বিক্রয়—তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা হিসাব।

ব্রিটিশ সরকারের কপিরাইট নির্দেশিকা অনুযায়ী, মৌলিক সংগীত ও শব্দধারণ স্বত্বের সুরক্ষা পেতে পারে এবং সাধারণভাবে তার জন্য আলাদা নিবন্ধন প্রয়োজন হয় না। অনুমতি ছাড়া কোনও সুরক্ষিত কাজের কপি তৈরি বা বিতরণ করা হলে অধিকারী আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। ফলে শুধু অনলাইনে ফাইল ছড়িয়ে দেওয়া নয়, অনুমতি ছাড়া সেই সংগীত নতুন ভৌত রেকর্ডে তোলাও কপিরাইটের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

তবে পুরনো আসল রেকর্ড পুনর্বিক্রি করা আর অনুমতি ছাড়া নতুন কপি তৈরি করা এক বিষয় নয়। কোনও সংগ্রাহক নিজের কাছে থাকা বৈধ কপি বিক্রি করছেন কি না, আর কোনও উৎপাদক নতুন অননুমোদিত কপি বানাচ্ছেন কি না—আইনি তদন্তে এই পার্থক্যই গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলার অভিযোগ ও দোষসিদ্ধির কেন্দ্র ছিল দ্বিতীয় কাজটি। ভিনাইল সংগ্রহের শখ বা পুরনো রেকর্ডের বাজারকে তাই নকল উৎপাদনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার কারণ নেই।

বিশ্লেষণ: ভিনাইলের আকর্ষণ শুধু গানের মধ্যে নয়। মোড়ক, কভার, ছাপা তথ্য, সংস্করণ—সব মিলিয়ে একটি রেকর্ড যেন সংগীতের পাশাপাশি একটি বস্তুগত স্মৃতিও। নকল প্রস্তুতকারীর সুবিধা এখানেই। ডিজিটাল ফাইলের অদৃশ্য কপির বদলে তার তৈরি জিনিসটি তাকেই সাজিয়ে রাখা যায়, হাতে নেওয়া যায়, সংগ্রহের অংশ বলে মনে হয়। অথচ স্পর্শযোগ্য হলেই তা সত্যি হয়ে যায় না।

ভোক্তার ঝুঁকিটাও তাই শুধু টাকা খোয়ানোর নয়। তিনি যে অর্থ দিচ্ছেন, তা বৈধ সরবরাহপথে শিল্পী ও অধিকারীদের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না, সেটিও প্রশ্ন। পরিচিত শিল্পীর নাম, চকচকে মোড়ক বা নিখুঁত দেখতে একটি ডিস্ক—কোনওটিই একা সত্যতার প্রমাণ নয়। উৎপাদক, বিক্রেতা এবং সংস্করণের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

লন্ডনের এই মামলায় নকলের একটি বড় উৎপাদনব্যবস্থা আদালতের সামনে এসেছে। কিন্তু ভিনাইলের বাজারে আস্থা ফিরিয়ে রাখার কাজ কোনও এক অভিযানে শেষ হয় না। স্পষ্ট পণ্যতথ্য, নির্ভরযোগ্য বিক্রয়ব্যবস্থা এবং কার্যকর নজরদারিই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে—তাকের উপর রাখা সেই চকচকে রেকর্ডটি সত্যিই গান বহন করছে, নাকি শুধু তার মুখোশ।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles