সাদা শহর, কালো ধোঁয়া

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন: নিচে তাকালে কলম্বিয়ার ভিলা দে লেইভা এখনও যেন ছবির পোস্টকার্ড—সাদা দেওয়াল, লাল টালির ছাদ আর পাথরে বাঁধানো বিশাল চত্বর।
- কিন্তু ১৯ সেপ্টেম্বর পাহাড়ে আগুন লাগার পর সেই ঔপনিবেশিক শহরের মাথার উপর নেমে এসেছে কালো ধোঁয়ার চাদর।
- ২০ সেপ্টেম্বরের সরকারি হিসাবে আগুনে পুড়েছিল ২৭৩ হেক্টর এলাকা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন: নিচে তাকালে কলম্বিয়ার ভিলা দে লেইভা এখনও যেন ছবির পোস্টকার্ড—সাদা দেওয়াল, লাল টালির ছাদ আর পাথরে বাঁধানো বিশাল চত্বর। কিন্তু ১৯ সেপ্টেম্বর পাহাড়ে আগুন লাগার পর সেই ঔপনিবেশিক শহরের মাথার উপর নেমে এসেছে কালো ধোঁয়ার চাদর।
২০ সেপ্টেম্বরের সরকারি হিসাবে আগুনে পুড়েছিল ২৭৩ হেক্টর এলাকা। ২১ সেপ্টেম্বরের হালনাগাদে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৯০ হেক্টরে। প্রকাশের সময় আলাদা হওয়ায় সংখ্যার এই ফারাককে বিরোধ হিসেবে দেখার কারণ নেই।
আগুন ঠেকাতে নেমেছেন চার শতাধিক অগ্নিনির্বাপক, দুর্যোগকর্মী, সেনা, পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী। তাঁদের মধ্যে প্রায় একশো স্থানীয় বাসিন্দা সরঞ্জাম, জল, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। আকাশ থেকেও চলছে জলবোম্বিং—২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারটি আকাশযান প্রায় ১৭০ বার জল ফেলেছে, মোট আনুমানিক ২ লক্ষ ৪০ হাজার লিটার।
তবু পাহাড়ের আগুনকে বাগে আনা সহজ নয়। খাড়া ঢাল আর দমকা হাওয়ার কারণে স্থলপথে আগুনের প্রতিটি রেখার কাছে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না। তার উপর সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠেছে হাওয়ার আচরণ।
একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মনে হওয়ার পরই আচমকা বদলে যাচ্ছে বাতাসের দিক। শুকনো গাছপালার উপর দিয়ে আগুন ফের ছুটছে অন্যদিকে। ফলে মানচিত্রে ‘নিয়ন্ত্রিত’ বলে চিহ্নিত জায়গাও কিছুক্ষণের মধ্যে আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে। আগুনের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি তাই কর্মীদের জন্য নিরাপদ বেরোনোর পথ খোলা রাখাটাও সমান জরুরি।
পরিস্থিতির জেরে শহর কর্তৃপক্ষ জনদুর্যোগ ঘোষণা করেছে। দুটি হোটেল এবং কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সতর্কতামূলকভাবে খালি করা হয়েছে। এল দুরুএলো হোটেল পরে পরিচালনকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। সোমবার সশরীর স্কুল বন্ধ রাখা হয়। তিন হাজারের বেশি প্রতিযোগীর অংশ নেওয়ার কথা থাকা একটি অর্ধ-ম্যারাথনও বাতিল হয়েছে।
ধোঁয়া ও আগুনের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অন্তত কয়েক ডজন মানুষ—মূলত উদ্ধারকর্মী—চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে এখনও পর্যন্ত প্রাণহানির খবর নেই।
কিন্তু আগুনের গল্প শুধু শহর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। আগুনের কাছেই রয়েছে ইগুয়াকে উদ্ভিদ ও প্রাণী অভয়ারণ্য। আন্দীয় অরণ্য, জলাধার এবং স্থানীয় মুইসকা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ইগুয়াকে হ্রদের জন্যও অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ।
সংরক্ষিত এলাকার ঠিক কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। জরুরি পরিস্থিতিতে পোড়া জমির প্রাথমিক হিসাব পরে উপগ্রহচিত্র ও মাঠপর্যায়ের মাপজোকের সঙ্গে বদলাতে পারে। একই ভাবে, আগুনের পরিবেশগত ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতেও সময় লাগবে।
আগুনের সূত্রপাত কী ভাবে, সেটিও এখনও তদন্তাধীন। মানবসৃষ্ট হওয়ার সন্দেহের কথা জানানো হলেও ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগের প্রমাণ মেলেনি। একই সময়ে কলম্বিয়ার অন্য এলাকাতেও একাধিক বনাগ্নি সক্রিয়। শুকনো আবহাওয়া এবং এল নিনো আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেগুলি আগুনের প্রথম স্ফুলিঙ্গ কোথা থেকে এল, তার উত্তর দেয় না।
ঐতিহাসিক শহর বলে ভিলা দে লেইভার আগুন সহজেই শিরোনামে আসে। কিন্তু পাহাড়ের অরণ্য, জলধারা এবং গ্রামীণ জীবিকার ক্ষতিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পর্যটননির্ভর শহরে হোটেল খালি করা বা অনুষ্ঠান বাতিলের অর্থ তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতি। কিন্তু ধোঁয়া আর অনিশ্চিত বাতাসের মধ্যে পর্যটকদের ধরে রাখার ঝুঁকিও কম নয়।
স্বেচ্ছাসেবীদের ঢল এই সংকটে বড় শক্তি। কিন্তু আগুনের একেবারে সম্মুখভাগে প্রশিক্ষণহীন মানুষ পাঠানো নতুন বিপদ ডেকে আনতে পারে। স্থানীয় সাহায্য তাই খাবার, জল, পরিবহণ, যোগাযোগ ও আশ্রয়ের মতো কাজে সংগঠিত করাই নিরাপদ; আগুনের রেখায় সরাসরি লড়াই প্রশিক্ষিত দলের হাতেই থাকা উচিত।
আর আগুন নিভে গেলেই বিপদ শেষ হবে না। পোড়া পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে পরের বৃষ্টিতে ধস নামাতে পারে। ফাঁকা জমি দখল করতে পারে বহিরাগত আগাছা। পর্যটন দ্রুত খুলে দেওয়ার চাপও আসতে পারে।
ভিলা দে লেইভার সাদা দেওয়ালে ধোঁয়ার দাগ মুছে ফেলা হয়তো সম্ভব। কিন্তু পাহাড়ের হারানো মাটি, জল আর অরণ্যকে আগের জায়গায় ফিরতে সময় লাগে অনেক বেশি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



