Table of Contents
সালমান রুশদিকে মঞ্চে উঠে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় হাদি মাতারকে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালত। ২০২২ সালে নিউইয়র্কের শাটাকুয়া ইনস্টিটিউশনে প্রকাশ্য মঞ্চে ব্রিটিশ-ভারতীয় লেখকের ওপর হামলার ঘটনায় মাতারের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগেই দোষী রায় দিয়েছে বাফেলোর ফেডারেল আদালতের জুরি। অল্প সময়ের আলোচনার পরই আসে এই রায়।
২৮ বছর বয়সি মাতার এর আগেই নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আদালতে হত্যাচেষ্টা ও হামলার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। সেই মামলায় তাঁর ২৫ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এবার ফেডারেল মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর সাজা ঘোষণা হওয়ার কথা।
মঞ্চে উঠে আচমকা ছুরি
২০২২ সালের ১২ আগস্ট। নিউইয়র্কের শাটাকুয়া ইনস্টিটিউটে বক্তৃতা দেওয়ার ঠিক আগে মঞ্চে ওঠেন সালমান রুশদি। সেই মুহূর্তেই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন মাতার। প্রকাশ্য মঞ্চে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করা হয় লেখককে।
হামলায় রুশদি একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। ঘাড়, মুখ, যকৃত-সহ শরীরের একাধিক অংশে গুরুতর আঘাত লাগে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ফের লেখালেখিতে ফিরে আসেন তিনি। পরে সেই হামলার অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘Knife’ নামে একটি স্মৃতিকথাও প্রকাশ করেন।
ব্যক্তিগত ক্ষোভ, নাকি সন্ত্রাসী পরিকল্পনা?
ফেডারেল মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—মাতারের হামলা কি শুধুই ব্যক্তিগত আক্রোশ, নাকি এর পিছনে ছিল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের যোগ?
প্রসিকিউটরদের দাবি, এটি কোনও আকস্মিক হামলা ছিল না। আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ অনুযায়ী, মাতার লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে রুশদিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।
তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকা এবং সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়। জুরি শেষ পর্যন্ত প্রসিকিউশনের বক্তব্যই গ্রহণ করেছে।
খোমেনির ফতোয়ার প্রভাব?
মামলায় আরও উঠে এসেছে ১৯৮৯ সালে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির জারি করা ফতোয়ার প্রসঙ্গ। রুশদির ‘The Satanic Verses’ প্রকাশের পর ওই ফতোয়ায় লেখককে হত্যার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
প্রসিকিউশনের দাবি, হামলার আগে মাতার রুশদি এবং সেই ফতোয়া সম্পর্কে ব্যাপক অনুসন্ধান করেছিলেন। তদন্তকারীদের মতে, রুশদিকে ঘিরে কয়েক দশক ধরে চলা হুমকির ইতিহাসও এই মামলার প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতে রুশদির সাক্ষ্য
বিচার চলাকালীন নিজেই আদালতে সাক্ষ্য দেন সালমান রুশদি। হামলার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল কেউ হয়তো তাঁকে ঘুষি মেরেছে। পরে বুঝতে পারেন, তাঁকে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে।
রুশদির ভাষায়, সেই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়াই ছিল একটি “অলৌকিক ঘটনা”।
অন্যদিকে মাতারের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, তাঁর মক্কেলের সন্ত্রাসী উদ্দেশ্য ছিল—এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রসিকিউশন দেখাতে পারেনি। তবে জুরি সেই যুক্তি গ্রহণ করেনি। সব অভিযোগেই মাতারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
এই রায়ের ফলে রুশদির ওপর হামলা শুধু একটি নৃশংস অপরাধ হিসেবেই নয়, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অপরাধ হিসেবেও মার্কিন ফেডারেল আদালতের বিচারে প্রতিষ্ঠিত হলো।
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রাণনাশের হুমকি বয়ে বেড়ানো রুশদির ক্ষেত্রে এই রায় তাই শুধু একটি মামলার পরিণতি নয়—মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সহিংস হামলার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বার্তাও বটে।