অয়ন মুখোপাধ্যায়: বাঙালি সংস্কৃতির স্মৃতিশক্তি আসলে একটা সুবিধাবাদী সাকসেস স্টোরি। আমরা ফলটা গোগ্রাসে গিলি, কিন্তু যে বীজ থেকে গাছটা হয়, তাকে আমরা অবলীলায় মাটির নিচে চাপা দিয়ে দিই। বিজন ভট্টাচার্যকে নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতাও ঠিক এই রকম। তাঁর জন্মদিন বা মৃত্যুদিন এলে আমরা তাকে স্মরণ করি একটু লেখালেখি আর একটা চেনা ক্যাসেট বাজাতে শুরু করি। সেই ক্যাসেটের এ-পিঠে আছে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, আর ও-পিঠে আছে গণনাট্য সংঘ আর নবান্ন নাটক। ব্যস, আমাদের বিজন-চর্চা ওখানেই শেষ। যেন নবান্ন লেখার পর বিজন ভট্টাচার্য থিয়েটার করা ছেড়ে দিয়ে হিমালয়ে চলে গিয়েছিলেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য আর কতদিন চলবে! গবেষকদের ড্রয়িংরুম আর চেনা ক্যাটালগের বাইরে বিজন ভট্টাচার্য আসলে একজন অন্য মানুষ, যাঁর থিয়েটার এর ভেতর কেবল খিদের ভূগোল ছিল না, ছিল বুর্জোয়া সংস্কৃতির মুখে এক সপাটে থাপ্পড়। নবান্নের বাইরে অন্য লড়াই। আসলে আমরা বিজন ভট্টাচার্যকে একটা চেনা ফ্রেমে বন্দি করে আরাম পাই। কমিউনিস্ট ইশতেহার আর মন্বন্তরের কান্না দিয়ে একটা লিনিয়ার ন্যারেটিভ তৈরি করা খুব সহজ। কিন্তু জতুগৃহ, আগুন, মরাচাঁদ, গর্ভদাসী কিংবা দেবীগর্জন-এর বিজন ভট্টাচার্যকে বুঝতে গেলে যে রাজনৈতিক সততা আর থিয়েটারের বোধ দরকার, আজকের তাত্ত্বিকদের তা নেই। নবান্ন অবশ্যই বাংলা থিয়েটারের একটা ঐতিহাসিক বাঁক বদল। সাহেবদের ড্রয়িংরুম ড্রামা, রাজা-রানির তরবারি মার্কা রোমান্টিসিজম কিংবা মধ্যবিত্তের সস্তা প্যানপ্যানানি ভেঙে নবান্ন প্রথমবার মঞ্চের স্পটলাইটটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল গ্রামীণ সর্বহারাদের দিকে। কিন্তু সেটাই বিজন ভট্টাচার্যের শেষ কথা নয়। নবান্নের সাফল্যের পর বিজন ভট্টাচার্য যে দিকে হাঁটলেন, সেটাই ছিল তাঁর আসল অগ্নিপরীক্ষা। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার মঞ্চে দেখালেই বিপ্লব হবে না। থিয়েটারের নিজস্ব একটা নৃবিজ্ঞান আছে, একটা নিজস্ব আদিম ভাষা আছে, যা ইউরোপের আমদানি করা প্রোসেনিয়াম মঞ্চের ব্যাকরণ দিয়ে ধরা যাবে না।মাটির গন্ধ আর লোকায়ত রাজনীতিএই বোধ থেকেই বিজন ভট্টাচার্য বাংলা নাটকের আঙ্গিকটা কেই বদলে দিতে চাইলেন। তিনি কলকাতার বাবু সংস্কৃতির পরিশীলিত ভাষার গালে থাপ্পড় মেরে থিয়েটারে নিয়ে এলেন গ্রামীণ লোকায়ত সংস্কৃতিকে। জতুগৃহ বা আগুন নাটকের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি সংলাপে ব্যবহার করছেন পাঁচালী, গাজন, কীর্তন আর লোকসঙ্গীতের সুর। এটা কোনো সস্তা বিনোদন ছিল না, এটা ছিল কালচারাল পলিটিক্স। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে থিয়েটার গ্রামীণ মানুষের সঙ্গে কথা বলবে, তার ভাষা কলকাতার কফি হাউসের ভাষা হলে চলবে না। তার জন্য দরকার একটা আদিম, রূঢ় এবং মাটির কাছাকাছি থাকা ভাষা। অথচ আজ যখন আমরা প্রগতিশীল থিয়েটার করি, তখন আমাদের ভাষা কতখানি নাগরিক, কতখানি সাহেবদের অনুকরণে তৈরি, তা ভাবলে লজ্জা হয়। বিজন ভট্টাচার্য সেই সত্তরের দশক আসার আগেই এই ঔপনিবেশিক হ্যাংওভার থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন।দেবীগর্জন ও মিথের প্রতিরোধগবেষকদের একটা বড় অংশ দেবীগর্জন নাটকটিকে বিজন ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক বিবর্তনের সবচেয়ে বড় দলিল বলে মনে করেন। এখানে তিনি শুধু খিদের কথা বলছেন না, বলছেন প্রতিরোধের কথা। শোষণের বিরুদ্ধে আদিবাসী জীবনের যে আদিম প্রতিরোধ, তাকে তিনি মঞ্চে নিয়ে এলেন। আর সেটা দেখাতে গিয়েই ব্যবহার করলেন লৌকিক দেব দেবী কিংবা গ্রামীণ মিথকে। ধর্মের আফিমকে কীভাবে শোষিতের লড়াইয়ের হাতিয়ার করে তোলা যায়, দেবীগর্জন তার এক অসামান্য উদাহরণ। একইভাবে মরাচাঁদ নাটকে তাঁর লড়াইটা ছিল অন্য স্তরের। মন্বন্তরের পর যখন গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন লোকশিল্পীরা কীভাবে নিজেদের শিল্প আর নৈতিকতা টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছে, সেই যন্ত্রণার কথা বলে মরাচাঁদ। এটা থিয়েটারের ভেতরে দাঁড়িয়ে থিয়েটারকে দেখার এক আত্মবিশ্লেষণ। কিন্তু আমাদের থিয়েটার পত্রিকাগুলো এই নাটকগুলো নিয়ে কটা বিশেষ সংখ্যা করেছে আমার জানা নেই। বরং আমরা বেশি সময় কাটাই নবান্নর সেট কেমন ছিল, উনি কতটা বামপন্থী ছিলেন আর কতটা সিপিএম ছিলেন এই সব নিয়েই । গণনাট্যের মক্কা থেকে ক্যালকাটা থিয়েটারবিজন ভট্টাচার্যের জীবনীর সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে আড়াল করে রাখা অধ্যায়টা হলো।ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কচ্ছেদ। আইপিটিএ বা গণনাট্য সংঘকে বাঙালি প্রগতিশীলতার মক্কা-মদিনা মনে করা হয়। কিন্তু বিজন ভট্টাচার্য খুব দ্রুত বুঝেছিলেন যে, দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ ক্যাডারতন্ত্র আর শিল্পের স্বাধীনতা একসঙ্গে চলতে পারে না। যখন পার্টি থিয়েটারকে স্রেফ একটা প্রচারপত্র বা লিফলেট বানাতে চাইল, তখন বিজন ভট্টাচার্য সেই মক্কা থেকে বেরিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছিলেন। তিনি দলদাস হতে চাননি। তিনি সময় তৈরি করেছিলেন ক্যালকাটা থিয়েটার। এই ভাঙাগড়ার ইতিহাস আমাদের প্রমাণ করে , বিজন ভট্টাচার্য কোনোদিনই ড্রয়িংরুম কমিউনিস্ট ছিলেন না। তিনি থিয়েটারকে মানুষের মুক্তির একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বিশ্বাস করতেন, কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি হিসেবে নয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন থিয়েটারের লোকজন সরকারি অনুদান আর পুরস্কারের লোভে মেরুদণ্ড বিক্রি করে দিচ্ছেন, তখন বিজন ভট্টাচার্যের এই আপসহীন একাকীত্ব এক বিরাট অনুপ্রেরণা।অভিনয়ের নৃবিজ্ঞান ও ঋত্বিক-প্রসঙ্গশুধু নাট্যকার বা তাত্ত্বিক হিসেবে বিজন ভট্টাচার্যকে দেখলে তাঁর অভিনেতা সত্তা।কে অপমান করা হয়। ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে সেই খ্যাপাটে, পরাজিত কিন্তু অহংকারী বাবার চরিত্রটি মনে আছে। কিংবা সুবর্ণরেখা ছবির সেই দৃশ্যগুলো। বিজন ভট্টাচার্য যখন পর্দায় বা মঞ্চে দাঁড়াতেন, তখন তিনি কোনো চেনা মেথড অ্যাক্টিং করতেন না। । তাঁর শরীরী ভাষা, তাঁর কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, তাঁর চোখের চাউনি—সবকিছুর মধ্যে একটা গোটা যুগের ভাঙন স্পষ্ট হয়ে উঠত। তিনি যখন সংলাপ বলতেন, তখন মনে হতো মাটি ফুঁড়ে কোনো আদিম সত্য বেরিয়ে আসছে। এই অভিনয়ের কোনো স্কুল হয় না, এই অভিনয় কোনো অ্যাকাডেমিতে শেখানো যায় না। এটা আসে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইটাকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে। উন্নয়ন এর জনশ্রুতি ও সমকালীন রাজনীতিআজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল সমাজে আমরা সবকিছু কেই খুব তাড়াতাড়ি সেলিব্রেট করি এবং তার চেয়েও তাড়াতাড়ি ভুলে যাই। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজন ভট্টাচার্যের ছবি দিয়ে দুটো বিপ্লবী কোটেশন লিখে লাইক গুনি। কিন্তু বিজন ভট্টাচার্য যে প্রশ্নগুলো আমাদের সভ্যতার সামনে ছুড়ে দিয়ে গেছেন, তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি কি। দেশ স্বাধীন হওয়ার এতগুলো বছর পরেও কি মানুষের খিদেকে নিয়ে রাজনীতি কি এখনো শেষ হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের যে লাইন আমরা লকডাউন বা সাম্প্রতিক সংকটের সময় হাইওয়েতে দেখেছি, তা কি ১৯৪৩-এর সেই কঙ্কালসার মানুষদের শহরের দিকে হেঁটে আসার চেয়ে খুব আলাদা ছিল। কৃষকের ফসলের অনিশ্চয়তা কি মিটেছে। কর্পোরেট শোষণে জমি থেকে মানুষের উচ্ছেদ কি বন্ধ হয়েছে। যদি এই সবকটি প্রশ্নের উত্তর না হয়, তবে বুঝতে হবে বিজন ভট্টাচার্য আজও প্রাসঙ্গিক, এবং একই সঙ্গে আমাদের চারপাশের এই তথাকথিত উন্নয়ন একটা বিরাট জনশ্রুতিশিকড়হীন দেউলিয়াপনাবিজন ভট্টাচার্যকে ভুলে যাওয়া মানে কেবল একজন নাট্যকার কে ভুলে যাওয়া নয়, নিজের শিকড়টাকে কেটে ফেলা। আমাদের নতুন প্রজন্ম প্রতিবাদের নাটক করতে ভালোবাসে, তারা থিয়েটারে সিস্টেমকে গালি দিতে পছন্দ করে। কিন্তু তারা জানে না যে, এই ধারার আসল স্থপতি কে ছিলেন। তারা ইউরোপের ব্রেখট মুখস্থ করে, কিন্তু ঘরের পাশের বিজন ভট্টাচার্যকে চেনে না। এটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনার এক চরম নিদর্শন। তাই বিজন ভট্টাচার্য কে কোনো সিলেবাসের ভেতর বা কোন স্ট্রাকচারের মধ্যে বন্দি করে রাখলে ভুল হবে। তিনি বেঁচে আছেন সমকালের সংলাপে, খবরের কাগজের ছোট ছোট মফস্বলের পাতায়, যেখানে এখনও সস্তা বিনোদনের বাইরে গিয়ে কেউ কেউ সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সাহস দেখায়। সমাজকে প্রশ্ন করে।শিল্পের কাজ অস্বস্তি তৈরি করা।বিজন ভট্টাচার্যের জন্মদিনে বা মৃত্যুদিনে তাঁর মূর্তিতে ফুল মালা চড়ানো আসলে এক ধরণের অপরাধ। কারণ তিনি মেকি আনুষ্ঠানিকতা পছন্দ করতেন না। তাঁকে স্মরণ করার একমাত্র রাস্তা হলো তাঁর থিয়েটারের সেই আপসহীন জেদটাকে নিজেদের কাজের মধ্যে ফিরিয়ে আনা। শিল্পের কাজ যে শুধু ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে হাততালি কুড়ানো নয়, বরং দর্শককে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেওয়া, তাকে বাড়ি ফেরার পথে একটা কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো—এই দর্শনটা বিজন ভট্টাচার্য আমাদের শিখিয়েছিলেন। সময় হয়তো আমাদের অনেক নাম কে মুছে দেয়, অনেক বড় বড় খ্যাতি ধুলোয় মিশে যায়। কিন্তু কিছু মৌলিক প্রশ্ন চিরকাল থাকে। বরং যে শিল্পী মানুষের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দিতে পারেন, তাঁর কোনোদিন মৃত্যু হয় না। এইখানে দাঁড়িয়েই বিজন ভট্টাচার্যের স্থানাঙ্ক নির্ণয় হয়ে যায়।নদীর মতো এক চিরকালীন দৃষ্টিভঙ্গিবিজন ভট্টাচার্য আসলে কোনো ব্যক্তির নাম নয়, তিনি একটা দৃষ্টিভঙ্গির নাম। তিনি সেই চোখ, যিনি কোনদিন প্রতিষ্ঠানের চোখ রাঙালি কে ভয় পাননি । যার লেখার মধ্যে দিয়ে তিনি।মানুষের হাহাকার কষ্ট যন্ত্রণা স্পষ্ট তুলে ধরেছেন। আজ যখন আমরা বর্তমানকে বুঝতে গিয়ে অতীতের শিকড়গুলো কেই উপড়ে ফেলছি, তখন বিজন ভট্টাচার্যের দিকে ফিরে তাকানো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। তিনি আমাদের ভেতরেই রয়ে গেছেন। দৃশ্যমান হয়ে নন, অথচ সর্বত্র উপস্থিত। কারণ ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মানুষ তাঁরা নন, যাঁদের আমরা সবচেয়ে বেশি স্মরণ করি, বরং তাঁরাই, যাঁদের ভাবনা আমাদের অজান্তেই বেঁচে থাকে আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের ভেতর। বিজন ভট্টাচার্যকে নবান্নর খাঁচা থেকে মুক্ত করে তাঁর সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে চেনার সময় এবার এসেছে, নইলে ইতিহাস আমাদের এই অন্ধত্বকে ক্ষমা করবে না।
নবান্নের খাঁচায় বন্দী বিজন: বাঙালি আর কতকাল বীজ ভুলে ফল গিলবে?
9