হাইলাইটস

  • গুজরাট টাইটান্সকে ৫ উইকেটে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় আইপিএল শিরোপা জিতল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
  • ৭৫ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন বিরাট কোহলি।
  • আইপিএল কেরিয়ারের দ্রুততম অর্ধশতরান করলেন কোহলি—মাত্র ২৫ বলে।
  • টানা দুইবার আইপিএল জেতা তৃতীয় দল হলো আরসিবি।
  • অধিনায়ক হিসেবে এমএস ধোনি ও রোহিত শর্মার পর টানা দুইবার শিরোপা জেতার কীর্তি গড়লেন রজত পাটিদার।

কোহলির ব্যাটে স্বপ্নপূরণ, টানা দ্বিতীয়বার আইপিএল জিতল আরসিবি

আইপিএল ২০২৬-এর সমাপ্তি ঘটল কিছুটা নিষ্প্রভ অথচ ঐতিহাসিক এক ফাইনালের মধ্য দিয়ে। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে রবিবার রাতে গুজরাট টাইটান্সকে অনায়াসে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হলো রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।

পুরো মরসুম জুড়েই ব্যাটসম্যানদের দাপট দেখা গিয়েছিল। চারশোর কাছাকাছি স্কোরও হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এসে গুজরাট টাইটান্সের ব্যাটিং যেন হঠাৎ করেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে। নির্ধারিত ২০ ওভারে তারা তুলতে পারে মাত্র ১৫৫/৮।

এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে আরসিবির কখনও মনে হয়নি তারা ফাইনাল খেলছে। শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় বেঙ্গালুরু। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন বিরাট কোহলি।

কোহলির ব্যাটে চ্যাম্পিয়নের ছাপ

বড় মঞ্চে বড় খেলোয়াড়েরা নিজেদের আলাদা করে চেনান। ফাইনালের রাতে বিরাট কোহলি সেটাই করলেন।

ভেঙ্কটেশ আইয়ারের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে ৬৩ রান যোগ করে তিনি আরসিবির রানতাড়ার ভিত গড়ে দেন। এরপর মাঝখানে দ্রুত তিনটি উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়েছিল দল। একসময় স্কোর দাঁড়ায় ৯১/৪।

কিন্তু বাস্তবে গুজরাটের স্কোর এতটাই কম ছিল যে সেই চাপ কখনও প্রকৃত বিপদে পরিণত হয়নি।

কোহলি ধৈর্য ও আগ্রাসনের নিখুঁত মিশ্রণে ব্যাটিং করেন। মাত্র ২৫ বলে তুলে নেন অর্ধশতরান যা তাঁর আইপিএল কেরিয়ারের দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরি। ফাইনালের মতো মঞ্চে এমন কীর্তি নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

শেষ পর্যন্ত ৭৫ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি।

টিম ডেভিডের সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে ৪১ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে কোহলি গুজরাটের শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দেন। ডেভিড করেন ১৭ বলে ২৪ রান।

ম্যাচের সমাপ্তিও আসে কোহলির ব্যাট থেকেই। আর্শাদ খানের বলে বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন আরসিবির জয়। তখনও হাতে ছিল ১২ বল এবং পাঁচ উইকেট।

টানা দুই শিরোপার বিরল কীর্তি

এই জয়ের ফলে আইপিএল ইতিহাসে বিরল এক কৃতিত্বের মালিক হলো আরসিবি।

এর আগে কেবল দুটি দল টানা দুই বছর আইপিএল জিততে পেরেছিল—চেন্নাই সুপার কিংস (২০১০ ও ২০১১) এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ানস (২০১৯ ও ২০২০)।

এবার সেই তালিকায় নাম লেখাল বেঙ্গালুরু।

একইসঙ্গে অধিনায়ক হিসেবে রজত পাটিদারও ইতিহাস গড়লেন। এমএস ধোনি এবং রোহিত শর্মার পর তিনিই তৃতীয় অধিনায়ক, যিনি টানা দুইবার আইপিএল ট্রফি জিতলেন।

গুজরাটের পতনের নেপথ্যে আরসিবির শর্ট-বল কৌশল

টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় আরসিবি। শুরু থেকেই তাদের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট—গুজরাটের ব্যাটসম্যানদের শর্ট-পিচ বোলিং দিয়ে অস্বস্তিতে ফেলা।

সেই পরিকল্পনা দারুণভাবে সফল হয়।

অধিনায়ক শুভমন গিল প্রথম শিকার। জশ হ্যাজলউডের সামান্য ছোট লেন্থের বল সোজা ব্যাটে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু বল উঁচু হয়ে ওঠে এবং সহজ ক্যাচ তুলে দেন। তাঁর ইনিংস থামে মাত্র ১০ রানে।

এরপর আউট হন সাই সুদর্শন। ভুবনেশ্বর কুমারের শর্ট বল তাঁর গায়ে উঠে আসে। দ্বিধাগ্রস্ত শটে টপ-এজ হয়ে ক্যাচ চলে যায় উইকেটকিপারের হাতে। তিনি করেন ১২ রান।

অপ্রত্যাশিত চমকও কাজে এল না

জস বাটলারের আগে নিশান্ত সিন্ধুকে নামানো ছিল গুজরাটের বড় চমক।

কিছু আকর্ষণীয় শট খেললেও শেষ পর্যন্ত তিনিও শর্ট বলের ফাঁদে পা দেন। রসিখ সালামের বলে ডিপ মিডউইকেটের বাউন্ডারি পার করতে গিয়ে ধরা পড়েন। ১৮ বলে করেন ২০ রান।

এরপর গুজরাটের সবচেয়ে বড় আশা ছিলেন জস বাটলার।

কিন্তু অভিজ্ঞ ক্রুণাল পাণ্ডিয়ার কৌশলের কাছে হার মানেন ইংল্যান্ডের তারকা। ক্রুণাল বুঝেছিলেন বাটলার এগিয়ে এসে বড় শট খেলতে চাইবেন। সেই অনুমানকে সত্যি প্রমাণ করে তিনি বল করেন অনেকটা বাইরে। বাটলার এগিয়ে এলেও বলের সংযোগ ঘটাতে পারেননি। উইকেটের পেছনে কাজ সেরে দেন জিতেশ শর্মা।

২৩ বলে মাত্র ১৯ রান করে ফিরতে হয় তাঁকে।

ওয়াশিংটনের লড়াই, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়

গুজরাটের ইনিংসে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গতি ছিল না।

একপ্রান্তে উইকেট পড়েছে নিয়মিত। রান তোলার গতি কখনও বাড়েনি। এমন অবস্থায় কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ওয়াশিংটন সুন্দর।

তিনি ৩৭ বলে অপরাজিত ৫০ রান করেন। তাঁর দায়িত্বশীল ইনিংস না থাকলে গুজরাটের স্কোর ১৫০-ও ছুঁতে পারত না।

কিন্তু ১৫৫ রান ফাইনালের মঞ্চে আরসিবির শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনের বিরুদ্ধে কখনওই নিরাপদ ছিল না।

বল হাতে আরসিবির সেরা পারফরমার ছিলেন রসিখ সালাম। তিনি নেন তিনটি উইকেট। ভুবনেশ্বর কুমার ও জশ হ্যাজলউড পান দুটি করে উইকেট।

শেষ কথা

আইপিএল ২০২৬ ফাইনাল হয়তো রুদ্ধশ্বাস ছিল না, কিন্তু তা ইতিহাসসমৃদ্ধ ছিল। বিরাট কোহলির ব্যাটে দেখা গেল অভিজ্ঞতার দীপ্তি, আরসিবির বোলিংয়ে দেখা গেল নিখুঁত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, আর রজত পাটিদারের নেতৃত্বে গড়ে উঠল এক নতুন রাজবংশের সম্ভাবনা।

একসময় যে দলকে নিয়ে কৌতুক করা হতো, আজ সেই রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু টানা দুইবারের আইপিএল চ্যাম্পিয়ন। আর সেই জয়ের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন এক পরিচিত নাম বিরাট কোহলি। তাঁর ব্যাট যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, বড় মঞ্চে কিংবদন্তিরা কখনও হারিয়ে যান না।