Home দৃষ্টিভঙ্গি হাজারবার শুনলেই সত্যি? ইতিহাস বানানোর গোপন কৌশল

হাজারবার শুনলেই সত্যি? ইতিহাস বানানোর গোপন কৌশল

অয়ন মুখোপাধ্যায়

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
669 views 13 minutes read
A+A-
Reset

অয়ন মুখোপাধ্যায়: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে এই মুহূর্তে বিশাল হইচই চলছে। কিন্তু এই বিষয়ের ভেতরে ঢোকার আগে একটা কথা পরিষ্কার করে বলে নেওয়া দরকার। এই লেখা শ্যামাপ্রসাদ ভালো না মন্দ, তাঁর অবদান বড় না ছোট, তিনি নায়ক না খলনায়ক, সেই পুরোনো এবং বহুচর্চিত তর্কে যেতে চায় না। কারণ রাজনৈতিক বিভাজন যেখানে আগেই প্রতিষ্ঠিত, সেখানে তথ্যের নতুন তালিকা দিয়ে মানুষের পুরোনো বিশ্বাস বদলানো অত্যন্ত কঠিন। পক্ষ নিজের নায়ককে রক্ষা করে, প্রতিপক্ষ নিজের খলনায়ককে। মাঝখানে ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকে কিছুটা অসহায় অবস্থায়।

তাই আমি বরং অন্য একটি প্রশ্ন তুলতে চাই।

একটি রাজনৈতিক গল্প কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “সত্য” হয়ে ওঠে, তার প্রতিপক্ষ যতই তথ্যপ্রমাণ নিয়ে আপত্তি তুলুক না কেন? আরও নির্দিষ্ট করে বললে, একটি বহুকারণসম্পন্ন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া কীভাবে ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তির একক কৃতিত্বের কাহিনিতে পরিণত হয়? কীভাবে একটি রাজনৈতিক দাবি প্রথমে স্লোগান, তারপর জনবিশ্বাস, তারপর প্রাতিষ্ঠানিক ভাষ্য এবং শেষে প্রায় প্রশ্নাতীত “সাধারণ জ্ঞান” হয়ে ওঠে?

এখানে শুরুতেই একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। মিথ্যা সত্যে পরিণত হয় না। কিন্তু পুনরাবৃত্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক পরিচয় এবং সামাজিক স্মৃতির জোরে কোনো অতিসরলীকৃত, একপেশে বা আংশিক ভাষ্য সমাজে সত্যের মর্যাদা পেতে পারে। এই পার্থক্যটাই আমার আলোচনার কেন্দ্রে।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১৯৪৭ সালের বঙ্গভাগের রাজনীতিতে বাস্তব ভূমিকা ছিল। তিনি যুক্তবঙ্গ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রেখে পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে সক্রিয় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। সেই ভূমিকা অস্বীকার করে কোনো সৎ ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসে: পশ্চিমবঙ্গের জন্ম কি একজন মানুষের একক কীর্তি? নাকি দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি, প্রাদেশিক ক্ষমতার সমীকরণ, যুক্তবঙ্গ প্রস্তাব, উদ্বাস্তু-আশঙ্কা, জনমত এবং বহু নেতার পরস্পর বিরোধী ভূমিকার মধ্যে দিয়ে তৈরি একটি জটিল ঐতিহাসিক ফলাফল?

এই দ্বিতীয় প্রশ্নটা কে কেন্দ্র করেই আসল আলোচনা শুরু করা যাক।

প্রথম কথা: ইতিহাসের কাঁচামাল

আমরা সাধারণত ধরে নিই ইতিহাস একটি স্থির এবং সমাপ্ত জিনিস। যা ঘটে গেছে, সেটাই ইতিহাস। কিন্তু বাস্তবে অতীতের ঘটনা এবং সেই ঘটনাকে নিয়ে সমাজের স্মৃতি এক জিনিস নয়। ঘটনা ঘটে একবার; তার ব্যাখ্যা তৈরি হয় বারবার। অতীত আমাদের সামনে নিজে থেকে এসে কথা বলে না। তাকে নির্বাচন করা হয়, সাজানো হয়, গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিছু অংশ সামনে আনা হয়, কিছু অংশ পেছনে সরিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ ইতিহাসের ঘটনা কাঁচামাল, আর সেই কাঁচামাল থেকে জনস্মৃতি নির্মাণের কাজটি গভীরভাবে রাজনৈতিক।

এই প্রসঙ্গে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের বহু আচার, অনুষ্ঠান এবং প্রতীককে আমরা অনায়াসে সুপ্রাচীন বলে ধরে নিই। অথচ ইতিহাসবিদেরা দেখিয়েছেন, এদের অনেকগুলিই তুলনামূলকভাবে আধুনিক সময়ে নতুনভাবে বিন্যস্ত, পুনর্গঠিত বা জনপ্রিয় করা হয়েছে। পুরোনো উপাদান থাকতে পারে, কিন্তু তার বর্তমান রূপটি অনেক সময় আধুনিক রাজনৈতিক প্রয়োজনের ফল। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম এবং টেরেন্স রেঞ্জারের সম্পাদিত The Invention of Tradition এই বিষয়টিকেই বিখ্যাত করে তুলেছিল: বহু “প্রাচীন” ঐতিহ্য আসলে আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের নির্মাণ, অথবা অন্তত আধুনিক সময়ে পুনর্গঠিত।

এখানে “উদ্ভাবিত” মানেই সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। বরং পুরোনো উপাদানকে নতুন রাজনৈতিক প্রয়োজনে সাজানো।

শ্যামাপ্রসাদকে “পশ্চিমবঙ্গের জনক” হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকেও এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে। তাঁর বাস্তব ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল, কিন্তু সেই ভূমিকাকে একটি বহুমাত্রিক ইতিহাসের মধ্যে বিচার করা আর তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের একক বা প্রায়-একক প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয়টি ইতিহাসের নিছক পুনরুদ্ধার নয়; এটি ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট নির্বাচন।

রাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য প্রায়ই একজন প্রতীকী পূর্বপুরুষ দরকার হয়। একটি দল বর্তমানের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ দখল করতে চাইলে তাকে অতীতেও নিজের বংশপরিচয় খুঁজতে হয়। তখন ইতিহাসের জাদুঘর থেকে এমন একজন চরিত্রকে সামনে আনা হয়, যাঁর জীবন, পরিচয় এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বর্তমানের প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই। বাস্তব মানুষটি তখন ধীরে ধীরে প্রতীকে পরিণত হন। তাঁর দ্বন্দ্ব, সীমাবদ্ধতা, সময়ের জটিলতা ক্রমশ ঝাপসা হয়; সামনে থাকে একটি সহজ বাক্য।

আর রাজনীতি সহজ বাক্য ভালোবাসে। ইতিহাসের দুর্ভাগ্য, সে সাধারণত সহজ নয়।

দ্বিতীয় কথা: জাতি গড়তে গেলে মনে রাখার পাশাপাশি ভুলতেও হয়

১৮৮২ সালে ফরাসি চিন্তাবিদ আর্নেস্ট রেনান তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা What Is a Nation?-এ একটি অস্বস্তিকর কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, জাতি নির্মাণের ক্ষেত্রে বিস্মৃতি, এমনকি ঐতিহাসিক ভুলও, গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। কথাটি শুনতে অস্বস্তিকর, কিন্তু আধুনিক জাতীয়তাবাদের ইতিহাস দেখলে এর তাৎপর্য বোঝা যায়।

কোনো জাতি, সম্প্রদায় বা রাজনৈতিক আন্দোলন নিজের একতা তৈরি করার সময় অতীতের সবকিছু সমানভাবে মনে রাখে না। কিছু ঘটনা স্মরণীয় হয়, কিছু ঘটনা প্রান্তে চলে যায়। কিছু মৃত্যু শহিদের মৃত্যু হয়, অন্য মৃত্যু পরিসংখ্যান হয়ে থাকে। কিছু নেতা জাতীয় প্রতীকে পরিণত হন, অন্যরা পাঠ্যবইয়ের ফুটনোটেও জায়গা পান না। কিছু সংঘর্ষকে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধ, কিছু সংঘর্ষকে বলা হয় বিশৃঙ্খলা। শব্দের এই নির্বাচন নিরীহ নয়।

অর্থাৎ “ভুলে যাওয়া” সবসময় নিছক অজ্ঞতা নয়। অনেক সময় সেটি কৌশলগত নির্বাচন।

এই জায়গা থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্মের স্মৃতি দেখলে প্রশ্ন উঠবেই। যদি একটি জটিল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে একজন ব্যক্তির কৃতিত্বে সংকুচিত করা হয়, তাহলে কাদের ভূমিকা স্মৃতি থেকে সরে যাচ্ছে? কোন রাজনৈতিক দরকষাকষি অদৃশ্য হচ্ছে? কোন সামাজিক ভয়, কোন সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা, কোন ঔপনিবেশিক সিদ্ধান্ত, কোন বিকল্প প্রস্তাব আর আলোচনায় থাকছে না?

একজন নায়ককে বড় করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি সবসময় তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলা নয়। অনেক সময় আরও কার্যকর পদ্ধতি হলো অন্য সবাইকে ধীরে ধীরে ভুলিয়ে দেওয়া।

 

তৃতীয় কথা: মস্তিষ্ক সত্যতার চেয়ে পরিচিতিকে কখনও কখনও বেশি গুরুত্ব দেয়

এবার ইতিহাসের বই থেকে একটু মানুষের মস্তিষ্কের দিকে তাকানো যাক।

মনোবিজ্ঞানে একটি সুপরিচিত ধারণা আছে: illusory truth effect। সহজ ভাষায়, একই বক্তব্য বারবার শুনলে তার পরিচিতি বাড়ে, সেটিকে মানসিকভাবে প্রক্রিয়াকরণ সহজ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষ সেই বক্তব্যকে তুলনামূলকভাবে বেশি বিশ্বাসযোগ্য বা সত্য বলে বিচার করতে শুরু করে।

এখানে বিষয়টি যান্ত্রিক নয়। এমন নয় যে মানুষ যা হাজারবার শুনবে, অবধারিত ভাবে সেটাই বিশ্বাস করবে। মানুষের বিচারবুদ্ধি এতটা সরলও নয়। কিন্তু পুনরাবৃত্তি একটি বক্তব্যকে পরিচিত করে তোলে, আর পরিচিতি অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্যতার অনুভূতি তৈরি করে। বিশেষত যখন অধিকাংশ মানুষের হাতে নিজে বসে ঐতিহাসিক দলিল যাচাই করার সময়, আগ্রহ বা সুযোগ নেই।

একটি নাম বারবার সংবাদে আসছে। পোস্টারে আসছে। বক্তৃতায় আসছে। জন্মদিন পালিত হচ্ছে। মৃত্যুদিন পালিত হচ্ছে। রাস্তার মোড়ে ছবি উঠছে। সামাজিক মাধ্যমে একই দাবি ঘুরছে। নেতা বলছেন। কর্মী বলছেন। টেলিভিশনের আলোচনায় বলা হচ্ছে। ধীরে ধীরে একটি বাক্য আর নতুন মনে হয় না।

তারপর একদিন কেউ প্রশ্ন তুললে সাধারণ প্রতিক্রিয়া হয়: “কিন্তু এ তো সবাই জানে।”

এই “সবাই জানে” কথাটাই রাজনৈতিক স্মৃতি নির্মাণের এক আশ্চর্য মুহূর্ত। কারণ তখন আর প্রমাণ হাজির করার দায় দাবি-উত্থাপনকারীর থাকে না; উল্টে প্রশ্নকারীকেই প্রমাণ করতে হয় যে প্রচলিত বিশ্বাসটি অসম্পূর্ণ।

রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের ধারণার বড় অংশ সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আসে না। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ, পারিবারিক স্মৃতি, দলীয় ভাষ্য, স্কুলশিক্ষা, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং পুনরাবৃত্ত প্রতীকের মাধ্যমে তা গড়ে ওঠে। ফলে যে নামটি বারবার দৃশ্যমান হয়, সেটি আমাদের মাথায় “গুরুত্বপূর্ণ” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রকৃতি আমরা নিজেরা যাচাই না করেও।

এখানেই পুনরাবৃত্তির ক্ষমতা।

 

চতুর্থ কথা: নিজের পরিচয় রক্ষা করতে গিয়েও মানুষ অস্বস্তিকর সত্য এড়িয়ে চলে

মানুষ তথ্য গ্রহণ করে শুধু তথ্য হিসেবে নয়। সে তথ্য গ্রহণ করে নিজের পরিচয়ের ভিতর দিয়ে।

যিনি ইতিমধ্যে একটি রাজনৈতিক শিবিরে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর কাছে সেই শিবিরের কেন্দ্রীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা নিছক একটি তথ্য সংশোধন নয়। অনেক সময় সেটি নিজের রাজনৈতিক পরিচয়, নিজের সামাজিক গোষ্ঠী, নিজের দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্ত এবং কখনও নিজের আত্মসম্মানকে প্রশ্ন করার মতো অনুভূত হয়।

এই প্রক্রিয়াকে বোঝাতে মনোবিজ্ঞানে motivated reasoning বা পরিচয়-রক্ষাকারী যুক্তিবোধের মতো ধারণা ব্যবহৃত হয়। মানুষ সবসময় নিরপেক্ষ বিচারকের মতো তথ্যের সামনে বসে না। অনেক সময় সে অজান্তেই নিজের পূর্ববিশ্বাসের পক্ষে প্রমাণকে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং বিরোধী প্রমাণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর হয়ে ওঠে।

ফলে একই দলিল দুই ব্যক্তি দুইভাবে পড়তে পারেন।

একজন বলবেন, “দেখুন, প্রমাণ হয়ে গেল।”

অন্যজন বলবেন, “এটা বিরোধীদের প্রোপাগান্ডা।”

এখানে আরও একটি স্তর আছে। কোনো মতাদর্শ যখন দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ভাষা, সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন কথাবার্তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটিকে আর “একটি মতাদর্শ” বলে মনে হয় না। সেটি “স্বাভাবিক”, “সাধারণ”, “সবাই জানে” ধরনের বোধে পরিণত হয়। আন্তোনিও গ্রামশির চিন্তায় এই “common sense” বা সাধারণ বোধের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর।

অর্থাৎ ক্ষমতার সবচেয়ে সফল মুহূর্ত সবসময় তখন নয়, যখন সে মানুষকে জোর করে কিছু বিশ্বাস করায়। বরং তখন, যখন মানুষ ভুলে যায় যে তার বিশ্বাসটিও একটি ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত বিশ্বাস।

তখন প্রতিপক্ষ যতই তথ্য প্রমাণ নিয়ে আপত্তি তুলুক, একটি বাক্য যথেষ্ট:

“ওসব প্রোপাগান্ডা।”

ব্যস। তর্ক শেষ।

পঞ্চম কথা: রাষ্ট্রের সিলমোহর সত্যতার বিকল্প নয়, কিন্তু শক্তিশালী বৈধতা

এবার আসল খেলোয়াড়ের কথায় আসা যাক: প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা।

রাষ্ট্র কোনো দাবিকে সত্য করে তুলতে পারে না। পাঠ্যবইয়ে লেখা হলেই মিথ্যা সত্য হয় না। রাস্তার নাম বদলালেই ইতিহাস বদলে যায় না। সরকারি স্মারক দিবস ঘোষণা করলেই গবেষণার বিতর্ক শেষ হয়ে যায় না।

কিন্তু রাষ্ট্র অন্য কিছু করতে পারে, এবং সেটি অত্যন্ত শক্তিশালী।

রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট ভাষ্যকে দৃশ্যমানতা দিতে পারে। পুনরাবৃত্তি করতে পারে। মর্যাদা দিতে পারে। প্রতিষ্ঠান দিতে পারে। পাঠ্যক্রমে জায়গা দিতে পারে। স্মারক নির্মাণ করতে পারে। সরকারি অনুষ্ঠানে একটি নামকে বারবার উচ্চারণ করতে পারে। একটি রাজনৈতিক দাবিকে দলীয় মঞ্চ থেকে তুলে প্রশাসনিক ভাষায় পরিণত করতে পারে।

তখন সেই দাবি আর শুধু একটি দলের বক্তব্য থাকে না। তার গায়ে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার আবরণ তৈরি হয়।

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য জরুরি। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের প্রতিটি কথাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে না। আধুনিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের হাতে এমন পরিকাঠামো থাকে, যার সাহায্যে একটি ভাষ্যকে অন্য ভাষ্যের তুলনায় বহু গুণ বেশি দৃশ্যমান করা যায়। পাঠ্যবই, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি অনুষ্ঠান, আর্কাইভ, স্মারক, নামকরণ, সম্প্রচার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার, দিবস পালন, প্রশাসনিক ভাষা, সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট স্মৃতি ধীরে ধীরে সামাজিক স্বাভাবিকতায় পরিণত হতে পারে।

ক্ষমতা কোনো দাবিকে সত্য বানায় না। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সত্যের সামাজিক গ্রহণ যোগ্যতা কে আড়াল, দুর্বল বা প্রতিস্থাপিত করতে পারে।

এবং এই কৌশল কোনো একটি দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, ইতিহাসকে নিজের রাজনৈতিক বংশপরিচয় নির্মাণে ব্যবহারের প্রলোভন তার সামনে এসেছে। হাতিয়ার টি পুরোনো। শুধু হাত বদলায়।

 

ষষ্ঠ কথা: শ্যামাপ্রসাদের ক্ষেত্রে একটি বাড়তি রাজনৈতিক প্রয়োজন

এতক্ষণ যা বললাম, তার অধিকাংশই সাধারণ নিয়ম। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বাড়তি এবং নির্দিষ্ট প্রয়োজন কাজ করছে বলে মনে হয়।

বিজেপি কে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন একটি অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে: তারা নাকি “বহিরাগত”, “হিন্দি বলয়ের দল”, বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাদের শিকড় দুর্বল। এই অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি এখানে আমার আলোচনার বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিযোগটি রাজনৈতিকভাবে বাস্তব এবং বিজেপিকে তার মোকাবিলা করতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে শ্যামাপ্রসাদ বিজেপির কাছে এক অসাধারণ প্রতীকী সম্পদ।

তিনি বাঙালি। উচ্চশিক্ষিত। কলকাতার জনজীবনের পরিচিত ঐতিহাসিক চরিত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু মহাসভার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। পরে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যে সংগঠনকে বিজেপির রাজনৈতিক পূর্বসূরি হিসেবে দেখা হয়।

অর্থাৎ একটি চরিত্রের মধ্যে বাংলা, উচ্চশিক্ষা, জাতীয় রাজনীতি এবং বর্তমান বিজেপির ঐতিহাসিক বংশপরিচয়কে যুক্ত করার বিরল সুযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে অনুমান করা কঠিন নয় যে শ্যামাপ্রসাদের প্রতীকী গুরুত্ব বর্তমান বিজেপির কাছে বিশেষ। “আমরাও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের বাইরের কেউ নই; আমাদেরও এই মাটিতে পূর্বপুরুষ আছে”, এই বার্তা নির্মাণে তাঁর নাম কার্যকর।

এখানে তাঁর প্রকৃত ঐতিহাসিক ভূমিকা অপ্রাসঙ্গিক নয়। বরং সেই বাস্তব ভূমিকাই প্রতীক নির্মাণের কাঁচামাল। কিন্তু বাস্তব ভূমিকা থেকে একক প্রতিষ্ঠাতা-পুরুষে উত্তরণটি রাজনৈতিক।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত জরুরি।

কারণ ইতিহাস বিকৃত করার সবচেয়ে দক্ষ পদ্ধতি সবসময় শূন্য থেকে মিথ্যা বানানো নয়। বরং একটি সত্যকে এত বড় করে তোলা যে তার পাশে থাকা অন্য সত্যগুলো আর দেখা না যায়।

 

সপ্তম কথা: প্রতিরোধ কেন দুর্বল

তাহলে প্রশ্ন হলো, বিরুদ্ধ ভাষ্য সমান জোরে পাল্টা লড়াই করতে পারছে না কেন?

এর একটি বড় কারণ কাঠামোগত।

সংগঠিত রাজনৈতিক প্রচারযন্ত্রের কেন্দ্রীভূত বার্তা থাকে। একই স্লোগান, একই ছবি, একই শব্দবন্ধ, একই ঐতিহাসিক দাবি হাজার হাজার কর্মী, নেতা, পেজ, সভা, ভিডিও এবং প্রচারমাধ্যমে পুনরাবৃত্ত হতে পারে। তার পেছনে অর্থ থাকে, সংগঠন থাকে, সময় থাকে, প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী থাকে এবং কখনও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাও থাকে।

বিপরীতে সমালোচনামূলক ভাষ্য প্রায়ই বিক্ষিপ্ত।

কেউ একটি ফেসবুক পোস্ট লিখছেন। কেউ একটি কলাম। কেউ গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন, যা সাধারণ মানুষ পড়বেন না। কেউ টেলিভিশনে পাঁচ মিনিটের বিতর্কে চিৎকার করছেন। কেউ একটি দীর্ঘ তথ্যসূত্র দিচ্ছেন, যার প্রথম অনুচ্ছেদ পার হওয়ার আগেই পাঠকের ফোনে অন্য নোটিফিকেশন এসে গেছে।

একদিকে সংগঠিত পুনরাবৃত্তি। অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন সংশোধন।

এই অসম লড়াইয়ে কে এগিয়ে থাকবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়।

এর সঙ্গে যোগ হয় সাধারণ মানুষের যাচাই-ক্লান্তি। অধিকাংশ মানুষের হাতে এত সময় নেই যে প্রতিটি রাজনৈতিক দাবি নিয়ে আর্কাইভ ঘাঁটবেন। তাঁদের চাকরি আছে, বাজার আছে, সন্তান আছে, ঋণ আছে, অসুস্থতা আছে, হাজার রকম দৈনন্দিন চাপ আছে। ইতিহাস যাচাই করা তাঁদের পূর্ণকালীন পেশা নয়।

ফলে একটি সাধারণ মনোভাব তৈরি হয়:

“শুনেছি ব্যাপারটা বিতর্কিত।”

তারপর জীবন এগিয়ে যায়।

এই নিস্পৃহতা কোনো ষড়যন্ত্র নয়। কিন্তু একপেশে ইতিহাস নির্মাণের জন্য এটি অত্যন্ত সহায়ক পরিবেশ।

বাংলার ক্ষেত্রে আরও একটি জটিলতা আছে। এখানে শুধু বিজেপির কেন্দ্রীভূত স্মৃতি-রাজনীতি দেখলে পুরো ছবি ধরা পড়বে না। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ ও স্থানীয় সমাজে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি, পঞ্চায়েতকেন্দ্রিক ক্ষমতা, সরকারি সুবিধা, স্থানীয় আনুগত্য এবং সামাজিক সম্পর্কও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের পরিসরকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এই প্রভাব সর্বত্র এক নয় এবং অঞ্চলভেদে ভিন্ন। তাই সরলভাবে বলা যাবে না যে মানুষ পঞ্চায়েতের ভয়ে ইতিহাস পড়ে না। সেই দাবি প্রমাণহীন হবে। বরং বলা যায়, স্থানীয় ক্ষমতার সঙ্গে দৈনন্দিন নির্ভরতার সম্পর্ক অনেক সময় প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধিতা বা স্বাধীন আলোচনার পরিবেশকে সংকুচিত করতে পারে।

অর্থাৎ বাংলার বাস্তবতা একমুখী নয়।

একদিকে বিজেপি নিজের বাঙালি ঐতিহাসিক বংশপরিচয় নির্মাণে শ্যামাপ্রসাদ কে কেন্দ্রীয় প্রতীকে পরিণত করতে চাইতে পারে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নিজের ক্ষমতাকাঠামো, সরকারি স্মৃতি, বাংলা-পরিচয় এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্য ধরনের রাজনৈতিক স্বাভাবিকতা নির্মাণ করে। দুই শক্তির পদ্ধতি, মতাদর্শ এবং উদ্দেশ্য এক নয়। কিন্তু ইতিহাস ও স্মৃতিকে রাজনৈতিক বৈধতার সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

এই জায়গায় দাঁড়িয়েই বোধহয় আমাদের সবচেয়ে সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ নিজের পছন্দের দলের ইতিহাস-নির্মাণকে “স্মরণ” আর অপছন্দের দলের ইতিহাস-নির্মাণকে “প্রোপাগান্ডা” বললে বিশ্লেষণ আর বিশ্লেষণ থাকে না। সেটিও আরেক ধরনের দলীয় স্মৃতি হয়ে ওঠে।

 

শেষ কথা: সত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র মিথ্যা নয়, সরলতা

এই সাতটি কথা একসঙ্গে সাজালে একটি উত্তর পাওয়া যায়, যদিও সম্পূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। ইতিহাসের মতো জটিল ক্ষেত্রে কোনো সাত দফা তালিকাই চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হতে পারে না।

তবু একটি প্রক্রিয়া স্পষ্ট।

অতীতের ঘটনা কাঁচামাল। সেই কাঁচামাল থেকে সামাজিক স্মৃতি তৈরি হয়। জাতি বা দল নিজের একতা গড়তে গিয়ে কিছু ঘটনা সামনে আনে, কিছু ঘটনা ভুলে যায়। পুনরাবৃত্তি একটি ভাষ্যকে পরিচিত করে তোলে। পরিচিত ভাষ্য অনেক সময় বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়। রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের তথ্য গ্রহণের পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গল্পকে দৃশ্যমানতা ও বৈধতা দেয়। বর্তমানের রাজনৈতিক প্রয়োজন অতীত থেকে উপযুক্ত প্রতীক খুঁজে নেয়। তারপর সেই প্রতীকের চারপাশে একটি সহজ, স্মরণযোগ্য, আবেগময় কাহিনি নির্মিত হয়।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাস্তব ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। সেই সত্য অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু সেই ভূমিকা স্বীকার করা এবং তাঁকে “পশ্চিমবঙ্গের জনক” হিসেবে একক প্রতিষ্ঠাতা-পুরুষে পরিণত করা একই বিষয় নয়। প্রথমটি ইতিহাসের একটি দাবি, যা দলিল, বিতর্ক ও প্রেক্ষা পটের মধ্যে বিচার্য। দ্বিতীয়টি স্মৃতি-রাজনীতির একটি নির্মাণ, যা বর্তমানের রাজনৈতিক প্রয়োজনের মধ্যেও বিচার্য।

এখানেই আমাদের প্রশ্ন করা দরকার।

কেন একজন?

কেন এখন?

কেন এই বিশেষ উপাধি?

কোন জটিল ইতিহাস এই একটি শব্দবন্ধের আড়ালে চলে যাচ্ছে?

কারা স্মরণীয় হচ্ছেন?

কারা অদৃশ্য হচ্ছেন?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের বাস্তব অবদানকে স্বীকার করেও কি তাঁর চারপাশে নির্মিত রাজনৈতিক পুরাণকে প্রশ্ন করা যায়?

আমার মনে হয়, যায়। বরং সেটাই ইতিহাসচর্চার ন্যূনতম সততা।

এই সমস্যার সমাধান কোনো একবারের ভাইরাল পোস্টে হবে না। কারণ যে প্রক্রিয়া রাজনৈতিক গল্প তৈরি করে, সেটি স্থায়ী, সংগঠিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক। তার বিরুদ্ধে একটি ক্ষুব্ধ পোস্ট, একটি বক্তৃতা বা একটি তথ্যের তালিকা খুব বেশি দূর যেতে পারে না। দরকার একই রকম ধারাবাহিক প্রশ্ন, সহজ ভাষায় ইতিহাসের জটিলতা তুলে ধরা, উৎস যাচাইয়ের অভ্যাস তৈরি করা এবং নিজের পছন্দের রাজনৈতিক পক্ষকেও একই কঠোর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো।

কারণ ইতিহাস যখন রাজ নীতির দল দাসে পরিণত হয়, তখন প্রথমে হারিয়ে যায় তার জটিলতা। তারপর হারিয়ে যায় তার দ্বন্দ্ব। তারপর হারিয়ে যায় বহু মানুষের ভূমিকা। শেষে পড়ে থাকে একটি নাম, একটি ছবি, একটি স্লোগান।

সেইটাই তখন মনে রাখা সহজ হয়ে ওঠে।

বিশ্বাস করা আরও সহজ।

শুধু প্রশ্ন করাটাই কঠিন।

তবু মানুষ প্রশ্ন করে। কারণ মানুষের ভিতরে শুধু সুবিধা, আনুগত্য, পরিচয় কিংবা নিশ্চিন্ত বিশ্বাসই কাজ করে না; বরং জীবনানন্দের মতো সে বলতে চায়-

“জানি—তবু জানি নারীর হৃদয়—প্রেম—শিশু—গৃহ—নয় সবখানি;অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—আরো এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে” ।

সেই বিস্ময়ই হয়তো তাকে হাজারবার শোনা কথার সামনে হাজার- বার দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করতে শেখায়, সত্যিই কি তাই? সত্যিই কি তাই?

আর সম্ভবত এই প্রশ্ন গুলোকেই ইতিহাসের সামনে আনা একজন সচেতন পাঠকের শেষ দায়িত্ব।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles