হাইলাইটস:
- টানা তিন বিশ্বকাপে অকাল বিদায় জার্মানির; ধারাবাহিকতার অভাবকে প্রধান কারণ বললেন ফিলিপ লাম।
- জুলিয়ান নাগেলসমানের অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দল কখনও স্থিতিশীল ছন্দ খুঁজে পায়নি।
- জার্মান ফুটবলকে নিজের স্বকীয় পরিচয় ও খেলার দর্শনে ফিরে যাওয়ার আহ্বান প্রাক্তন অধিনায়কের।
জার্মানির টানা তৃতীয় বিশ্বকাপে অকাল বিদায় আমাকে স্তম্ভিত করেছে। এই ধাক্কা সামলে উঠতে আমার সময় লাগবে। কিন্তু আবেগের বাইরে গিয়ে এখন যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনার দাবি রাখে, সেটি হলো ধারাবাহিকতা। গত এক দশক ধরে জার্মান জাতীয় দলে এই ধারাবাহিকতারই অভাব সবচেয়ে প্রকট। আমরা এখনও ঠিক করে উঠতে পারিনি, জার্মান ফুটবল আসলে কীভাবে খেলতে চায়। কখনও নতুন কৌশল, কখনও নতুন বিন্যাস, কখনও আবার নতুন অবস্থানে খেলোয়াড়দের ব্যবহার—সব মিলিয়ে দল যেন স্থায়ী কোনো পরিচয়ই গড়ে তুলতে পারেনি।
জুলিয়ান নাগেলসমান বরাবরই নতুন নতুন পরীক্ষায় বিশ্বাসী। কিন্তু এই বিশ্বকাপে সেই প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছিল। একটি শক্তিশালী দল তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। প্রতিটি খেলোয়াড়কে নিজের ভূমিকা বুঝতে হয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করতে হয়। অথচ জার্মানি যেন প্রতিটি ম্যাচেই নতুন করে শুরু করেছে।
অতীতে জার্মানির সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল পরিষ্কার দায়িত্ববণ্টন। প্রত্যেক খেলোয়াড় জানতেন তাঁর কাজ কী, দলের নেতৃত্ব কার হাতে এবং আক্রমণ ও রক্ষণে দলের মৌলিক পরিকল্পনা কী। এবার সেই দৃঢ় বিশ্বাসের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। বিশ্বকাপের মঞ্চে দলটিকে কখনও মনে হয়নি যে দীর্ঘ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে তারা একটি সুসংগঠিত ইউনিটে পরিণত হয়েছে।
প্রতিটি ম্যাচেই সেই ঘাটতি চোখে পড়েছে। রক্ষণ থেকে মাঝমাঠ হয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষমতা ছিল না। প্রতিপক্ষের অর্ধে গিয়ে বল ধরে রাখার দক্ষতাও অনুপস্থিত ছিল। আবার প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে নিজেদের গোলমুখ নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রেও একই দুর্বলতা দেখা গেছে। অন্যান্য বড় দলগুলোর খেলায় এই শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়, কিন্তু জার্মানির খেলায় তা ছিল না।
এক সময় জার্মানিকে বলা হতো ‘টুর্নামেন্টের দল’। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা যত এগোত, দল তত শক্তিশালী হয়ে উঠত। এখন সেই ঐতিহ্য যেন অতীত। এবার উল্টোটা ঘটেছে। ম্যাচ যত এগিয়েছে, জার্মানির পারফরম্যান্স তত খারাপ হয়েছে। কারণ, যে পরিকল্পনাগুলো কার্যকর ছিল, সেগুলোকেও মাঝপথে পরিত্যাগ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেনিজ উন্দাভকে বদলি হিসেবে নামানোর কৌশল সফল হয়েছিল। কিন্তু প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে সেই পরিকল্পনা বদলে ফেলা হলো।
আমি হলে অন্তত দুটি সিদ্ধান্ত ভিন্নভাবে নিতাম। প্রথমত, যোশুয়া কিমিখ বায়ার্ন মিউনিখে মাঝমাঠে খেলেন। তাহলে জাতীয় দলেও তাঁর সেখানেই খেলা উচিত ছিল। দ্বিতীয়ত, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ ও কাই হাভার্টজ আমাদের সেরা ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম। প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে গোলেই তার প্রমাণ মিলেছে। আমি চাইতাম ভির্টজ মাঝমাঠের কেন্দ্রে, হাভার্টজের ঠিক পেছনে খেলুক—এবং সেটি এক ম্যাচ নয়, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে একইভাবে বজায় থাকুক।
নাগেলসমান নিজেই বলেন, তিনি প্রায়ই কৌশল ও বিন্যাস বদলাতে পছন্দ করেন। কিন্তু স্পেন কিংবা ফ্রান্সের মতো বড় দলগুলোকে দেখুন। তারা প্রায় একই কাঠামোয় খেলে। মাঠে নামলেই বোঝা যায় কোন দল খেলছে। তারা নিজেদের খেলার ধরন এতটাই নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছে যে প্রতিপক্ষের পক্ষে তা ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে। ফুটবলকে অকারণে জটিল করে তোলার প্রয়োজন নেই। পরিবর্তন অবশ্যই করা যায়, কিন্তু সেটা হওয়া উচিত ছোটখাটো বিষয় নিয়ে, দলের মূল কাঠামো স্থির হওয়ার পরে। শুধু জাতীয় দল নয়, বুন্দেসলিগার অনেক ক্লাবের মধ্যেও এই স্পষ্টতার অভাব দেখা যায়।
নাগেলসমানের দল নির্বাচনের বিষয়টিও প্রশ্ন তুলেছে। ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে, যে ম্যাচটির আর কোনো গুরুত্ব ছিল না, তিনি এক ধরনের বিন্যাস ব্যবহার করলেন। অথচ প্যারাগুয়ের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিলেন। এই সিদ্ধান্তের কোনো যুক্তি আমি খুঁজে পাইনি। প্রতিটি পরিবর্তন দলের কাছে একটি বার্তা বহন করে। সেই বার্তার অর্থ খেলোয়াড়দের কাছে পরিষ্কার হওয়া জরুরি। কিন্তু এবার তা হয়নি।
তবু এই বিশ্বকাপ থেকে একটি ইতিবাচক দিক আমি দেখেছি। ব্যর্থতার পরও খেলোয়াড়রা একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। বরং সবাই সবার পাশে দাঁড়িয়েছে। আন্তোনিও রুডিগার প্রতিদ্বন্দ্বী জনাথন তাহ ও নিকো শ্লটারবেকের প্রশংসা করেছেন। হাভার্টজ উন্দাভকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিমিখ লেরয় সানে এবং নাগেলসমানের পক্ষ নিয়েছেন। এই ঐক্যের ভিতের ওপর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।
যারা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়দের মানসিকতা ঠিক নয়, তাদের সঙ্গে আমি একমত নই। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে হয়তো সেই অভিযোগের কিছু ভিত্তি ছিল। কিন্তু ২০২২ কিংবা ২০২৬ সালের দলকে সেই অভিযোগে দোষারোপ করা অন্যায়। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এই খেলোয়াড়রা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছে। হার তাদের গভীরভাবে আঘাত করে। ২০২২ সালে বিদায়ের পর কিমিখ বলেছিলেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন। এবারও তাঁর কষ্ট স্পষ্ট ছিল।
আজকের প্রজন্ম একাডেমি-নির্ভর। বারো-তেরো বছর বয়স থেকেই তারা ফুটবলকে পেশা হিসেবে দেখছে। এই সময়ে ফুটবল বদলেছে—বেতন বেড়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ বেড়েছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রবণতাও বেড়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে খেলোয়াড়দের পথ দেখানোর জন্য শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে সুযোগও দিতে হবে। কিন্তু বারবার দেখা যায়, কোচেরা ২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী প্রজন্মের ওপরই নির্ভর করেন। এই বিশ্বকাপে যেমন ম্যানুয়েল নয়্যারকে আবার প্রথম একাদশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। হয়তো এতে সাময়িক স্থিতি আসে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি নতুনদের উদ্দেশে এক ধরনের অবিশ্বাসের বার্তাও দেয়। অথচ আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স দেখিয়েছে, অভিজ্ঞ তারকাদের রেখে দিয়েও নতুন দল গড়ে তোলা সম্ভব। সেখানে দিদিয়ে দেশঁ ও লিওনেল স্কালোনি স্পষ্ট নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন, ফলে দলে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়েছে।
টানা তিনটি বিশ্বকাপে—ইয়োয়াখিম ল্যোভ, হান্সি ফ্লিক এবং এখন নাগেলসমান—কেউই সফল হতে পারেননি। তাই সমস্যার মূল খেলোয়াড়দের মধ্যে আমি দেখি না। আমাদের ফুটবলাররা ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোতে খেলেন। রুডিগার বহু বছর ধরে রিয়াল মাদ্রিদের ভরসা। ভির্টজ লেভারকুসেনকে প্রথম লিগ শিরোপা এনে দিয়ে বিপুল অঙ্কে লিভারপুলে যোগ দিয়েছেন। হাভার্টজ চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন, পরে আর্সেনালের সঙ্গে প্রিমিয়ার লিগও জিতেছেন। জামাল মুসিয়ালাকে বিশ্বমানের প্রতিভা বলা হয়। কিমিখ বহু বছর ধরে বায়ার্নের নেতৃত্বের অন্যতম স্তম্ভ। ব্যক্তিগত প্রতিভার বিচারে ফ্রান্স ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে আমাদের বড় পার্থক্য নেই।
বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর। জাতীয় দলকে দেশের মানুষের প্রতিচ্ছবি হতে হয়। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মানুষ নিজেদের দলকে উদ্যাপন করেন, কারণ তারা নিজেদের সেই দলের মধ্যে খুঁজে পান। কিন্তু যদি প্রতিনিয়ত দলের কাঠামো বদলে যায়, তবে সমর্থকেরা সেই দলের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক গড়ে তুলবেন কীভাবে? তাদের হতাশার মূল কারণ সেখানেই।
আমাদের সময়েও সব খেলোয়াড়ের সঙ্গে সবার সম্পর্ক নিখুঁত ছিল না। কিন্তু ২০০৬ থেকে ২০১৪ সালের সতীর্থদের সঙ্গে আজও দেখা হলে আমরা সেই সাফল্যের স্মৃতি ভাগ করে নিই। সেই যৌথ অর্জন আমাদের আজীবনের সম্পদ। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো সেই অভিজ্ঞতা কখনও পাবে না। সেটাই সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।
এখন নাগেলসমানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরির নামও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তার আগে আমাদের আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। জার্মান ফুটবল আসলে কীভাবে খেলতে চায়? আমরা কি স্পেন হতে চাই? আর্জেন্টিনা হতে চাই? নাকি ফ্রান্স?
না, আমরা জার্মানি। আমাদের নিজস্ব ফুটবল-সংস্কৃতি আছে, নিজস্ব পরিচয় আছে। সেই পরিচয়ের কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে—দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে।