হাইলাইটস:

  • ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ব্যারেলপিছু ৭০ ডলারের নিচে নেমেছে।
  • পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম এত কম দামে তেল কিনছে ভারত।
  • তবুও আপাতত পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ।
  • রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি আগের লোকসান পুষিয়ে নিতে চাইছে।
  • পেট্রোলে লাভ হলেও ডিজেলে এখনও প্রতি লিটারে ৮-১০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে।
  • সরকারও ভর্তুকি ও রাজস্বের ভারসাম্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বাংলাস্ফিয়ার: আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলেও দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এখনই সুখবর নেই। ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ব্যারেলপিছু ৭০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই প্রথম। কিন্তু এই পতনের সরাসরি প্রভাব পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দামে পড়বে—এমন আশা আপাতত ক্ষীণ।

সরকারি সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলি এখনও অতীতের বিপুল ক্ষতির বোঝা সামলাতে ব্যস্ত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সেই সুবিধা অবিলম্বে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই।

সংঘাতের পর সর্বনিম্ন দামে তেল

গত শুক্রবার ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের গড় মূল্য নেমে এসেছে ব্যারেলপিছু ৬৮.৮৬ ডলারে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ মাসে এই দাম একসময় ১৫৭.০৪ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসে প্রায় ৫৬ শতাংশেরও বেশি দাম কমেছে।

এই পতনের ফলে ভারতের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন কমছে না পেট্রোল-ডিজেলের দাম?

প্রশ্ন উঠছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এতটা কমেছে, তখন দেশের মানুষ তার সুফল পাচ্ছেন না কেন?

এর প্রধান কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির আর্থিক অবস্থা।

সংস্থাগুলির হিসাবে বর্তমানে পেট্রোল বিক্রিতে প্রতি লিটারে প্রায় ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বিপণন মুনাফা হচ্ছে। কিন্তু ডিজেল বিক্রিতে এখনও প্রতি লিটারে ৮ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে।

অর্থাৎ পেট্রোলের লাভের একটি বড় অংশ ডিজেলের ক্ষতি সামাল দিতেই চলে যাচ্ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দাম কমানোর মতো অবস্থায় এখনও পৌঁছয়নি তেল সংস্থাগুলি।

আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াই এখন লক্ষ্য

সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে গেলেও দীর্ঘ সময় ধরে দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। এর ফলে তেল সংস্থাগুলিকে বড় আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

সরকার মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সাধারণ মানুষের উপর পুরোপুরি চাপিয়ে দিতে চায়নি। ফলে সেই সময় বিপণন সংস্থাগুলিকে লোকসান সয়ে জ্বালানি বিক্রি করতে হয়।

এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় সংস্থাগুলি সেই ক্ষতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।

সরকারেরও রয়েছে আর্থিক হিসাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারও এই পরিস্থিতিতে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।

গত কয়েক বছরে জ্বালানি খাতে কর, ভর্তুকি এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণের কারণে কেন্দ্রের উপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলে সেই সুযোগে সরকার ভবিষ্যতের আর্থিক ঝুঁকি সামাল দেওয়ার জন্য কিছুটা সুরক্ষা রাখতে চাইতে পারে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও পুরো সুবিধা একবারে ভোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়ার বদলে সরকারের আর্থিক ভারসাম্যের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে।

ডিজেলের গুরুত্ব বেশি

ভারতের অর্থনীতিতে ডিজেলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পণ্য পরিবহণ, কৃষি, নির্মাণ, শিল্প এবং গণপরিবহণ—সব ক্ষেত্রেই ডিজেল প্রধান জ্বালানি।

ডিজেলের দাম কমানো হলে মূল্যস্ফীতির উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পরিবহণ খরচ কমতে পারে।

কিন্তু ডিজেলে এখনও লোকসান থাকায় সরকার ও তেল সংস্থাগুলি এই বিষয়ে তাড়াহুড়ো করতে চাইছে না।

আন্তর্জাতিক বাজারে কী ঘটছে?

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার পিছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।

  • পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
  • সরবরাহ ব্যবস্থা আগের তুলনায় স্থিতিশীল হয়েছে।
  • বড় অর্থনীতিগুলিতে জ্বালানির চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় কম বেড়েছে।
  • উৎপাদনকারী দেশগুলিও বাজারে সরবরাহ বজায় রেখেছে।

এই সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত নেমে এসেছে।

ভারতের জন্য বড় স্বস্তি

তেলের দাম কমায় ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমবে। পাশাপাশি আমদানি বিল কম হওয়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।

রুপির উপর চাপও কিছুটা কমতে পারে। এছাড়া শিল্প উৎপাদন, পরিবহণ ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির উপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কবে কমতে পারে দাম?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ব্যারেলপিছু ৭০ ডলারের আশপাশে বা তার নিচে স্থির থাকে এবং ডিজেলের লোকসানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, তাহলে ভবিষ্যতে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা মূল্য পর্যালোচনা করা হতে পারে।

তবে তা অবিলম্বে হওয়ার সম্ভাবনা কম। তেল সংস্থাগুলির আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত—দুইয়ের উপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেই দেশের পাম্পে জ্বালানির দাম কমবে—এই ধারণা সব সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। কারণ খুচরা দামের মধ্যে কেবল অপরিশোধিত তেলের মূল্য নয়, শোধন ব্যয়, পরিবহণ খরচ, বিপণন ব্যয়, কেন্দ্র ও রাজ্যের কর এবং বিভিন্ন আর্থিক বিবেচনাও যুক্ত থাকে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পতন হলেও তার সম্পূর্ণ সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না।

ভারতের ক্ষেত্রে এবারও সেই ছবিই দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতির জন্য এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর, কিন্তু সাধারণ গাড়িচালকদের জন্য আপাতত পেট্রোল-ডিজেলের দামে তেমন কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।