হাইলাইটস:
- টাইব্রেকারে জার্মানিকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে।
- বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার টাইব্রেকারে পরাজিত জার্মানি।
- নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ ১-১ সমতায় শেষ হয়।
- গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের দুর্দান্ত সেভ ও হোসে কানালের জয়সূচক স্পট-কিক প্যারাগুয়েকে এনে দেয় ঐতিহাসিক জয়।
- ভিএআরের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির একটি গোল বাতিল হয়।
বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বের শুরুতেই ঘটে গেল অন্যতম বড় অঘটন। প্রবল ফেবারিট জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল প্যারাগুয়ে। বোস্টনের মাঠে ১২০ মিনিটের স্নায়ুচাপের লড়াই শেষে ভাগ্য নির্ধারণ হয় টাইব্রেকারে। সেখানে অসাধারণ সংযম ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।
এই পরাজয় জার্মান ফুটবলের ইতিহাসেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বকাপে এর আগে কখনও টাইব্রেকারে হারেনি জার্মানি। বহুবার চাপের মুখে সাফল্য পাওয়া দলটি এবার নিজেদের স্নায়ু ধরে রাখতে ব্যর্থ হল।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল জার্মানির। প্রথমার্ধে তারা প্রায় ৭৯ শতাংশ সময় বল নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ৩০৮টি পাস সম্পূর্ণ করে। বিপরীতে প্যারাগুয়ের পাস ছিল মাত্র ৫৫টি। কিন্তু পরিসংখ্যান মাঠের বাস্তবতা বদলাতে পারেনি। প্যারাগুয়ে অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ সাজিয়ে জার্মান আক্রমণকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে।
৩৮ মিনিটে কর্নার থেকে তৈরি আক্রমণে গোল করে এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে। মিগেল আলমিরনের কর্নার জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার ফিরিয়ে দিলেও বল ফের পেয়ে মাতিয়াস গালারসা নিখুঁত ক্রস বাড়ান। মাত্র পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার হুলিও এনসিসো দুর্দান্ত হেডে জালের ঠিকানা খুঁজে নেন।
বিরতির পর জার্মানি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ৫৪ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের অসাধারণ ক্রসে কাই হাভার্টজ দৃষ্টিনন্দন হেডে সমতা ফেরান। এরপর একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও অরল্যান্ডো গিল দুর্দান্ত গোলরক্ষণ করে প্যারাগুয়েকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
অতিরিক্ত সময়ে জার্মানি গোলও পেয়ে গিয়েছিল। ১০৩ মিনিটে জোনাথন তাহের হেডে বল জালে জড়ালেও ভিডিও সহকারী রেফারির সাহায্যে গোলটি বাতিল করা হয়। কর্নারের সময় জার্মান ডিফেন্ডারের ফাউলের অভিযোগে রেফারি গোল স্বীকৃতি দেননি। সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এরপর টাইব্রেকারে শুরু হয় জার্মানির অবিশ্বাস্য ভরাডুবি। প্রথমেই কাই হাভার্টজের দুর্বল শট রুখে দেন গিল। নিক ভল্টেমাডের শটও তিনি ঠেকিয়ে দেন। একসময় ম্যানুয়েল নয়্যার দুটি শট বাঁচিয়ে জার্মানিকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু জোনাথন তাহের শট অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়।
শেষ শট নিতে এগিয়ে আসেন হোসে কানালে। অসাধারণ স্থিরতায় তিনি বল জালে পাঠিয়ে প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন। সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নেমে আসে গোটা প্যারাগুয়ে বেঞ্চ। উৎসবে ফেটে পড়েন খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকেরা।
প্যারাগুয়ের কোচ গুস্তাভো আলফারোর কৌশল এদিন নিখুঁতভাবে সফল হয়। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রক্ষণকেই প্রধান অস্ত্র করে তিনি দলকে এগিয়ে নিয়ে যান। প্রয়োজনমতো পাল্টা আক্রমণ, অসাধারণ দলগত শৃঙ্খলা এবং গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের অনবদ্য পারফরম্যান্স—এই তিনের সমন্বয়েই বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক উপহার দিল প্যারাগুয়ে।
অন্যদিকে জার্মানির বিদায়ের সঙ্গে বাড়ল কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমানের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা। বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর তাঁর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ফুটবলমহলের একাংশের মতে, এই ব্যর্থতার পর জার্মান ফুটবলে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বের প্রথম বড় অঘটন তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; এটি ফুটবলের সেই চিরন্তন সত্যেরই আরেকটি প্রমাণ—বল দখল নয়, জয় নির্ধারণ করে পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং মানসিক দৃঢ়তা। আর সেই পরীক্ষায় এদিন জার্মানিকে পিছনে ফেলে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে ফেলল প্যারাগুয়ে।