হাইলাইটস
- জার্মানি ও ইতালিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই, একাধিক এলাকায় ৪২ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠার আশঙ্কা।
- ডেনমার্ক ও স্লোভাকিয়ায় সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও উষ্ণতম রাতের রেকর্ড।
- ফ্রান্সে দাবদাহে বহু মানুষের মৃত্যু, রেল চলাচল, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জনজীবন ব্যাহত।
- জার্মানিতে প্রায় গোটা দেশে চরম তাপপ্রবাহের সতর্কতা, জল ব্যবহারে সংযমের আহ্বান।
- বিজ্ঞানীদের দাবি, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এমন তাপপ্রবাহ কার্যত অসম্ভব ছিল।
পশ্চিম ইউরোপে কয়েক দিন ধরে চলা ভয়াবহ তাপপ্রবাহ এবার পূর্ব ইউরোপের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার জার্মানি ও ইতালিতে অসহনীয় গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, আর বহু এলাকায় ৪২ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা। ইতিমধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ডেনমার্ক শনিবার ৩৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে, যা ১৮৭৪ সালে পরিমাপ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। অন্যদিকে স্লোভাকিয়ায় শুক্রবার রাত ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম রাত। সেখানে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও ২৬.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি।
এর আগে ব্রিটেন, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিতে জুন মাসের তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই তাপপ্রবাহ এখন পোল্যান্ডের দিকে এগোচ্ছে এবং আরও নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে পারে। ব্রিটেনে গরম থেকে স্বস্তি পেতে খোলা জলাশয়ে নেমে শনিবার এক কিশোর, দুই পুরুষ ও এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গত কয়েক দিনের আরও দুটি মৃত্যুর সঙ্গে মিলিয়ে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে সেখানে ডুবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়ে। মে মাসের তাপপ্রবাহেও অন্তত ১৫ জন একইভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছাড়া এমন তীব্র তাপপ্রবাহ কার্যত সম্ভব হতো না। তাঁদের মতে, রাতের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা দুই দশক আগের তুলনায় এখন প্রায় ১০০ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে। জার্মানির আবহাওয়াবিদ কার্স্টেন ব্রান্ট জানান, সপ্তাহান্তে দেশের কিছু অংশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির অনেক ওপরে উঠবে। শুক্রবার ফ্রান্স সীমান্ত সংলগ্ন সারব্রুকেন এলাকার কাছে ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে।
জার্মান আবহাওয়া দফতর প্রায় গোটা দেশের জন্য চরম তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় জল ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। ফ্রান্সেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তীব্র গরমে শিশু থেকে প্রবীণ— বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় রেল পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিয়েছে, কিছু এলাকায় মদ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বহু খোলা আকাশের অনুষ্ঠান স্থগিত করতে হয়েছে।
ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মিলান, রোম, তুরিন, ভেনিস, ফ্লোরেন্স, জেনোয়াসহ ১৮টি শহরে শনিবার ও রবিবারের জন্য সর্বোচ্চ লাল সতর্কতা জারি করেছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী দপ্তর জানিয়েছে, তাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে কমলেও হাসপাতালগুলির ওপর চাপ আগামী কয়েক দিন বজায় থাকবে। একই সঙ্গে দাবদাহের কারণে গত বছরের তুলনায় দাবানলের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অতিরিক্ত গরমে রাস্তা ও রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় একাধিক দেশে পরিবহণ পরিষেবা সীমিত করা হয়েছে। জার্মানির জাতীয় রেল সংস্থা ডয়চে বান যাত্রীদের অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই দূরপাল্লার টিকিট বাতিলের সুযোগ দিয়েছে। সংস্থার দাবি, প্রবল রোদ, বজ্রঝড় ও দাবানলের কারণে সিগন্যাল, রেললাইন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ পড়ছে। হামবুর্গের কাছে ব্যস্ত এ-৭ মহাসড়কের একটি অংশে প্রচণ্ড গরমে পিচ ফেটে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ইতালির মিলানে সমকামী অধিকার সমর্থনকারী শোভাযাত্রার সূচনাও গরমের কারণে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিতব্য আয়রনম্যান ইউরোপীয় দীর্ঘ দূরত্বের প্রতিযোগিতার সাইক্লিং ও দৌড়ের পথও ছোট করা হয়েছে।
জার্মানির পৌর প্রশাসনগুলির সংগঠনের প্রধান আন্দ্রে বের্ঘেগার নাগরিকদের স্বেচ্ছায় জল সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ না হলে বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা জারি না করাই ভালো। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস, সপ্তাহান্তের পর থেকে চরম তাপপ্রবাহ কিছুটা কমতে পারে। তবে তার জায়গায় প্রবল বজ্রঝড় ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তাপপ্রবাহের নেপথ্যে রয়েছে ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি আবহাওয়াগত পরিস্থিতি, যেখানে উষ্ণ বায়ু দীর্ঘ সময় ধরে একটি অঞ্চলের ওপর আটকে থাকে। এর ফলে ইউরোপের বহু এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এদিকে তীব্র গরমের জেরে ইউরোপে বৈদ্যুতিক পাখা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তর ইউরোপের অধিকাংশ বাড়ি শীতের জন্য নির্মিত হওয়ায় সেখানে এই নজিরবিহীন গরম মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।