হাইলাইটস:

  • পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের সমীক্ষায় ভারতে আমেরিকার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
  • মাত্র ৪৫ শতাংশ ভারতীয় এখন আমেরিকা সম্পর্কে অনুকূল মত পোষণ করেন।
  • ৩১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিকূল, যা গত প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
  • বিশ্ব রাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আস্থা নেমে এসেছে ৩৯ শতাংশে।
  • এক বছর আগেও ট্রাম্পের প্রতি আস্থা ছিল ৫২ শতাংশ এবং আমেরিকার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ছিল ৫৪ শতাংশ।

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয়দের চোখে আমেরিকার ভাবমূর্তি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতায় বড়সড় পতনের ইঙ্গিত দিল পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ বৈশ্বিক জনমত সমীক্ষা। ২০২৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে এখন মাত্র ৪৫ শতাংশ মানুষ আমেরিকাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। একই সঙ্গে ৩১ শতাংশ ভারতীয় আমেরিকা সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, যা গত প্রায় পঁচিশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বিশ্ব রাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন মাত্র ৩৯ শতাংশ ভারতীয়। পিউর দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, এটিও গত প্রায় এক চতুর্থাংশ শতাব্দীতে কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে ভারতের সর্বনিম্ন আস্থার হার।

গত বছরের তুলনায় পরিবর্তনটি অত্যন্ত স্পষ্ট। ২০২৫ সালে যেখানে ৫৪ শতাংশ ভারতীয় আমেরিকা সম্পর্কে অনুকূল মত পোষণ করেছিলেন, এক বছরের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ শতাংশে। একই সময়ে প্রতিকূল মনোভাব ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আমেরিকার ভাবমূর্তিতে উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। একইভাবে ট্রাম্পের প্রতি আস্থাও ৫২ শতাংশ থেকে কমে ৩৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

এই পরিসংখ্যান শুধু জনপ্রিয়তার ওঠানামার ইঙ্গিত দেয় না, বরং ভারতীয় জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও দেশের সরকারি অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় এক নয়। ভারত ও আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ক আগের মতোই শক্তিশালী থাকলেও সাধারণ মানুষের মূল্যায়নে যে পরিবর্তন এসেছে, তা ভবিষ্যতের কূটনৈতিক পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একাধিক ঘটনার প্রভাব এই মনোভাব পরিবর্তনের পেছনে কাজ করে থাকতে পারে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত, বাণিজ্যিক টানাপোড়েন, শুল্কনীতি, অভিবাসন প্রশ্ন, বিভিন্ন যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে আমেরিকার ভাবমূর্তি অনেক দেশের মতো ভারতেও নতুন করে মূল্যায়নের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক জনমতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ভারতীয়দের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি আস্থার পতন আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অতীতে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা এবং ভারতকে ঘিরে একাধিক ইতিবাচক মন্তব্যের কারণে ট্রাম্পের প্রতি ভারতের জনমতের একটি বড় অংশ সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সমীক্ষা দেখাচ্ছে, সেই সুবিধা আর আগের মতো বজায় নেই।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ২৫ বছরে বিভিন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ভারতীয়দের মনোভাবের ওঠানামা ঘটেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ৩৯ শতাংশ আস্থার হার সেই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর অর্থ, ব্যক্তি হিসেবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে ভারতীয়দের একটি বড় অংশ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সংশয়ী।

অবশ্য সমীক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আমেরিকার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব কমলেও এখনও ৪৫ শতাংশ ভারতীয় দেশটিকে অনুকূল দৃষ্টিতে দেখেন। অর্থাৎ নেতিবাচক মতামত বাড়লেও ভারতীয় সমাজ এখনও সম্পূর্ণভাবে আমেরিকা-বিরোধী হয়ে ওঠেনি। বরং জনমত এখন অনেক বেশি বিভক্ত। একদিকে উল্লেখযোগ্য অংশ আমেরিকাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান একটি অংশ অসন্তোষও প্রকাশ করছেন।

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের বাস্তব চিত্র অবশ্য এখনও ভিন্ন। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশ, শিক্ষা, জ্বালানি এবং বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সামরিক মহড়া থেকে শুরু করে উচ্চপ্রযুক্তি বিনিয়োগ—বহু ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ফলে জনমতের এই পরিবর্তনকে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির সমার্থক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে গণতান্ত্রিক সমাজে জনমতের গুরুত্ব সবসময়ই থাকে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সেই বার্তাও বিবেচনায় নিতে হয়।

পিউর সমীক্ষা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় বাস্তবতাও সামনে আনছে। কোনও দেশের অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তি যতই বড় হোক, আন্তর্জাতিক জনমতের আদালতে তার ভাবমূর্তি নির্ভর করে নীতিগত অবস্থান, নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তার ভূমিকার ওপর। ভারতীয়দের মধ্যে আমেরিকা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণার হ্রাস এবং ট্রাম্পের প্রতি আস্থার উল্লেখযোগ্য পতন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের পিউ সমীক্ষা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ভারতের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে আমেরিকার গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ব্যক্তিগত আস্থাও গত প্রায় পঁচিশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের নীতিগত পদক্ষেপ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ এই জনমতকে আবার বদলে দিতে পারে। তবে আপাতত সমীক্ষার বার্তা একটাই—ভারতীয়দের একাংশের কাছে আমেরিকার ভাবমূর্তি এবং ট্রাম্পের নেতৃত্ব, দুটিই আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রশ্নের মুখে।