হাইলাইটস:
- দুর্নীতি শুধু ব্যক্তির নয়, কাঠামোরও সমস্যা।
- প্রযুক্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া কোনও সংস্কার টিকবে না।
- রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোই সবচেয়ে বড় শর্ত।
- নাগরিককেও কেবল অভিযোগকারী নয়, অংশীদার হতে হবে।
- অসম্ভব নয়, তবে অস্ত্রোপচার ছাড়া আরোগ্যও নয়।
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতা শহরকে অনেকেই “আনন্দের শহর” বলেন। কিন্তু এই শহরের পুরসভায় ঢুকলে কখনও কখনও মনে হয়, এটি যেন আনন্দের নয়, আবেদনপত্রের শহর। এখানে একটি নর্দমা পরিষ্কার করাতে আবেদন, একটি ট্রেড লাইসেন্স পেতে আবেদন, বাড়ির নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন, জন্মসনদ সংশোধনের জন্য আবেদন—সব কিছুর শেষে আবার আবেদন, “আমার আবেদনটি একটু দেখবেন?”
কেউ বলেন, পুরসভা একটি প্রতিষ্ঠান। কেউ বলেন, এটি একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কিন্তু বহু নাগরিকের অভিজ্ঞতা বলে, এটি যেন একটি গোলকধাঁধা, যেখানে ফাইল হাঁটে কচ্ছপের গতিতে, অথচ গুজব দৌড়ায় হরিণের মতো।
প্রশ্ন হল, এই প্রতিষ্ঠানকে কি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ এবং আধুনিক করে তোলা সম্ভব?
উত্তরটি এক কথায় “হ্যাঁ” বা “না” নয়। বরং উত্তরটি অনেকটা চিকিৎসকের ভাষায়—রোগী বাঁচতে পারে, কিন্তু বড় অস্ত্রোপচার ছাড়া নয়।
প্রথমেই একটি সত্যি মেনে নিতে হবে। দুর্নীতি কেবল ঘুষ নেওয়ার নাম নয়। দুর্নীতি হল এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নিয়মের চেয়ে ব্যতিক্রম বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। যেখানে কাজ হওয়াটা স্বাভাবিক নয়, কাজ করিয়ে নেওয়াটাই দক্ষতা হিসেবে গণ্য হয়। যেখানে আইন বইয়ে থাকে, কিন্তু বাস্তবে চলে “ব্যবস্থা”।
এই সংস্কৃতি যদি দশক ধরে তৈরি হয়, তবে শুধু কয়েকজন কর্মচারী বদলালেই কিছু বদলায় না।
সবচেয়ে আগে দরকার প্রক্রিয়ার সংস্কার।
যে কাজ অনলাইনে পাঁচ মিনিটে হওয়া সম্ভব, সেখানে যদি নাগরিককে পাঁচবার অফিসে যেতে হয়, তাহলে দুর্নীতির জন্য আলাদা আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর দরকার পড়ে না। মানুষ নিজেই শর্টকাট খুঁজতে শুরু করে। ফলে দালাল জন্মায়। তারপর দালালই হয়ে ওঠে আসল পথ।
আধুনিক পুরসভা মানে কাগজের পাহাড় নয়, তথ্যের প্রবাহ।
প্রত্যেকটি বিল্ডিং প্ল্যান, ট্রেড লাইসেন্স, মিউটেশন, সম্পত্তিকর, জন্ম ও মৃত্যুসনদ—সবকিছুর অগ্রগতি নাগরিক মোবাইল ফোনে দেখতে পাবেন। কোন টেবিলে ফাইল আছে, কত দিন ধরে আছে, কেন আটকে আছে—সব দৃশ্যমান হবে। তথ্য অন্ধকারে থাকলেই দুর্নীতি আলো খুঁজে পায়।
দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন হওয়া উচিত মানুষের বিবেচনাভিত্তিক ক্ষমতা কমানো।
যেখানে একজন অফিসারের ব্যক্তিগত মতামতের ওপর সবকিছু নির্ভর করে, সেখানে দরকষাকষির সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কিন্তু যদি অধিকাংশ অনুমোদন নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যায়, তাহলে ব্যক্তিগত প্রভাব কমে যাবে।
বিশ্বের বহু শহরে এখন “সাইলেন্ট অ্যাপ্রুভাল” ব্যবস্থা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপত্তি না এলে আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে ধরা হয়। আমাদের এখানেও এমন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে চালু করা যায়।
তৃতীয় শর্ত সম্পূর্ণ আর্থিক স্বচ্ছতা।
একটি রাস্তা মেরামতে কত টাকা বরাদ্দ হল, কোন সংস্থা কাজ পেল, কত দিনে শেষ হওয়ার কথা, কত টাকা ইতিমধ্যে খরচ হয়েছে, কাজের ছবি কোথায়—সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ হওয়া উচিত।
আজকের যুগে গোপন টেন্ডার নয়, উন্মুক্ত তথ্যই সবচেয়ে বড় পাহারাদার।
চতুর্থত, কর্মীদের মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি দরকার।
একজন কর্মচারীর পদোন্নতি শুধু চাকরির বছর গুনে হবে কেন? নাগরিকের অভিযোগ কত কম, কাজ নিষ্পত্তির গড় সময় কত, কতগুলি আবেদন নির্ধারিত সময়ে শেষ করেছেন—এসব সূচকও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
একজন দক্ষ কর্মী যদি অলস কর্মীর সমান পুরস্কার পান, তাহলে দক্ষতা খুব দ্রুত বিলাসবস্তু হয়ে যায়।
পঞ্চম বিষয়টি সবচেয়ে স্পর্শকাতর—রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
যে কোনও পুরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ভূমিকা থাকবে। সেটাই গণতন্ত্র। কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যদি প্রতিটি ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুপারিশের অপেক্ষায় থাকে, তাহলে পেশাদার প্রশাসন কখনও দাঁড়াতে পারে না।
একজন প্রকৌশলীকে প্রকৌশলীর মতো কাজ করতে দিতে হবে। স্বাস্থ্য আধিকারিককে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতো সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে। নইলে ফাইলের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তিও রাজনৈতিক রঙে রঙিন হয়ে যায়।
আরও একটি বড় সমস্যা হল দায়িত্বের অস্পষ্টতা।
কলকাতার রাস্তায় জল জমলে নাগরিক জানেন না, দোষ পুরসভার, সেচ দপ্তরের, না অন্য কোনও সংস্থার। রাস্তা খুঁড়ে রেখে দিলে কার কাছে অভিযোগ করবেন? পাইপ ফাটলে কে দায়ী?
এই বিভ্রান্তি প্রশাসনের জন্য সুবিধাজনক, নাগরিকের জন্য নয়।
একটি “একক নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থা” থাকা উচিত, যেখানে অভিযোগ জমা পড়লেই সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে তা পৌঁছে যাবে। নাগরিককে দপ্তরের মানচিত্র মুখস্থ করতে হবে না।
এবার আসা যাক প্রযুক্তির কথায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভূ-তথ্য ব্যবস্থা, ড্রোন জরিপ, স্মার্ট সেন্সর—এসব শব্দ শুনতে অনেক আধুনিক লাগে। কিন্তু এগুলির ব্যবহার খুবই বাস্তব।
কোথায় জল জমছে, কোন রাস্তার গর্ত বাড়ছে, কোথায় বর্জ্য নিয়মিত তোলা হচ্ছে না, কোন সম্পত্তির কর বকেয়া—এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
অর্থাৎ সমস্যার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার আগেই প্রশাসনের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তি নিজে কখনও দুর্নীতি দূর করে না।
দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষকে যদি নতুন সফটওয়্যার দেওয়া হয়, তিনি সফটওয়্যারকেও পুরনো অভ্যাস শেখানোর চেষ্টা করবেন।
তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি দরকার স্বাধীন নিরীক্ষা।
প্রতি বছর বাইরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বিভাগভিত্তিক কর্মক্ষমতার মূল্যায়ন হওয়া উচিত। সেই রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। নাগরিক জানবেন কোন বিভাগ ভালো কাজ করছে, কোনটি পিছিয়ে।
এর পাশাপাশি সম্পদের ঘোষণা অত্যন্ত জরুরি।
উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের সম্পদের বিবরণ নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রকাশের ব্যবস্থা থাকলে জনআস্থা বাড়ে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের দ্রুত ও স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
কিন্তু এত কিছু করলেই কি সব সমস্যার সমাধান? এখানেই আসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।
যদি দুর্নীতি কেবল ব্যক্তিগত লাভের বিষয় না হয়ে রাজনৈতিক অর্থনীতি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সংস্কার অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। কারণ তখন দুর্নীতি কোনও দুর্ঘটনা নয়, ব্যবস্থার জ্বালানি।
যেখানে অবৈধ নির্মাণ থেকে শুরু করে লাইসেন্স, সরবরাহ, ঠিকাদারি—সব ক্ষেত্রেই বহু স্বার্থ জড়িয়ে থাকে, সেখানে পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ তৈরি হয়।
এই প্রতিরোধ শুধু অফিসের ভেতর থেকে আসে না। আসে বাইরে থেকেও।
যারা বছরের পর বছর অস্বচ্ছ ব্যবস্থার সুবিধাভোগী, তারা স্বচ্ছতার বিরুদ্ধে কখনও প্রকাশ্যে স্লোগান দেয় না। তারা কেবল সংস্কারের গতি কমিয়ে দেয়। নতুন নিয়মকে পুরনো ব্যতিক্রম দিয়ে ভরে দেয়। ফলে কাগজে আধুনিকতা আসে, বাস্তবে পুরনো অভ্যাসই টিকে থাকে।
এ কারণেই কেবল নতুন আইন যথেষ্ট নয়। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সাহস এবং নাগরিকের ধারাবাহিক নজরদারি।
অনেকেই বলেন, “এ দেশে এসব হবে না।” ইতিহাস কিন্তু এত নিরাশাবাদী নয়।
ভারতের বিভিন্ন শহরে নাগরিক পরিষেবার বহু ক্ষেত্রে ডিজিটাল রূপান্তর হয়েছে। সম্পত্তিকর আদায় বেড়েছে, অনুমোদনের সময় কমেছে, অনলাইন পরিষেবা জনপ্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ পরিবর্তন সম্ভব। তবে তা রাতারাতি নয়, এবং শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন দিয়ে নয়।
সবশেষে একটি অস্বস্তিকর সত্যি।
আমরা প্রায়ই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হই। কিন্তু নিজের কাজ দ্রুত করাতে “চেনাজানা” বা “একটু ব্যবস্থা” খুঁজতেও দ্বিধা করি না। অর্থাৎ দুর্নীতির বাজারে শুধু বিক্রেতা নয়, ক্রেতাও আছে।
যে সমাজে নিয়ম ভাঙাকে বুদ্ধিমত্তা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে কোনও প্রতিষ্ঠান একা সৎ থাকতে পারে না।
কলকাতা পুরসভাকে আধুনিক করা সম্ভব। দুর্নীতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। পরিষেবা দ্রুত ও স্বচ্ছ করা সম্ভব। কিন্তু তার জন্য দরকার তিনটি জিনিস—নিয়মের সরলীকরণ, প্রযুক্তির সর্বজনীন ব্যবহার এবং জবাবদিহির কঠোর সংস্কৃতি।
অন্যদিকে, যদি সংস্কার কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে, যদি ব্যক্তি বদলে ব্যবস্থা না বদলায়, যদি তথ্য গোপনই থাকে, যদি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বার্থের অদৃশ্য জোট অটুট থাকে, তাহলে পুরসভার ভবনে নতুন রং লাগবে, নতুন লোগোও আসবে, কিন্তু নাগরিকের অভিজ্ঞতা একই থাকবে।
শেষ পর্যন্ত একটি শহরের মান নির্ধারণ করে তার উঁচু অট্টালিকা নয়, তার পুরসভার চরিত্র।
কারণ একটি মহানগর তখনই সত্যিকারের আধুনিক হয়, যখন নাগরিকের সবচেয়ে সাধারণ কাজটি সম্পন্ন করতে কোনও সুপারিশ, কোনও দালাল, কোনও খাম, কিংবা কোনও দীর্ঘশ্বাসের প্রয়োজন হয় না। তখনই পুরসভা কেবল একটি দপ্তর থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে নাগরিক সভ্যতার আয়না।