হাইলাইটস:
- আর জি কর ধর্ষণ-খুন মামলায় প্রমাণ লোপাট ও তদন্ত ভেস্তে দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে সিবিআই।
- প্রাক্তন দুই ডেপুটি কমিশনার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ও অভিষেক গুপ্তকে দীর্ঘক্ষণ জেরা করা হয়েছে।
- প্রাক্তন কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলকেও আগামী সপ্তাহে হাজিরার নির্দেশ।
- ঘটনাকাল থেকে দেহ দাহ পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্তের পুনর্মূল্যায়ন করছে তদন্তকারী সংস্থা।
- পানিহাটি শ্মশান, দাহ প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য প্রমাণ নষ্টের অভিযোগও তদন্তের আওতায়।
বাংলাস্ফিয়ার: আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করল সিবিআই। শুধু মূল অপরাধীকে চিহ্নিত করাই নয়, ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ে কোনও প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছিল কি না, অথবা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এবার নজর পড়েছে কলকাতা পুলিশের তৎকালীন শীর্ষ কর্তাদের ভূমিকার উপর।
শুক্রবার সিবিআই দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে কলকাতা পুলিশের দুই প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার—ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ও অভিষেক গুপ্তকে। তদন্তকারীরা তাঁদের কাছ থেকে একাধিক নথিও সংগ্রহ করেছেন। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে ঘটনাটির প্রথম কয়েক ঘণ্টা এবং পরবর্তী কয়েক দিনের পুলিশি পদক্ষেপ।
সিবিআইয়ের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, বর্তমানে তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, কোনওভাবে প্রমাণ গোপন করার চেষ্টা হয়েছিল কি না অথবা অন্য সম্ভাব্য অভিযুক্তদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না। সেই কারণেই সাময়িক বরখাস্ত হওয়া তিন আইপিএস আধিকারিকের ভূমিকা বিশেষভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
শুধু দুই প্রাক্তন ডিসিপি নন, তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলকেও আগামী সপ্তাহে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা তাঁর কাছ থেকেও জানতে চাইবেন, ঘটনার পরে পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে কী কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং সেই সিদ্ধান্তগুলির ভিত্তি কী ছিল।
উল্লেখ্য, গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আর জি কর-কাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিনীত গোয়াল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পর থেকেই তাঁদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
সিবিআই সূত্রে খবর, তদন্ত এখন শুধু হাসপাতাল চত্বরে সীমাবদ্ধ নেই। ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, দেহ হস্তান্তর এবং শেষ পর্যন্ত দাহকার্য—পুরো ঘটনাক্রমকে নতুন করে সাজিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় সংস্থা।
এক তদন্তকারী আধিকারিকের কথায়, “অপরাধ সংঘটিত হওয়ার রাত থেকে শুরু করে দেহ দাহ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা ও সিদ্ধান্ত খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনও স্তরে তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না, প্রমাণ নষ্ট হয়েছে কি না, অথবা তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।”
এই প্রেক্ষাপটে ইতিমধ্যেই সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পানিহাটির প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল ঘোষ এবং যে শ্মশানে তরুণী চিকিৎসকের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল, সেই শ্মশানের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক ভোলানাথ পাত্রকে। তদন্তকারীরা জানতে চেয়েছেন, কী পরিস্থিতিতে দাহকার্য সম্পন্ন হয়েছিল এবং সেই সময় কারা উপস্থিত ছিলেন।
শ্মশান কর্তৃপক্ষের দাবি, মৃতার বাবা-মায়ের সম্মতি নিয়েই দাহকার্য সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে সিবিআই সেই দাবির সত্যতা এবং পুরো প্রক্রিয়ার নথিপত্র খতিয়ে দেখছে। কারণ, মামলার শুরু থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দল, চিকিৎসক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের একাংশ অভিযোগ করে এসেছে যে, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দাহকার্য সম্পন্ন হওয়ায় বহু প্রশ্নের উত্তর অধরাই থেকে গিয়েছে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট রাতে আর জি কর হাসপাতালের সেমিনার হলে ডিউটিরত অবস্থায় ওই স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণরত চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন করা হয় বলে অভিযোগ। পরদিন কলকাতা পুলিশ সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করে। কিন্তু তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক অসঙ্গতি সামনে আসায় মামলাটি পরে সিবিআইয়ের হাতে যায়।
প্রায় দু’বছর পরেও এই মামলাকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। বরং নতুন করে শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং দাহকার্য সংক্রান্ত তদন্তে স্পষ্ট, সিবিআই এখন মূল অপরাধের পাশাপাশি সম্ভাব্য ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। আগামী সপ্তাহে বিনীত গোয়েলের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপ এই বহুচর্চিত মামলার তদন্তে নতুন মোড় আনতে পারে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।