বাংলাস্ফিয়ার: ফের নিট পরীক্ষা ঘিরে উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক অনলাইন প্রতারণা চক্র। জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা (এনটিএ) জানিয়েছে, টেলিগ্রামের বিভিন্ন চ্যানেল ও গ্রুপে সংগঠিতভাবে ভুয়ো প্রশ্নপত্র বিক্রির নামে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই কেন্দ্র সরকার সাময়িকভাবে টেলিগ্রামের পরিষেবা সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এনটিএ-র প্রকাশিত সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, প্রতারকরা পরীক্ষার্থীদের বলছে যে তাদের কাছে আবার নিট পরীক্ষার “আসল প্রশ্নপত্র” রয়েছে। সেই প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা ১৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে এই অঙ্ক ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
সংস্থার মতে, এটি শুধুমাত্র অর্থ আদায়ের কৌশল নয়, বরং সুপরিকল্পিত একটি প্রতারণা নেটওয়ার্ক। পরীক্ষার আগে উদ্বিগ্ন ছাত্রছাত্রী এবং তাদের পরিবারের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এই চক্রগুলি নিজেদের ফাঁদে ফেলতে চাইছে।
এনটিএ জানিয়েছে, প্রতারকরা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের ভুয়ো প্রমাণ ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে জাল স্ক্রিনশট, সম্পাদিত বা বিকৃত চ্যাটের ছবি, এবং তথাকথিত “সফল ক্রেতাদের” ভিডিও সাক্ষ্য। অনেক ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে যে আগের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও একইভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং পরীক্ষার্থীরা তাতে লাভবান হয়েছেন। তদন্তে দেখা গেছে, এই সমস্ত উপাদানের বেশিরভাগই সম্পূর্ণ মনগড়া বা প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা।
পরীক্ষা সংস্থা আরও জানিয়েছে যে, টেলিগ্রামে অন্তত দুটি সমন্বিত প্রতারণা পদ্ধতি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হল সরাসরি প্রশ্নপত্র বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা আদায়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রতারকরা নিজেদের এনটিএ বা অন্য কোনও সরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দিয়ে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে।
এনটিএ স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র তৈরির, সংরক্ষণের এবং বিতরণের প্রক্রিয়া বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। ফলে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে আগাম প্রশ্নপত্র পাওয়া বা বিক্রি করা কার্যত অসম্ভব। সংস্থার বক্তব্য, “যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের দাবি করছে, তাদের অবিলম্বে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা প্রতারণাকারীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। রি-নিটের (Re-NEET) মতো পরিস্থিতিতে অনেক পরীক্ষার্থী মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দ্রুত সাফল্যের আশায় এমন প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা দিতে পারে। সেই কারণেই অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এনটিএ পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছে, শুধুমাত্র সরকারি ওয়েবসাইট এবং অনুমোদিত যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কোনও টেলিগ্রাম গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ড বা সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। সন্দেহজনক বার্তা বা প্রস্তাব পেলে তা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে।
এদিকে টেলিগ্রামে বেআইনি কার্যকলাপ রুখতে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি নজরদারি বাড়িয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, প্রতারণা চক্রের অনেকগুলি অ্যাকাউন্ট পরীক্ষার মরসুমে সক্রিয় হয় এবং পরে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা এবং অর্থের লেনদেনের উৎস খুঁজে বের করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ফের নিট পরীক্ষার আগে এনটিএ-র এই সতর্কবার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজবের আড়ালে বড়সড় আর্থিক প্রতারণা চলছে। পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের সঞ্চয়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত এই চক্র থেকে দূরে থাকার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থা। পরীক্ষায় সাফল্যের কোনও শর্টকাট নেই — এই বার্তাই আবারও সামনে আনতে চাইছে এনটিএ।