হাইলাইটস:

  • ছাত্র-যুব রাজনীতি থেকে উঠে এসে খুব অল্প সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে জায়গা করে নিয়েছিলেন সায়নী ঘোষ।
  • যুব তৃণমূলের সভানেত্রী হিসেবে তাঁকে ভবিষ্যতের অন্যতম মুখ বলে তুলে ধরা হয়েছিল।
  • দলের বর্তমান সংকটে বিদ্রোহী শিবিরে তাঁর অবস্থান তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
  • কারণ, সায়নী শুধু একজন সাংসদ নন; তিনি ছিলেন অভিষেকের রাজনৈতিক প্রকল্পের অন্যতম সফল মুখ।
  • তাঁর অবস্থান বদল তৃণমূলের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বহু নেতা-মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কের নাম আলোচনায় এসেছে। কেউ প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেছেন, কেউ দূরত্ব বজায় রেখেছেন, আবার কেউ পরিস্থিতি বুঝে অবস্থান বদলেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ তালিকায় যদি এমন একজনের নাম খুঁজতে হয়, যার সিদ্ধান্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণার কারণ হয়েছে, তবে সেই নাম নিঃসন্দেহে সায়নী ঘোষ।

কারণ সায়নী ঘোষ কেবল আর পাঁচজন নেতার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন তৃণমূলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নির্মাণ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ। এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাদের মাধ্যমে দল পুরনো সংগঠন থেকে বেরিয়ে নতুন, শহুরে, সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ভোটারদের কাছে পৌঁছতে চেয়েছিল।

অভিনয় জগত থেকে রাজনীতিতে আসার পর সায়নীর উত্থান ছিল প্রায় উল্কাগত। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি দলের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর বক্তৃতা, টেলিভিশন বিতর্কে উপস্থিতি এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা তাঁকে দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছিল। যদিও তিনি জয়ী হতে পারেননি, দল তাঁর উপর আস্থা হারায়নি। বরং সেই পরাজয়ের পরই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। খুব দ্রুত তাঁকে যুব তৃণমূলের সর্বভারতীয় সভানেত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই পদ কেবল সাংগঠনিক নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক বার্তা। দলের তরুণ মুখ হিসেবে সায়নীকে সামনে আনা হচ্ছে— এই বার্তাই দিতে চেয়েছিল নেতৃত্ব।

দলের অন্দরমহলে তখন অনেকেই বলতেন, সায়নী হচ্ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন তৃণমূলের প্রতীক। তিনি পুরনো ঘরানার নেতা নন, কোনও রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যও নন। নিজের পরিচিতি, জনপ্রিয়তা এবং নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষকতায় উঠে আসা এক নতুন মুখ। সেই কারণেই তাঁর বর্তমান অবস্থানকে অনেকেই সাধারণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য হিসেবে দেখছেন না।

রাজনীতিতে দলবদল নতুন ঘটনা নয়। তৃণমূলও অতীতে বহু নেতা হারিয়েছে। মুকুল রায় গিয়েছেন, শুভেন্দু অধিকারী গিয়েছেন, আরও অনেকে গিয়েছেন। কিন্তু সায়নীর ক্ষেত্রে আঘাতের জায়গাটা অন্য।

শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন নিজস্ব সংগঠন ও রাজনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়ানো নেতা। তাঁর বিদায় ছিল ক্ষমতার সংঘর্ষের ফল। কিন্তু সায়নী ঘোষের রাজনৈতিক পরিচয় প্রায় সম্পূর্ণটাই তৈরি হয়েছিল তৃণমূলের ভিতরে। বিশেষ করে মমতা ও অভিষেকের প্রত্যক্ষ আশীর্বাদে। তাই তাঁর সরে যাওয়া বা বিদ্রোহী শিবিরের প্রতি সহানুভূতি দেখানোকে তৃণমূলের একাংশ ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেই দেখছে।

দলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, “যাদের জন্য রাজনৈতিক জীবন তৈরি হল, শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেওয়া সবচেয়ে কষ্টের।”

সায়নীর এই অবস্থান আরও একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে নতুন প্রজন্মের তৃণমূল তৈরি হচ্ছিল, তার ভিত কতটা শক্ত?

গত কয়েক বছরে অভিষেকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য ছিল নতুন মুখ তুলে আনা। পুরনো নেতাদের বাইরে গিয়ে সাংসদ, বিধায়ক এবং সংগঠনের দায়িত্বে তরুণদের জায়গা দেওয়া। সায়নী ছিলেন সেই পরীক্ষার অন্যতম সফল উদাহরণ। আজ যদি সেই মুখই বিদ্রোহী শিবিরের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তবে তা শুধু সাংগঠনিক ক্ষতি নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তারও পরাজয়।

অবশ্য সায়নীর সমর্থকদের যুক্তি আলাদা। তাঁদের মতে, তিনি কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নন; তিনি দলের বর্তমান সংকট নিয়ে নিজের অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, রাজনৈতিক মতবিরোধকে বিশ্বাসঘাতকতা বলা যায় না।

কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা অনেক সময় যুক্তির চেয়ে আবেগ দিয়ে চলে। আর সেই আবেগের জায়গা থেকেই তৃণমূলের বহু নেতা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সংকটে সবচেয়ে বেদনাদায়ক নাম সায়নী ঘোষ। কারণ তিনি ছিলেন দলের তৈরি করা মুখ। তিনি ছিলেন ভবিষ্যতের প্রতীক। তিনি ছিলেন মমতা-অভিষেক যুগল নেতৃত্বের অন্যতম রাজনৈতিক বিনিয়োগ। আর সেই কারণেই তাঁর অবস্থান পরিবর্তনকে অনেকেই শুধু রাজনৈতিক বিচ্ছেদ নয়, বরং এক গভীর আস্থাভঙ্গের গল্প হিসেবে দেখছেন।

তৃণমূলের বর্তমান সংকট শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু দল ভাঙনের এই অধ্যায়ে যদি ‘সবচেয়ে বড় ধাক্কা’ খুঁজতে হয়, তবে সায়নী ঘোষের নাম যে প্রথম সারিতেই থাকবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে খুব বেশি দ্বিমত নেই।