দলের দুর্দিনে ব্যক্তিগত অহংকার বড় নাকি একতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ! এই জায়গাতেই বার বার প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে এসে পড়ছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরের কঙ্কালসার ছবিটা।
এর আগে দলের বর্ষীয়ান সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনোমালিন্যের খবর প্রকাশ্যে এসেছিল। পরে কোনরকমে মিটমাট হয়ে গেলেও এখনো সেই ঘটনার স্মৃতি তাজা। কল্যাণের সঙ্গে বিবাদের ঘটনা ফিকে হতে না হতেই এবার দলের প্রাক্তন মুখপাত্র তথা বর্তমান বিধায়ক কুনাল ঘোষের সঙ্গে অশান্তির ঘটনায় ফের শিরোনামে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার সন্ধ্যায়। দলের বিপদের সময়ে জরুরী ভিত্তিতে বৈঠক ডাকেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার কালীঘাটের বাড়িতে উপস্থিত হন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, কুনাল ঘোষ, কল্যান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাথমিকভাবে আলোচনা চলছিল সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় কে নিয়ে। দলের দীর্ঘদিনের সদস্য সুদীপ বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এন সি পি আই দলে যোগ দিয়েছেন। সুদীপ যেহেতু এখন শিবির বদল করেছেন, তাই উত্তর কলকাতার তৃণমূলের জেলা সভাপতি পদে নিয়োগ করা হয় কুণালকে, যে পদ এতদিন সামলে এসেছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই রদবদল আরও দ্রুততার সঙ্গে করা উচিত বলে মন্তব্য করেন কুনাল। এতেই হঠাৎ অভিষেক বলে ওঠেন – “সব দেখা যাবে, পরে হবে!”
এরপরই রীতিমত তর্কে জড়িয়ে পড়েন কুনাল এবং অভিষেক। কোনক্রমে বৈঠক শেষ হওয়ার পর নতুন করে আবার তর্ক শুরু হয় কুনাল এবং অভিষেকের মধ্যে। সে তর্কের তীব্রতা এতই বেশি ছিল, যে বৈঠক হচ্ছিল যে ঘরে তার বাইরে থেকেও পাওয়া যাচ্ছিল উত্তেজিত কুনাল এবং অভিষেকের গলার আওয়াজ। জানা যায় এবারে তর্কের বিষয় ছিল অভিষেকের আপ্তসহায়ক সুমিত রায় এবং তাকে নিয়ে কুনাল ঘোষের মন্তব্য। অভিষেক এবং কুনালের মধ্যে কথাবার্তার ধরন ছিল খানিকটা এইরকম –
অভিষেক – তুমি কি ঝগড়া করবে বলেই এসেছিলে?
কুনাল – ঝগড়া আমি করিনি। যেটা বলার বলেছি।
অভিষেক – তুমি আমার আর সুমিতের বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দিয়েছ।
কুনাল – আমি তোমার বিরুদ্ধে কোনও স্টেটমেন্ট দিইনি। তুমি সুমিতকে কেন নিজের কাঁধে নিচ্ছ?
অভিষেক – তুমি সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করেছ কেন?
কুনাল – সুমিত আমাদের দলের কেউ না, ওকে কেন ডিফেন্ড করব?
অভিষেক – সুমিতের নামে বলা মানে আমার নামেই বলা।
কুনাল – অভিষেক তুমি আর লেবু কচলে তেতো কোরো না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনেই সমানের তর্ক চলতে থাকে অভিষেক এবং কুনালের। এই সময় দুজনকে শান্ত করতে এগিয়ে আসেন কল্যান বন্দ্যোপাধ্যায়, কিন্তু তাকে অগ্রাহ্য করেই চলতে থাকে কুনাল এবং অভিষেকের তর্ক। অন্য সময় হলে মমতা কি সিদ্ধান্ত নিতেন তা হয়তো কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে। কিন্তু দলের এই বিপদের সময়ে হয়ত ভাইপোর পক্ষ নিয়ে নতুন করে আর একজন সদস্য খোয়ানোর পক্ষপাতী ছিলেন না মমতা। কারণ, দিন কয়েক আগে অভিষেকের বক্তব্যের রীতিমতো তীব্র প্রতিবাদ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছিলেন দলের এই বিপদের সময়ও অভিষেকের ঔদ্ধত্য এবং দুর্বিনীত আচরণে তিনি যথেষ্টই বিরক্ত। এরপরই তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে বলেন, “হয় আমাকে রাখুন অথবা অভিষেককে”। সম্ভবত সেই কারণেই এবারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে উঠে এসে অভিষেক কল্যাণ এবং কুনালের মাথায় হাত রেখে বলেন, ” ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল। দলের এই সময়ে সবাইকে মাথা ঠান্ডা করে কাজ করতে হবে। সবাইকে এক হয়ে থাকতে হবে।”
তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনা নিয়ে রীতিমত তোলপাড় শুরু হয়েছে। কারণ, এদিন ঘটনার লাগাম নিজের হাতে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনমতে শান্ত করেছেন কুনাল এবং অভিষেকের দ্বৈরথ। কিন্তু সই জাল মামলায় ইতিমধ্যেই ভবানীভবনে ডেকে একতরফ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কে। রবিবার বিকেলে কুনাল ঘোষকেও ডাকা হয়েছিল ভবানী ভবনে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। কিন্তু কোন কারনে যদি কুনাল এবং অভিষেককে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করার ভাবনা চিন্তা করে সিআইডির আধিকারিকরা সে ক্ষেত্রে কি ঘটতে পারে! কারন সেখানে সামাল দেবার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকবেন না। বরং সিআইডি আধিকারিকদের সামনে এই ঘটনা ঘটলে বিপদ বাড়তে পারে অভিষেকের দিকেই। এ বিষয় নিয়েই যথেষ্ট উদ্বিগ্ন তৃণমূল শিবির এবং উত্তেজনায় ফুটছে রাজনৈতিক মহল।
