Home DRAFT স্পিলবার্গের মহাজাগতিক প্রত্যাবর্তন

স্পিলবার্গের মহাজাগতিক প্রত্যাবর্তন

ডিসক্লোজার ডে’: বিস্ময়, বিনোদন ও মানবতার সন্ধানে এক দুর্দান্ত বিজ্ঞান-কল্প অভিযাত্রা

Authored By অনন্যা মজুমদার
5 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • স্টিভেন স্পিলবার্গের নতুন ছবি “Disclosure Day” তাঁর ক্লাসিক “Close Encounters of the Third Kind”-এর আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি।
  • বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি, রহস্য, অ্যাকশন ও মানবিক আবেগের মিশেলে তৈরি হয়েছে এক বৃহৎ ক্যানভাস।
  • জশ ও’কনর, এমিলি ব্লান্ট, কলিন ফার্থ ও কোলম্যান ডোমিঙ্গোর অভিনয় ছবির প্রধান শক্তি।
  • বহির্জাগতিক প্রাণের গল্প হলেও ছবির কেন্দ্রবিন্দু মানুষ, পরিবার ও সহমর্মিতা।
  • নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা ছবির প্রতি ইঙ্গিত রেখে স্পিলবার্গ যেন তাঁর চলচ্চিত্র-দর্শনের সারসংক্ষেপ হাজির করেছেন।

স্টিভেন স্পিলবার্গের নাম শুনলেই মনে পড়ে এমন এক চলচ্চিত্রকারের কথা, যিনি গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তা ও শিল্পগুণের এক বিরল সমন্বয় ঘটিয়ে চলেছেন। জসই.টি.ইন্ডিয়ানা জোন্সজুরাসিক পার্কশিন্ডলার্স লিস্টমাইনরিটি রিপোর্ট—প্রতিটি ছবিই যেন আলাদা এক যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর নতুন ছবি “Disclosure Day” সেই দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ছবিটি শুরু থেকেই দর্শককে নিজের ভেতরে টেনে নেয়। প্রথম দৃশ্যেই রয়েছে তাড়া, রহস্য এবং বিপদের আভাস। ড্যানিয়েল কেলনার নামে এক সাধারণ মানুষকে দেখা যায় কিছু প্রভাবশালী শক্তির হাত থেকে পালাতে। তাঁর হাতে রয়েছে একটি রহস্যময় বস্তু, যা নিয়ে শুরু হয় পুরো কাহিনির বিস্তার। তাঁর সঙ্গী জেন ব্ল্যাঙ্কেনশিপ। তাদের পিছু নিয়েছে নোয়া স্ক্যানলনের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী গোষ্ঠী।

প্রথম কয়েক মিনিটেই স্পিলবার্গ বুঝিয়ে দেন যে তিনি এখনও দর্শককে উত্তেজনার চূড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা হারাননি। গাড়ি ধাওয়া, অপ্রত্যাশিত মোড় এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা পালানোর দৃশ্যগুলো একইসঙ্গে রোমাঞ্চকর ও মজাদার।

তবে “Disclosure Day” কেবল একটি তাড়ার গল্প নয়। ছবির আসল শক্তি তার বহুমাত্রিক বয়ানে। বিভিন্ন চরিত্র, ভিন্ন ভিন্ন স্থান এবং একাধিক রহস্যময় ঘটনার সূত্র ধীরে ধীরে এসে মিলিত হয় এক বৃহত্তর সত্যের দিকে।

কোলম্যান ডোমিঙ্গোর অভিনীত হুগো ওয়েকফিল্ড চরিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যেন এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলির মধ্যে মানবিক সংযোগের সেতুবন্ধন। তাঁর উপস্থিতি ছবিকে আবেগের গভীরতা দেয়। অন্যদিকে কলিন ফার্থের নোয়া স্ক্যানলন আধুনিক কর্পোরেট ক্ষমতার এক নির্মম প্রতীক। তাঁর চরিত্রে রয়েছে ভদ্রতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অহংকার ও নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা।

ছবির অন্যতম বড় চমক এমিলি ব্লান্ট। তিনি অভিনয় করেছেন মার্গারেট ফেয়ারচাইল্ড নামে এক টেলিভিশন আবহাওয়া উপস্থাপিকার ভূমিকায়। মার্গারেটের স্বপ্ন আরও গুরুত্ব পাওয়ার, আরও বড় কিছু করার। দ্রুত কথা বলা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সর্বক্ষণ গতিশীল এই চরিত্র ছবিতে এক প্রাণবন্ত শক্তি যোগ করেছে।

ব্লান্টের অভিনয়ে কৌতুক ও আবেগের চমৎকার ভারসাম্য রয়েছে। তাঁর দৃশ্যগুলোই ছবির সবচেয়ে হাস্যরসাত্মক মুহূর্ত তৈরি করে। ফলে রহস্য ও উত্তেজনার মাঝেও দর্শক স্বস্তির শ্বাস নিতে পারে।

ছবির নাম শুনেই বোঝা যায় যে এখানে বহির্জাগতিক প্রাণ বা অজানা মহাজাগতিক শক্তির উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু স্পিলবার্গ অত্যন্ত সচেতনভাবে তাদের পেছনের সারিতে রাখেন। ই.টি.-র মতো তারা কখনও গল্পের কেন্দ্রে আসে না।

বরং তাদের ঘিরে মানুষের প্রতিক্রিয়া, ভয়, কৌতূহল ও বিশ্বাসই হয়ে ওঠে মূল বিষয়। এটাই স্পিলবার্গের বিশেষত্ব। তিনি কখনও এলিয়েনদের নিয়ে গল্প বলেন না; তিনি মানুষের গল্প বলেন, যেখানে এলিয়েনরা কেবল আয়নার মতো কাজ করে।

এই দিক থেকে “Disclosure Day” স্পষ্টভাবে “Close Encounters of the Third Kind”-এর উত্তরসূরি। ১৯৭৭ সালের সেই ছবিতে যেমন অজানার প্রতি মানুষের আকর্ষণ ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়, এখানেও তেমনই রয়েছে মহাবিশ্বের বৃহত্তর রহস্যের সামনে মানুষের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন।

তবে এবার স্পিলবার্গের দৃষ্টিভঙ্গি আরও পরিণত। সেখানে একক মানুষের আবেশের বদলে রয়েছে একটি সম্প্রদায়, একটি অস্থায়ী পরিবার এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ধারণা।

ছবির আরেকটি আকর্ষণ তার আত্ম-উল্লেখ। স্পিলবার্গ যেন নিজের অতীতের সঙ্গে কথোপকথনে বসেছেন। “Duel”“Minority Report”“Close Encounters”—বিভিন্ন সময়ের ছবির প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে রয়েছে পুরো কাহিনিজুড়ে।

এইসব ইঙ্গিত কেবল ভক্তদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়। বরং এগুলোর মাধ্যমে পরিচালক নিজের চলচ্চিত্র-যাত্রাকে পুনর্বিবেচনা করেছেন। যেন তিনি প্রশ্ন তুলছেন—চলচ্চিত্র কী? কেন মানুষ গল্প বলে? আর কেন আমরা এখনও অন্ধকার হলে বসে পর্দার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হতে চাই?

স্পিলবার্গের সমসাময়িক অনেক নির্মাতা এখন বিশাল বাজেট, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং অবিরাম দৃশ্য-প্রভাবের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু “Disclosure Day” দেখায় যে কেবল প্রযুক্তি দিয়ে বিস্ময় তৈরি করা যায় না।

বিস্ময় আসে গল্প থেকে। আসে চরিত্র থেকে। আসে মানুষের অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে।

ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলোও সেই কারণেই কার্যকর। এগুলো কখনও নিছক প্রদর্শনীতে পরিণত হয় না। বরং গল্পের অংশ হয়ে থাকে। অনেক দৃশ্য এতটাই অসম্ভব যে দর্শক বিস্ময়ের পাশাপাশি হেসেও ফেলতে পারেন। কিন্তু সেই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নির্মাতার আত্মবিশ্বাস।

স্পিলবার্গ জানেন যে তাঁকে আর কিছু প্রমাণ করতে হবে না। তিনি দর্শককে চমকে দেওয়ার জন্য মরিয়া নন। বরং তিনি দর্শককে আমন্ত্রণ জানান তাঁর সঙ্গে যাত্রা করতে।

ছবির শেষ অংশে এসে স্পষ্ট হয় যে “Disclosure Day” আসলে বহির্জাগতিক প্রাণ নিয়ে নয়, মানবিক সহমর্মিতা নিয়ে। ছবিটি বলছে, আমরা যতই বিভক্ত হই না কেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের একসঙ্গে চলার প্রয়োজন আছে।

সেই অর্থে এটি আজকের পৃথিবীর জন্যও একটি তাৎপর্যপূর্ণ চলচ্চিত্র। রাজনৈতিক বিভাজন, প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক অবিশ্বাসের সময়ে স্পিলবার্গ মনে করিয়ে দেন—মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কল্পনা নয়, তার সহানুভূতি।

সব মিলিয়ে “Disclosure Day” এমন একটি ছবি যা একইসঙ্গে বিনোদন দেয়, ভাবায় এবং আবেগতাড়িত করে। এটি হয়তো স্পিলবার্গের শ্রেষ্ঠ কাজ নয়, কিন্তু তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের এক অসাধারণ সংকলন। এখানে তাঁর পুরনো বিস্ময় আছে, নতুন পরিণতি আছে এবং আছে সিনেমার প্রতি এক অটুট বিশ্বাস।

সিনেমা যদি সত্যিই একটি ‘সহমর্মিতার যন্ত্র’ হয়ে থাকে, তাহলে “Disclosure Day” তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। আর সেই কারণেই ছবিটি শুধু একটি বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি নয়, বরং সিনেমার শক্তির প্রতি এক আবেগময় শ্রদ্ধার্ঘ্য।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles