হাইলাইটস
- সাড়ে তিন মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে দাবি।
- সম্ভাব্য চুক্তিতে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের কথা রয়েছে।
- ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে।
- তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরে দীর্ঘ ও জটিল আলোচনা হবে।
- চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত না হলেও উভয় পক্ষই বলছে, সমঝোতা এখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে কাছাকাছি।
সাড়ে তিন মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তোলা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে উভয় পক্ষ।
যদিও যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তাবলি এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি, ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার বলেছেন যে একটি সমঝোতা “আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি কাছাকাছি”। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠান সম্ভবত এই সপ্তাহান্তেই অনুষ্ঠিত হতে পারে।
তবে ট্রাম্প এর আগেও বারবার দাবি করেছেন যে যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে চুক্তি প্রায় সম্পন্ন, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিগুলি এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি।
ইরানের দুই কর্মকর্তা এবং আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। সেই চুক্তির ফলে যুদ্ধ বন্ধ হবে, অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে।
ওই কর্মকর্তাদের মতে, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্নবীকরণ করবে। তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় নির্ধারিত হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আলোচনায় “বেশিরভাগ বিষয়েই” সমঝোতা হয়েছে। বর্তমানে চুক্তির ভাষা নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা চলছে।
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে বৈঠক চলছে এবং চুক্তির চূড়ান্ত পাঠ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।”
গত এক সপ্তাহে এই যুদ্ধের নাটকীয় ওঠাপড়া আবারও স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা, অন্যদিকে প্রতিদিন প্রায় নতুন নতুন হামলা ও পাল্টা হামলা।
সোমবার থেকে এখন পর্যন্ত একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়েছে। ইরান আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজে আঘাত হেনেছে এবং ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে।
এর মধ্যে এমন একটি লক্ষ্যবস্তুও ছিল, যা নিয়ে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক তদন্তে দাবি করা হয়েছে যে সেটি সম্ভবত একটি পানীয় জলের সংরক্ষণাগার ছিল।
চুক্তির সম্ভাব্য বিষয়বস্তু নিয়ে নানা পক্ষ থেকে তথ্য ফাঁস হতে থাকায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকান শিবিরের উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেন।
সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, “চুক্তির কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের উদ্বেগ সর্বাগ্রে গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যদি নিজেদের দায়বদ্ধতা পূরণ করে, তাহলে অর্থনৈতিক সুবিধা শুধু তাদের নয়, গোটা অঞ্চলের কাছেও পৌঁছাবে।”
দিনের শেষ দিকে ইরানের অবস্থানও স্পষ্ট করেন বিদেশমন্ত্রী আরাঘচি।
তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানান, তাঁর আলোচক দল ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে যে তারা লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং সেখানে হামলা বন্ধ দেখতে চায়।
বিশেষ করে লেবাননে ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও তেহরানের উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা চুক্তি সম্পর্কে তাঁদের প্রকাশ্য বিবৃতিতে লেবাননের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেননি।
এদিকে ইসরায়েল সরকার বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তার অংশ তারা নয়।
ফলে চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও ইসরায়েলের অবস্থান কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মার্কিন প্রশাসন এই সম্ভাব্য সমঝোতাকে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু বাস্তবে প্রস্তাবিত চুক্তিটি মূলত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করবে।
সেই যুদ্ধবিরতির পর শুরু হবে আরও কঠিন এবং জটিল আলোচনা। সেখানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দরকষাকষি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও গড়াতে পারে।
অতএব, যদি এই চুক্তি স্বাক্ষরিতও হয়, তা যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ মাত্র।
তবু ১০৫ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ওয়াশিংটন ও তেহরান যে আলোচনার টেবিলে এতটা কাছাকাছি এসেছে, সেটাই আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সবচেয়ে বড় খবর। যুদ্ধের অনিশ্চয়তার মাঝে সেটিই হয়তো শান্তির ক্ষীণ কিন্তু বাস্তব সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে।